চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পরিবার কাহাকে বলে

ছোটবেলায় স্কুলের সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ে প্রথম অধ্যায় ছিলো পরিবেশ, পরিবার ও সমাজ। আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তাই আমাদের পরিবেশ এবং মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, নানা-নানীকে নিয়ে আমাদের পরিবার। হঠাৎ করে পরিবারের সংজ্ঞা শেখানো হচ্ছে ভাবলে মার্জনা প্রার্থনীয়। প্রধানমন্ত্রী তার পরিবারের সংজ্ঞা দেওয়ার পর নতুন করে ছোটবেলার সমাজ বিজ্ঞান পাঠ মনে করার চেষ্টা করা হলো।

বাংলাদেশে কিছুদিন পূর্বেও একান্নবর্তী পরিবার বলে একটি শব্দ প্রচলিত ছিল। এখন আর তেমন পরিবার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সেটি হওয়া স্বাভাবিক। যখন কোন পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেড়ে যায় তখন একটি গৃহে তার সংকুলান হয় না। পরিবারের ছেলে সন্তানেরা যখন বিয়ে করে তখন তাদের আলাদা পরিবার হয়। আলাদা গৃহে তারা নতুন করে পরিবার শুরু করে। অন্যথায় একই পরিবারের মধ্যে এমন সব সমস্যার তৈরী হয় যেগুলো গৃহদাহের কারণ হয়। নাগরিক জীবনের বিস্তারে মানুষের চাহিদা যেমন বেড়েছে তেমনি সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে একজন উপার্জনকারীর পক্ষে একান্নবর্তী পরিবারের ভার বহন করাও সম্ভব হয় না। আবার কয়েকজন উপার্জনকারী হলেও তারা সবাই সমান উপার্জন করে না। ফলে আয় ও ব্যয় নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ফলে নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠে। সেখানে কাজের সুযোগ তৈরী হয়। এক একটি কারখানাকে ঘিরে গ্রাম থেকে আসা নতুন নতুন শ্রমিক পরিবার গড়ে উঠে। যেকোন দেশে এভাবে গড়ে উঠে শহর বন্দর ও নতুন বসতি। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙ্গে তৈরী হয় স্বামী-স্ত্রী সন্তান নিয়ে একক পরিবার।শেখ রেহানা-জন্মদিন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতির পথ ধরে ৫০ দশকে ঢাকা শহরে একক পরিবার গড়েছিলেন। ধীরে ধীর তাকে ঘিরে তার পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের অনেকেই ঢাকা শহরে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনো সেই অর্থে পরিবারকে খুব বেশি সময় দিতে পারেননি। ৫৭ বছরের জীবনে ১৯টি বছর নিয়মিত বিরতিতে তার জেল খাটতে হয়েছে। একবার জেলে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে গিয়ে শেখ হাসিনাকে শেখ কামাল বলেছিলেন, হাসু আপা তোমার বাবাকে আমি একটু বাবা ডাকি। বঙ্গবন্ধু নিজে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এ তথ্য উল্লেখ করেছেন।

বাংলার মানুষকে একটি স্বাধীন ভূ-খণ্ড দিতে গিয়ে ছয় দফা নিয়ে পুরো বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। একজন ধীর, স্থির নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব না হলে আমরা এমন আত্মত্যাগী রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধু পেতাম কিনা এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হতো কিনা এ নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন। স্বাধীনতার পরপর জার্মানী তার বিমান সংস্থা লুফথানসা ঢাকায় তাদের ফ্লাইট চালু করেছিলো। তখন বাঙালির পারিবারিক গল্পের বিষয় ছিল, বঙ্গবন্ধু তার স্ত্রী লুৎফুন্নেসার (বঙ্গমাতার ডাকনাম) নামে বিমান চালু করেছেন। বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক সামন্তবাদি উদ্ভট চিন্তা থেকে বঙ্গবন্ধুও রক্ষা পাননি।

পনেরো শতকে দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষয়ী গোত্রীয় যুদ্ধে অতিষ্ট ইউরোপে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিকাশ হয়। পরিবার ও গোত্রের মানুষেরা তাদের নিজ নিজ অধিকার ছেড়ে রাষ্ট্রের কাছে সামষ্টিক দায়িত্ব পালনের কিছু কর্তব্য নির্ধারিত হয়। তার পূর্ব পর্যন্ত ছিলো সামন্ততান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা । তখন কারো জন্য কিছু করার কর্তব্য নির্ধারণ হতো পরিবার বা গোত্রের সদস্য হিসেবে। রাষ্ট্র হলো সেই সামন্তবাদী প্রক্রিয়া থেকে উত্তরিত হয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের সকল জনগণকে সমান অধিকার দেয়া।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে এই সংবিধানের অধীনে কেবল এই ক্ষমতার প্রয়োগ ও কর্তৃত্ব কার্যকর হবে।’ এই অনুচ্ছেদের ঐতিহাসিক কারণ হলো, পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রের সকল ব্যবসা-বাণিজ্য, সম্পদ বাইশ পরিবার নিয়ন্ত্রণ করতো। ফলে জনগণ প্রচণ্ড বৈষম্যের শিকার হয়। রাষ্ট্র জনগণের নামে পরিচালিত হলেও মূলত নিয়ন্ত্রণ ছিলো বাইশ পরিবারের। বঙ্গবন্ধু জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন।১৫ই আগস্ট

বিজ্ঞাপন

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে ৩২-নম্বর বাড়িতে সপরিবার হত্যা করার পাশাপাশি তার বেশ কিছু আত্মীয় স্বজনকে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন ৮০’র দশকে। শেখ হাসিনা সেদিনের সেই নির্মম ঘটনায় যারা মারা গিয়েছিলেন তাদের সবার পরিবারকে নিজের পরিবারের মতো জ্ঞান করতেন। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর টানা ১১ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে তার পরিবারের সদস্য পরিচয়ে কারো কারো নামে আর্থিক ফায়দা লাভের অভিযোগ উঠে। সাম্প্রতিক ক্যাসিনোকাণ্ডেও একজনের নাম আসছে।

শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি জীবনে সততার উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত প্রধানমন্ত্রী বলতে বাধ্য হন কারা তার পরিবার। তিনি স্পষ্ট করেই বললেন, তারা দুই বোন। শেখ রেহানার সন্তানেরা এবং তার দুই সন্তানই একমাত্র তার পরিবার। এর মধ্য দিয়ে তিনি সাবধান করলেন সেইসব অসৎ নেতাদের, যারা তার পরিবারের কথা বলে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং করছে।

বাংলাদেশে যেসব সামাজিক সাংস্কৃতিক বিশেষ করে আর্থিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তারা বেশিরভাগ এখন এক ধরনের সংকটে রয়েছে। প্রথম প্রজন্ম তাদের শ্রমে ঘামে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও প্রাতিষ্ঠানিকতা পুরোপুরি তৈরী করতে না পারায় তাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম সেটি রক্ষা করতে পারবে কিনা এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রথম প্রজন্ম লুটপাটসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে পারিবারিক স্টাইলে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও পরে ধীরে ধীরে তারা কর্পোরেট স্ট্রাকচার গড়ে তোলে। চাইনিজ এক ব্যবসায়ী তার সন্তানকে পিয়ন পদে চাকরি দিয়েছিলেন এবং বলে দিয়েছিলেন তুমি তোমার যোগ্যতায় যদি আমার আসন নেয়ার যোগ্য হও তবেই তুমি ব্যবস্থাপনা পরিচালক হবে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগে পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেয়ার প্রবণতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বা স্বার্থের সংঘাতে আক্রান্ত হয়ে ভেঙে পড়ার উপক্রম হচ্ছে।

শান্তিরক্ষা মিশনে সবচেয়ে ভালো নারী পুলিশ-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বাংলা সাহিত্যের বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, আমরা পরিবারে যুক্ত হয়েছিলাম পরিবার থেকে মুক্ত হয়ে যেন বিশ্ব চরাচরকে আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধতে পারি। কিন্তু হায়, আমরা সেই যে বন্ধনে যুক্ত হয়েছি আর মুক্ত হতে পারিনি। তাই আমাদের সবকিছুতে আমার, আমার পরিবারের স্বার্থই প্রাধান্য পায়। স্বার্থের আগুনে বাধাগ্রস্ত হয়ে জনগণের রাষ্ট্র বিনির্মানের সংগ্রাম ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হয়।

শুধু এবারই নয়, আগেও কয়েকবার নিজের অবস্থান পরিস্কার করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিস্কার বার্তা দিয়ে রেখেছেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

Bellow Post-Green View