চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নীল মুকুট: ঘন ঘাটতির সুনির্মিত সিনেমা

শুরুতে বৃষ্টির শব্দ। মাথার ভেতরটা শীতল হয়ে ওঠে। পর্দায় উঠোনের ওপাশ জুড়ে ঘর, শীর্ণ ভেন্নাপাতির ছানি নয়, স্বচ্ছলতার জৌলুসও নেই। বৃষ্টিতে ভিজছে উঠোন, বাড়ির চাল থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল। ঘরের বারান্দায় পরিবারের মানুষজন। ক্লোজ-আপে একটা পাত্রে পানি পড়ছে। ক্যামেরা ঘরের ভেতর, একজন মা প্রায় ঘুমন্ত সন্তানের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন। এই মা একজন পুলিশ আরও কিছু নারী পুলিশের মতো জাতিসংঘের শান্তি মিশনে হাইতি যাচ্ছেন।

এভাবেই শুরু হয় ‘নীল মুকুট’। সিনেমাকার কামার বলছেন তিনি বানিয়েছেন একটি ডকু-ড্রামা, কেউ হয়তো বলবে ডকুমেন্টারি। সিনেমাকার বলছেন তিনি কোন গল্প বলার চেষ্টা করেননি, কিন্তু নীল মুকুট-এ একটি ন্যারেটিভ আছে। এ ন্যারেটিভে নারী পুলিশকে উর্দির উপযোগী করা হয় কষ্টসাধ্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। আমাদের কগনেটিভ মডেল (Cognitive model) জানায় উর্দির আছে ভয়ঙ্কর একটি চেহারা, শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে হলেও উর্দিধারীকে হতে হয় নৃশংস ও ভয়ানক। ‘নীল মুকুট’ উর্দির ভেতরের নারীকে দেখায়, যে সংসার ও ফেলে আসা সন্তানের আবেগে সারাক্ষণই আপ্লুত। এভাবেই এ সিনেমায়ও আছে একটি গল্প, যদিও তা গতানুগতিক নয়। সিনেমাকারের ছিল একটি চিত্রনাট্য, এবং সে অর্থে তিনি দাবি করছেন এটি শতভাগ ডকুমেন্টারিও নয়।

কামার আহমাদ সাইমন প্রথম সিনেমা ‘শুনতে কি পাও!’ থেকে এ শৈলীতেই সিনেমা তৈরি করছেন। ‘নীল মুকুট’ তাঁর তৃতীয় সিনেমা।

‘নীল মুকুট’ ১০২ মিনিটের সিনেমা, যার ৩৩ মিনিট বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ ও আবেগঘন বিদায়। বাদবাকি সময়টা হাইতিতে শান্তি মিশন। অর্থাৎ এর রয়েছে দুটো চ্যাপ্টার। প্রথম চ্যাপটারে নারী, যাকে সামাজিক ভাবে এখনও অবলা হিসেবেই গুনে আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্ব, শান্তিরক্ষার, প্রকারন্তরে যোদ্ধার, প্রশিক্ষণ নেয়। বাদচিত থেকে বুঝতে পারি হাইতি মিশনে আছে ঝুঁকি। আমরা মানসিক ভাবে তৈরি হই হাইতিতে কাজের পাটাতনে তাদের দেখবো। অর্থাৎ, তারা টহল দেবেন, আমরা দেখবো শান্তিরক্ষার পারিপার্শ্বিকতা ও প্রেক্ষাপট, যার ভেতর থেকে সিনেমাকার উর্দির কঠোরতার ভেতর দেখাবে নারীর কোমলতাকে অথবা পুলিশের মানবিক আচরণকে।

কিন্তু না, কিছু সামান্য ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে হাইতি চ্যাপ্টার মনে হয়েছে নারী পুলিশের অবসর কাটানো বিদেশ গমন—মেয়েলি খুনসুটি (হ্যা, সংস্কৃতিতে মেয়েলি বলে এক ধরনের আচরণ আছে, যেমন আছে পুরুষালি আচরণ, বহু বছরের চর্চায় যা অনেকটা অর্গানিক), এবং ক্ষণেক্ষণে সন্তান ও স্বামীর সাথে ভিডিও চ্যাট। ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজের ভেতরেও নারী সংসারে আষ্টেপৃষ্ঠে সম্পৃক্ত। এটা নারীর গুণ। কিন্তু এ গুণটির মহাত্ম ফুটে ওঠেনা পরিবেশের ঝুঁকি ও কাজের প্রতি তাদের নিষ্ঠার বিশ্বাসযোগ্য কোন ফুটেজ না থাকায়। অত্যন্ত সুনির্মিত হলেও নীল মুকুট এ কারণেই আমাদের চিত্তে প্রত্যাশিত কোন প্রভাব নাও ফেলতে পারে।

‘নীল মুকুট’ এর একটি দৃশ্যে…

অন্যভাবে বললে, ‘নীল মুকুট’ কিছু ঘন ঘাটতি নিয়ে একটি সুনির্মিত সিনেমা। হ্যান্ডহ্যাল্ড ক্যামেরায় প্রায় সবসময় ওয়াইড এঙ্গেল শটে বয়ান এগিয়ে যায়। কামারের ক্যামেরা আশ্চর্যজনক ভাবে অনুপস্থিত, কোন চরিত্রই ক্যামেরার উপস্থিতি জানান দেয় না, তাঁরা অবিশ্বাস্য রকম সাবলীল। সাধারণ মানুষকে চিত্রায়নে কামার যাদু জানেন। কিন্তু, সম্ভবত ‘গল্প বলব না’ এরকম একটি কনভিকশন থেকে তিনি একটি বার্তা বা উপলব্ধি গজিয়ে উঠতে যে পাটাতনের প্রয়োজন তা সচেতন ভাবে পরিহার করেছেন। ফলাফল: নারী শেষ পর্যন্ত অবলাই থেকে যায়। কেউ যদি প্রশ্ন করে, এতো মেয়েলি আড্ডা আর পরিবারের সাথে সারাক্ষণ চ্যাটে থাকলে কি পুলিশের কাজ করা সম্ভব? এরকম প্রশ্ন করার অবকাশ আছে এ সিনেমাটিতে। প্রশ্নটি আরও জোরালো হয় প্রায় শেষদিকে একজন নারী যখন গাইছে, পিরিতি শিখাইলা কেন, ছেড়ে যাইবা যদি। নীল মুকুট -এর ঘাটতি ঘন এ কারণে যে এতে সিনেমার অর্গানিক ইউনিটি অর্থাৎ ভাব ও আকারের গ্রন্থনা, ব্যাহত হয়েছে।

যা আছে তার একটি পজিটিভ আবেদন থাকতো যদি নারী পুলিশের আবেগ ও কোমলতা কর্ম ও পেশার প্রেক্ষাপটে গ্রথিত করা হতো।

ঐতিহাসিক আর রাজনৈতিক কারণে পুলিশকে নিয়ে আমাদের সমাজে সম্মানজনক ধারণা নেই। আমরা তো বলিই, বাঘে ধরলে এক ঘা, পুলিশে ধরলে ষোল ঘা। রাষ্ট্র পুলিশকে ন্যাক্কারজনক ভাবে ব্যবহার করে। কিন্তু এ যুক্তিতে পুলিশের অপরিহার্যতাকে অস্বীকার করা যাবে না। নাগরিকের প্রয়োজনেই রাষ্ট্রের দরকার পুলিশ। পুলিশ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী। তাঁদের কাজ দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। তাই যৌক্তিকভাবেই তাঁদের আচরণে থাকে কাঠিন্য, যা আসলে একটি আবশ্যকীয় কর্মকৌশল। এ কর্মকৌশলে পারঙ্গম না হলে নারী বা পুরুষ কেউই এ পেশায় উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে না। এরকম হওয়া উচিৎ ছিল না। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা পুলিশকে এরকমই হতে বলে। পেশাগতভাবে, আরও স্পষ্ট করে বললে, ডিউটির সময় একজন উর্দিধারীর হতে হয় দৃশ্যত কঠিন, যদিও উর্দির ভেতরের মানুষটি—নারী ও পুরুষ—অবশ্যই হতে পারে মানবিক, অন্তত তাঁর পরিবারে ও স্বজনদের কাছে। তাইতো সময় সময় ‘পুলিশও গাহিয়া ওঠে রবীন্দ্র সংগীত’।

বিজ্ঞাপন

‘নীল মুকুট’ এর একটি দৃশ্যে…

শুধু নারী পুলিশকে বেছে নিলে পুলিশের মানবিকীকরণ সম্ভব নয়; হয়তো এটা কামারের উদ্দিষ্টও নয়। কিন্তু কাজ ও প্রেক্ষিত থেকে বিচ্যুত করে নারী পুলিশের যে ইমেজ দেখানো হয়েছে তাতে উল্টোফল হিসেবে অনেকের কাছেই নারীকে এ পেশার জন্য উপযুক্ত মনে নাও হতে পারে। মনে রাখতে হবে মানুষের আছে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে তৈরি কগনেটিভ মডেল যার নিরিখে আমরা অবলোকন করি এবং অবলোকনের অর্থ করি। নারী ও পুলিশ নিয়ে আমদের যে কগনেটিভ মডেল নীল মুকুট সম্ভবত তা না ভেঙ্গে আরও জোরদার করবে।

এতোসব কথা বলছি একারণে যে আমরা সিনেমা দেখি সিনেমা আমাদের কিছু একটা দেয় বলে, এবং দেয়ার নিক্তিতেই মুল্যায়িত হয় একটি সিনেমা।

সিনেমা আমাদের কী দেয়? কেন দেখি সিনেমা? এর বহু উত্তর থাকলেও প্রায় সবাই-ই সিনেমায় বিনোদিত হতে চায়। মারমার কাহিনী, যৌনতার সুড়সুড়ি, চোখ ভিজিয়ে তোলা মেলোড্রামা, আবার কখনও প্রযুক্তির চোখ ধাঁধানো কারিশমা—সিনেমায় থাকে হরেক রকম বিনোদনের উপকরণ। বিনোদন পিয়াসী অধিকাংশের জন্য সিনেমা একটি ধারালো তলোয়ারের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া—চাই টানটান উত্তেজনা। অল্প কিছু আছেন যাদের কাছে সিনেমা চিন্তার ও অনুভবের খোরাক, যা উপলব্ধিতে একটা দার্শনিক টোকা দেয়। সিনেমা ভাবাদর্শে নাড়া দিতে পারে।

‘নীল মুকুট’ এর একটি দৃশ্যে…

উপলব্ধিতে টোকা দিতে সিনেমাকারদের আছে বিভিন্ন শৈল্পিক শৈলী, বিভিন্ন ভাবে তাঁরা সিনেমার রূপ দেন। কেউ লম্বা শটে ডিপ-ফোকাসে কিছু রূপায়িত করেন, যেমন হো সে শিয়েন। কিয়রোস্তামির সিনেমায় নেই কাহিনীর ঘনঘটা, কিন্তু তিনি কিছু একটা করেন, যা তাৎক্ষণিক ধাক্কা না দিলেও দিন যত গড়ায় আমাদের অনুভবে ততোই একটি ভিন্ন জগতের উন্মোচন ঘটায়। অন্যদিকে তারকভস্কি স্লো মোশনে জল ভাঙেন, দূর থেকে হাওয়া আসে, কিন্তু টানটান কোন কাহিনী থাকে না। তিনি সময়ের ভাস্কর। সময় বয়ে যায়, আমরা সিনেমাটিতে নিবিড় ভাবে ডুবে যাই। কারও সিনেমায় বাস্তব রিপ্রেজেন্টেড হয়, কেউ বাস্তবের উপরিকাঠামোর গহীন ভেতরটাকে উন্মোচন করেন, অথবা প্রণয়ন করেন এক অদেখা জগত যা চৈতন্যে অজানা শিস দেয়।

কামারের প্রথম সিনেমা ‘শুনতে কি পাও!’ একটি শিস দেয়া সিনেমা, যা পাইনি নীল মুকুট-এ। পেতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতাও নেই। কিন্তু কামার এ সিনেমায় একটি ভাবাদর্শ নিয়ে কিছু বলতে চেয়েছিলেন, বলেছেনও, কিন্তু তা কোন অনুরণন তৈরি করে না।

নীল মুকুট
নির্মাতা: কামার আহমাদ সাইমন
প্রযোজনা: সারা আফরীন
স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম: চরকি

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন