চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Cable

নেতা নয়, তিনি ছিলেন বন্ধু

Nagod
Bkash July

১৯৪৭ সালের পর অর্থাৎ ভারত ভেঙ্গে দুই অংশের পাকিস্তান হবার পর থেকেই বাঙালিদের নিম্নবর্ণের লোক বলে উল্লেখ করতো পশ্চিম পাকিস্তানিরা। অথচ জনসংখ্যা থেকে শুরু করে পাকিস্তান আন্দোলন সর্বক্ষেত্রে বাঙালিরা ছিল এগিয়ে। কেন্দ্রীয় সরকারের বৈরি আচরণ এতোটাই তীব্র ছিল যে শিক্ষানীতি অর্থনীতি সহ রাজনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে সেটা চোখে পড়ত।

Reneta June

এই অবস্থায় তোষামোদি ও গদির নেশায় ব্যস্ত অনেক বাঙালি নেতা স্বাধিকার আদায় নিয়ে স্পষ্ট দিক নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন। এমন নয় যে বাঙালিদের মধ্যে উচ্চ মাপের রাজনৈতিক নেতার অভাব ছিল, তবে কেউ কেউ গণতন্ত্র, সর্বহারাদের অধিকার কিংবা কৃষক প্রজাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে সংগ্রামের ব্যস্ত ছিলেন। ফলে সার্বিক বর্ণ বৈষম্য পক্ষে কথা বলেননি কেউ।

নিজ জাতিকে নিচু করে রাখা হয়েছে এটা জেনেও তাদের কোন দুশ্চিন্তা ছিল না। বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে তখন কাঁপিয়ে দিতে শুধু একজনই পেরেছিলেন। বাঙালিদের মধ্যে থেকে তিনিই বুক টান করে অবাঙালি রাজনীতিবিদদের আঙ্গুল তুলে বলেছিলেন ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়’। এই মহান ব্যক্তিটির নাম শেখ মুজিবুর রহমান। নেতা হয়ে নয় একজন নিঃস্বার্থ বন্ধু হয়ে তিনি জাতির পাশে দাঁড়িয়েছিলে বলেই তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হয়।

তিনিই প্রথম বাঙালি যাকে আজো আমরা তার নাম ধরে না ডেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দেয়া উপাধি “বঙ্গবন্ধু’ বলে স্মরণ করি। এখানেই বঙ্গবন্ধু ভিন্ন। দেশের শাসক (যেমন প্রেসিডেন্ট) কিংবা রাজনৈতিক নেতা (যেমন সংগ্রামী জননেতা) নামের আগে এমন পদবী বা বিশেষণ না লাগিয়ে তাদের থেকে ভিন্ন হয়ে যে নামটি প্রতিদিন শতবার উচ্চারিত হয় সেটা হল ‘বঙ্গবন্ধু’। বঙ্গবন্ধু একটি নাম, একটি প্রতিষ্ঠান।

একটু চিন্তা করলেই দেখা যাবে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধের কারণে অথবা যেমনটি আমরা ইতিহাসে দেখে থাকি, দুজন শক্তিধর ব্যক্তির আদর্শিক দ্বন্দ্বের ফল কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ বা ভূখণ্ড দখলকে কেন্দ্র করে যেভাবে দেশ ভাগ হয়, তেমন করে কিন্তু পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ হয়নি। বাংলাদেশ হয়েছে ‘বাঙালি’ জাতির মর্যাদা বাঁচিয়ে রাখতে। শাসকদের বর্ণ বৈষম্যের পাকানো ছক ভেঙ্গে দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম।

তিনটি মাপ কাঠি যথা; ভাষা, জাতি এবং দেশ এর সব কিছুর সাথে যে শব্দটি জড়িত তার নাম হল বাংলা। সেই বাংলাকে রক্ষা করতে যিনি ডাক দিয়েছিলেন তিনি হলেন বাংলার বন্ধু, তথা বঙ্গবন্ধু। গোঁড়া থেকেই পাকিস্তান শাসকদের চক্ষুশূল ছিল ‘বাংলা’ শব্দটি। আমরা জানি রাষ্ট্রের কোন বিপদ এলে রাষ্ট্র রক্ষার কাজে এগিয়ে আসেন রাষ্ট্রনায়ক অথচ আমাদের সেটার প্রয়োজন ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্র নড়বরে অবস্থায় ছিল না, তবে সরকার এবং প্রশাসন তখন জ্বালিয়ে রেখেছিল বৈষম্যের আগুন। সেই আগুনই পাকিস্তানকে নিভিয়ে দিয়েছে। আমাদের করনীয় ছিল জাতিগত চেতনা জাগিয়ে তোলা।

বাঙালি জাতির ভৌগোলিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক মুক্তির দাবি তোলা। মোটা মোটা বই পড়া মহা পণ্ডিত এই সঙ্কট উত্তরণে বাঙালিদের জাগাতে পারেননি। এখানেই বঙ্গবন্ধুর সাথে অন্যান্য আইন পড়া, ডক্টরে ডিগ্রীধারী কিংবা সামন্ত প্রভু জাতীয় নেতাদের ভিন্নতা। তিনি মাটির গন্ধ নিতে পারতেন। নদীর জল চিনতে পারতেন। আরো পারতেন কবি সাহিত্যিক সঙ্গীত স্রষ্টাদের ভাষা বুঝতে। তিনি ইতিহাস পড়তেন বটে তবে ইতিহাস থেকে পাঠ নিতেন না। তিনি পাঠ নিয়েছেন বাংলার মানুষের জীবন থেকে। তিনি যাদের কথা বলতেন ঠিক তাদের অন্তরের কথাটাই নিজ মুখ দিয়ে বলতেন। কারো প্রতিনিধিত্ব করতেন না বঙ্গবন্ধু, তিনি হাজির হতেন বাঙালি হয়ে।

তার জীবনী পড়ে আমরা দেখেছি অন্যের দুঃখে তিনি কষ্ট পেতেন, অন্যের হাসি দেখে খুশিতে হাসতেন। আর সারাক্ষণ বলতেন আমার বাঙালি আমার বাঙালি। শুরুটা হয়েছিল এভাবে। বাঙালিরা দেখতে ছোট, বাঙালিরা কালো-শ্যামলা, তারা কুটির শিল্প ভিত্তিক স্বনির্ভর অর্থনীতি নির্ভরশীল। তারা ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করে না, ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণী-গোষ্ঠী হওয়া স্বত্বেও সহ অবস্থানে থাকতে ভালোবাসে। যে মসজিদে যায় সে আবার পূজার প্রসাদ খায়। তারা গণতন্ত্র বেশ বুঝে, ওদের মধ্যবিত্ত বড়ই সাধু প্রকৃতির। দুর্নীতি নেই বললেই চলে। ওরা ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসে। মাথা নিচু করে শহিদ মিনারে ফুল দেয়। বাঙালিরা ভূমি দাস হতে চায় না, ওদের মধ্য শ্রম দাস নেই, নেই জমিদার কিংবা সামন্ত প্রভু। সেই দেশটাকে কারো পক্ষে স্থায়ীভাবে মগের মুল্লুক বানানো সম্ভব হয় নি, পর্তুগীজ, ইংরেজ কারো আধিপত্য স্থায়ী হয় নি সেখানে। তাই পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার বুঝেশুঝেই মাঠে নেমেছিল। বাঙালিদের বাঙালিপনা ধ্বংস করে দিতে হবে, ভেঙ্গে দিতে হবে বাঙ্গালির শক্ত হাত। এই ভেঙ্গে দেবার পরিকল্পনাকে সফল করতে পাকিস্তানীরা খুঁজতে লাগল ভোঁদড় জাতীয় কিছু উভচর। যারা জাতে বাঙালি কিন্তু হুকুমে পাকিস্তানী।

তারপরের ইতিহাস সকলের জানা। বাংলা লিখতে হবে উর্দু অক্ষরে, উর্দু হবে রাষ্ট্র ভাষা। উন্নত জীবনের আশায় বাঙালিদের পশ্চিমমুখী করতে হবে। শিক্ষাদীক্ষা, চাকুরি ব্যবসা বাণিজ্য সব কিছুর জন্য পশ্চিম পাকিস্তানকে ভাবতে হবে পবিত্র স্থান। ‘বাংলা’ নাম দিয়ে শুরু হয় এমন কিছুকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। নন-বাঙালি খাদ্য অভ্যাসে অভ্যস্ত হতে হবে।  আদব লেহাজ, পোশাক-আশাক এমন কি রবীন্দ্রসঙ্গীত যদি এতোই প্রিয় হয় সেগুলো অন্য কাউকে দিয়ে লেখাতে হবে নতুন করে। কথাবার্তা আদব-কায়দায় নতুন কিছু সংযোগ করতে হবে যা বাঙালির নিজস্ব না। বাবার ভাইকে কাকা না ডেকে ডাকতে হবে ‘চাচাজান’।

কবিতায় শ্মশান থাকলে সেটা কেটে গোরস্তান করে দিতে হবে। ইতিহাস শুরু করতে হবে খুব কাছাকাছি সময় থেকে, যেমন মুঘল সাম্রাজ্য কিংবা পাকিস্তানের জন্য গণভোটের আন্দোলন। তার আগের ইতিহাস জানার যেন সুযোগ না থাকে। পশ্চিম পাকিস্তান তথা করাচী পিণ্ডি ইসলামাবাদ নিয়ে যাদের আগ্রহ তাদের খানদানী পাকিস্তানি মর্যাদা, আর নোয়াখালী বরিশাল খুলনা সিলেট এর মত গ্রাম মুখাপেক্ষীদের সাধারণ পাকিস্তানি এই দুভাগে বিভক্ত করে রাখা। অর্থাৎ যে সমস্ত রেসিপি শাসকদের মাথা থেকে বের হতে লাগল সেসমস্ত পরিকল্পনা কিছু কিছু বাঙালি কবি-সাহিত্যিক শিক্ষিত লোকদের হাত দিয়ে প্রচার প্রচলন ও প্রসার পেল। এই যে লেজুড়বৃত্তির বিরুদ্ধে কথা বলা এবং বিজাতিকরনের মহা পরিকল্পনা ভেঙ্গে নিজ জায়গাতে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার যে প্রচেষ্টা, তারই নাম বাঙালিপনা বা বাঙালির চেতনা। বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই চেতনার কাণ্ডারি।

এ কথা সত্য যে বঙ্গবন্ধুর আগে কিংবা তার যুগেও অনেকে বাঙালিপনাকে বাঁচিয়ে রাখতে কাজ করে গেছেন। কেউ শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে থেকেছেন সজাগ, কেউ অর্থনীতিতে, কেউ বিদেশ-নীতি কেউ বা ছিলেন শাসন-তান্ত্রিক প্রহরী। আবার অনেকেই লোক চক্ষুর আড়ালে বীজ বুনে গেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভেতর। কিন্তু সবচাইতে মূল্যবান যে কাজটি প্রয়োজন ছিল অর্থাৎ বাঙালি চেতনার ভিত্তিতে ঘরকুনো বাঙালিদের পথে নামিয়ে আনা, পুরুষদের পাশাপাশি রক্ষণশীল সমাজের নারীদের মুখেও স্লোগান তুলে দেয়া, শান্তিপ্রিয় জনগণকে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করা, সর্বোপরি বাঙালি চেতনার জোয়ার সর্বত্র জাগিয়ে দেয়া এগুলো বঙ্গবন্ধুই করেছিলেন।

একটি মাত্র পরিচয় ‘আমরা সবাই বাঙালি’ এই ভাবধারায় ঐক্য গড়ে তোলা শুধু তার দ্বারাই সম্ভব হয়েছিল। অতঃপর একটি অবহেলিত জাতিকে পশ্চিমাদের হাত থেকে স্থায়িভাবে রক্ষা করার জন্য নিজস্ব ভূঘন্ড অর্থাৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তাঁর হাত দিয়েই এলো।

আমি ব্যথিত হই কিন্তু অবাক হই না পনেরো আগস্টের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। কেননা শত্রু তার প্রতিশোধ নেবে সেটাই স্বাভাবিক। পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবার পর প্রতিশোধের নেশায় বৃহত্তর শক্তির দ্বারস্থ হয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসকবৃন্দ। ধনরত্নে ভরা মুরব্বি দেশগুলোর কাছে এরা বাংলাদেশের নামে বিদ্বেষ করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। শক্তিতে ও সম্পদে বলিয়ান অনেকগুলো রাষ্ট্র যদি একত্রিত হয়ে একটি দুর্বল দেশে তথা তার রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে লেগে থাকে তবে তাদের পরিকল্পনা সফল না হবার কোন কারণ নেই। বড়জোর সেই সমস্ত মুরব্বীরা শুধু এইটুকু দাবি হয়তো করেছিল যে প্রতিশোধ যা নেবার সেটা নিয়ে দিচ্ছি কিন্তু তোমরা শুধু ওদের ঐক্য ভেঙ্গে দাও।

যে ঐক্যের জোরে ওরা তোমাদের পরাজিত করেছিল সেটা ভেঙ্গে দিতে পারলে বাঙালিদের নেতৃত্ব শূন্য করার কাজটা আমরা করে দিতে পারবো। আবারো ভোঁদড়ের খোঁজ পড়ল। প্রতিশোধ পরিকল্পনার ছকে তারা যোগাড় করল বাঙালিদের একটি অংশ। অতঃপর মুরব্বিদের ইশারায় পনেরো আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যা প্রচেষ্টা সফল হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে যেমন লেজুড়বৃত্তি ছিল, শাসকদের মন্দ কাজের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য যেমন ছিল বিশেষ ভোঁদড় গোষ্ঠী। এখনো তাদের বংশধরেরা সেই ভয়ানক পরিকল্পনাকারীদের হুক্কাহুয়া সম্প্রদায় হিসেবে ঘাপটি মেরে বসে আছে আমাদের দেশে।

জাতীয়তা নিয়ে আমাদের গর্ব থাকলেও আমার এতো সভ্য-ভব্য জাতি না যে আমাদের মধ্যে দোআঁশলাদের অভাব কোন দিন কম থাকবে। দুঃখের বিষয়, এই গোষ্ঠী যখনি জয়ী হবে আমরা তখনই বন্ধু বিয়োগে ভুগবো, ওরা নাচ দেখাবে আমরা হাততালি দেব। ওরা বলবে বঙ্গবন্ধুর ছবির নিচে না যেতে আমরা কেউ ভয় পাব, কেউ লজ্জা নিয়ে বসে থাকবো।

কেউ বা এক কদম আগ বাড়িয়ে তাকে বঙ্গবন্ধু না বলে করবো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। যার যেটা ইচ্ছা করুক, তারা ভোঁদড় দেখুক, আমরা বঙ্গবন্ধুর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকবো ঝাপসা চোখে, তার সাথে কথা বলব মনে মনে। নিজে করবো এবং অন্যকে বলে যাব তারাও যেন সেই অবিনশ্বরের মত বাংলাদেশকে ভালবাসে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

BSH
Bellow Post-Green View