চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নৈতিক উৎকর্ষ সাধনে মাহে রমজান

ইসলাম এবং নৈতিকতা– দুটো এমন সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়, যা একে অপরের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। কখনোই তা আলাদা করা যায় না। এজন্য ইসলামকে নৈতিকতার ধর্মও বলা হয়। গবেষণা করলে দেখা যাবে, ইসলামের প্রতিটি বিধানই নৈতিকতার উপর নির্ভর করে টিকে আছে। কোনোটিতেই অনৈতিক কার্যাদির প্রশ্রয় দেয়া হয় নি; নৈতিকতাই প্রাধান্য পেয়েছে সবসময়।

ইসলাম যেমন সত্য ও সৌন্দর্যের ধর্ম, তেমনই শেখায় সত্য ও সৌন্দর্যের সিলেবাস। পয়গম্বর (আলাইহিস সালাত ওয়াস সালাম) আমাদের সত্যাচারের নির্দেশ দিয়ে গেছেন এভাবে– ‘তোমাদের সত্য কথা বলা উচিত, কেননা সত্যবাদিতা অবশ্যই পূণ্যের দিকে পরিচালিত করে, আর নিশ্চয়ই পূণ্য জান্নাতের দিকে পরিচালিত করে’ (বুখারি ও মুসলিম)।

বিজ্ঞাপন

শুধু সত্যাচার অবলম্বনই নয়; ইসলাম আমাদের বিরত রাখে মিথ্যাচার, অত্যাচার এবং অনাচার থেকেও। মিথ্যাচার সম্পর্কে প্রিয়নবী আকায়ে দোজাহাঁ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন– ‘অবশ্যই তোমরা মিথ্যাচার থেকে বিরত থাকবে, কেননা নিশ্চয়ই মিথ্যা অনৈতিক কাজের দিকে পরিচালিত করে এবং নিশ্চয়ই অনৈতিক কাজসমূহ দোজখের দিকে পরিচালিত করে’ (বুখারি ও মুসলিম)। যেহেতু প্রায় সর্বপ্রকারের অনৈতিক কার্যাবলীর কেন্দ্রে রয়েছে মিথ্যাচারের জোরালো ভূমিকা। মিথ্যার বিষক্রিয়ায় সমাজে অস্তিত্ব লাভ করে থাকে নানান অপরাধ। তাই ইসলাম ধর্মে মিথ্যার ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ সাব্যস্ত করা হয়েছে। মিথ্যাসহ অন্যান্য সকল আনুষঙ্গিক অপরাধকে একীভূত করা হয়েছে নিষিদ্ধ কার্যাদির তালিকায়। অবৈধ পথে অর্থোপার্জন, ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা, মদ্যপান, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায়ভাবে অন্যের হক নষ্টকরণ, গীবতচর্চা, নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক, আমানতের খেয়ানত– ইত্যাদি কার্যাবলী ইসলামের দৃষ্টিতে, মারাত্মক পর্যায়ের গুনাহ এবং নিষিদ্ধ কাজ।

বিজ্ঞাপন

অতএব একজন মুসলমান মাত্রই এগুলো থেকে পরহেজ করে চলবে। রমজান মাসটি আমাদের জন্য অনৈতিকতা থেকে মুক্তির মাস। অনাচার, পাপাচারকে বিদায় প্রদানের মোক্ষম সময়। এ জন্যই এ মাসটি আমাদের দ্বারে দ্বারে আগমন করেছে। বিশেষত: রোজার মাধ্যমে। এর উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা দিয়েছেন– ‘হে ইমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার’ (সূরা: বাকারা, আয়াত:১৮৩)। অর্থাৎ তাকওয়াকে বলা হচ্ছে– রমজান মাসের মৌলিক উদ্দেশ্য। আর তাকওয়া মানে হলো– আল্লাহ পাকের আদিষ্ট বিষয়াবলি অবলম্বন করে, তাঁরই নিষিদ্ধ বিষয়াবলী বর্জন করা। যদি আমরা নিষিদ্ধ বিষয়াবলী পরিত্যাগ করতে সক্ষম না হই, তবে আমাদের রোযার মৌলিক উদ্দেশ্যই বিপন্ন হবে। রমজান মাস আগমনের সার্থকতা অপূর্ণ থেকে যাবে।

বিজ্ঞাপন

আর রোজা পালনের বিষয়টি কেবল সারশূন্য হয়ে থাকবে। একথাটি নবি পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই হাদিসটিতে স্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে– ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, আর মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারল না, তার না খেয়ে থাকার প্রয়োজন আল্লাহ তায়ালার নিকট নেই’ (সহিহ বোখারি)। এ থেকে বোধগম্য হলো– রোজা পালন কেবল খানাপিনা তরক করার বিশেষ কোনো চর্চা নয়। বরং মিথ্যা কথা এবং গুনাহের কার্যাদি হতে তন-মনকে দূরে সরিয়ে রাখার বিশেষ উপায়ও বটে।

একনিষ্ঠ মনে রোজা রাখার মাধ্যমে আরো অনেকগুলি অনৈতিক কার্যাবলী থেকে আমরা বিরত থাকতে পারি। প্রতিনিয়তই হিংসা-বিদ্বেষের অনলে জ্বলছে আমাদের সমাজ। রোযার মধ্যে রয়েছে হিংসা-বিদ্বেষ দূরীকরণের কুদরতি পদ্ধতি; তবে যদি তা একনিষ্ঠ মনে পালিত হয়। এ ব্যাপারে প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন– ‘সবরের মাসের (রমজানের মাস) রোযা এবং প্রতিমাসের তিন দিনের (আইয়্যামে বীয) রোজা হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়’ (মুসনাদে আহমদ)।রোজার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে– নম্রতা ও ভদ্রতা। যা মানুষকে ঝগড়া, ফ্যাসাদ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শেখায়। একজন রোজাদার ব্যক্তির আচরণ কেমন হবে– তা হুজুর পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজমুখেই শিখিয়ে দিচ্ছেন– ‘রোজা একটি ঢালস্বরূপ। সুতরাং রোজা অবস্থায় তোমাদের কেউ যেন অশ্লীল কথাবার্তা ও ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত না হয়। কেউ যদি তার সঙ্গে ঝগড়া করতে চায়, অথবা গালি দেয়; তবে সে যেন দু’বার বলে, আমি রোজাদার’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।

এভাবে রমজান মাসের প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে রোযা আমাদেরকে অনৈতিকতা থেকে বিরত থাকতে শিখিয়ে যায়। শিখিয়ে যায় অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে বিরত রাখতে মন-নিয়ন্ত্রণের উপায়ও। সেজন্যই তো এসময়ে পানাহার ও স্ত্রী-সহবাসের মত বৈধ কার্য থেকেও সারাদিন বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে। যাতে আমরা নিজনিজ প্রবৃত্তিকে শিকলবন্দী করে রাখতে পারি। কেননা প্রবৃত্তি নামক শত্রুটা সম্মুখ লড়াইয়ে কাবু হলেই আমাদের সার্বক্ষণিক গুনাহের পরিমাণও পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এই নিয়ন্ত্রণশক্তি অর্জনের জন্যই পাক কালামে বলা হয়েছে– ‘রোজা রাখো, যাতে পাশবিক কুপ্রবৃত্তির প্রভাব হতে মুক্ত থাকো এবং পরহেজগার হতে পারো’ (সুরা বাকারা: ১৮)।

যথাযথভাবে রোযা পালন করে রমজান মাস কাটাতে পারলে অন্যায়, অনাচারের উপর আমাদের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে এবং নৈতিক উৎকর্ষ সাধন সম্ভবপর হবে। ফলে আমরাও স্রষ্টার দরবারে পরহেজগার বান্দা হিসেবে পরিগণিত হতে পারব। যখন এরূপ হবে, তখনই অর্জিত হবে সেই পুরস্কার, যার কথা আকায়ে দোজাহাঁ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদিসে কুদসীর মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়েছে– ‘বান্দা একমাত্র আমার জন্যই তার পানাহার বর্জন করে, রোজা আমার জন্যই, আমি নিজেই তার পুরস্কার দেব’ (সহিহ বুখারি)।