চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নীলসাধুর ‘কূর্চি এবং রোদছায়ার গল্প’

কূর্চি একটি ফুলের নাম। এই ফুল নিয়ে কবিতা লিখেছেন কালিদাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায়ও আছে কূর্চি ফুলের কথা। শেষ বসন্তের এই ফুল দেখতে সাদা, কমনীয় ও মোহময়ী। কূর্চি ফুল নিয়ে এরপর কবিতা লিখেছেন বুদ্ধদেব গুহ। আমাদের সময়ে সেই একই ফুলকে নিয়ে প্রায় মহা কাব্যিক এক প্রয়াস চালিয়েছেন এক কবি- তার নাম নীলসাধু।

নীলসাধু‘র কবিতার বইটির নাম- ‘কূর্চি এবং রোদছায়ার গল্প’। কবিতায় কবিতায় তিনি কাব্য ও গল্পের যৌথ প্রয়াস চালিয়েছেন। কাব্যিক ভাবে গল্প হাজির করার মহাকাব্য আমরা পড়েছি আগের কালের কবিতায়। মধ্যযুগের অনেক কাব্য এমন। মহাকাব্যের যেসব বৈশিষ্ট্য আছে তার অনেক ঘাটতি কূর্চি এবং রোদছায়ার গল্প কাব্যগ্রন্থের রয়েছে। কূর্চিকে নিয়ে এত কবিতা আছে, তার রূপের এমন সব বিবরণ গ্রন্থিত যে মনে হয় বুঝি মহাকাব্যের একটা ঝোঁক নীলসাধুর মনে মনে লুকিয়ে আছে, কিন্তু সাহস নেই।

পুরাতন মহাকাব্যগুলো বীরত্ব ব্যঞ্জনাময়। নীলসাধু নিতান্তই এক রূপসুধাপায়ী এখানে। কাম তাড়িত, সৌন্দর্য পিয়াসী পুরুষের সঙ্গে কূর্চির বহুবিধ সম্পর্কে আখ্যান এখানে রচিত হয়েছে। ফলে মহা কাব্যিক চরিত্র এখানে পাওয়া যাবে না। এখানে ট্রাজেডি নাই, বড় রকমের হাহাকার নাই, ঘটনার বিস্তৃতি কম। বরং এই কাব্যগ্রন্থ মৃদু ও মোলায়েম, একান্ত আপন নরনারীর প্রেম ও ভালোলাগার বয়ান।

বাংলার বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘আধুনিককালে মহাকাব্য লেখা হয় না। কারণ কী না লেখার? কারণ কি এই যে, লেখকের সময় নেই অত বড় লেখা লিখার, পাঠকেরও সময় নেই তা পড়ার? সেটা একটা কারণ যে তা অস্বীকার করা যাবে না। আরও একটা কারণ এই যে, আধুনিককাল ব্যক্তির জন্য বীরত্বের কাল নয়। লোকে এখন ব্যক্তির অসামান্য বীরত্বে আর আস্থা রাখে না। তাছাড়া মানুষ এখন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পরস্পর থেকে। মহাকাব্যে দেখি নায়কেরা অনায়াসে মিশে যান অনেকের সঙ্গে, গ্রিক মহাকাব্যে একসঙ্গে অনেক মানুষ যুদ্ধ করে, জাহাজে চড়ে, দেশে ফেরে; নায়ক সেখানে অনায়াসে বন্ধুত্ব করেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে; কিন্তু একালে তো সেটা সম্ভব নয়’।

আধুনিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক যুগে নীলসাধুর এই কবিতার বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে মহাকাব্য সম্ভব। বিশেষ ক্ষমতাহীন ব্যক্তি নিয়ে মহাকাব্য সম্ভব। অনেক কিছু না থাকার পরও কিছু একটা হয়ে ওঠার, অন্তত প্রস্তাব আকারে সাহিত্য পরিসরে তা তুলে ধরার একটা আঁচ বইটিতে আছে। ভবিষ্যতে দীর্ঘ ও মহাকাব্যিক কবিতা নীলসাধু লিখবেন নিশ্চয়।

তার কবিতাগুলো রোমান্টিক যুগের কাব্যচর্চার ধারাবাহিকতা। ইংরেজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডস ওয়ার্থ, স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ, লর্ড বায়রন, শেলি- প্রমুখ কবিরা যে রোমান্টিকতার বান বইয়ে দিয়েছিলেন কবিতায়, তার সন্তান নীলসাধু। এই কবিরা ফরাসি বিপ্লব তথা আলোকায়নের সমর্থক। তখনকার সংঘাতময় রাজনীতি ও সমাজের বাইরে থেকে তারা কল্পনায় সওয়ার হয়েছিলেন। আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রকৃতির কোলে। তাদের ভঙ্গি হয়ে উঠেছিলে শিশুতোষ। তবে নীলসাধু আবার হুবহু তাদের মতো নন। তার কিছু অসাধু ব্যাপার আছে। কী সেগুলো পরে বলছি।

নীলসাধুর কবিতা যেমন ধরা যাক অবিনাশী ক্ষুধা- নিঃশ্বাসে কাঁপে/মধ্য দুপুরের ঘর্মাক্ত শরীর/যুগল আলিঙ্গনে/দরবেশ মন বিভ্রান্ত,/মৃত্যু মাধুরী ঠোঁট/সকল নগ্নতা চুষে/কামড়ে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলে কোমলতা/নতজানু রাজকুমারীর/ময়ূরীর পালক/ বসন।

নীলসাধুর কবিতার সমস্ত কারবারই প্রকৃতির মধ্যে। মানুষ, সমাজ, সংসার তেমন নেই। এই যে কবিতায় আছে ‘দরবেশ মন’- মানে সন্ন্যাসী মন। এই সন্ন্যাস ভর করেছে কবিতায়। কবি তার মানবিক গুণাবলির সব কিছুরই প্রকাশ ঘটান রূপকের মাধ্যমে। মেটাফোর যাকে বলে। দুটি সত্ত্বার অস্তিত্ব এখানে আছে। যাদের মধ্যে যুগল আলিঙ্গন ঘটে। এদের একজন পুরুষ বলে বুঝে নেয়া যায় সহজে। যিনি সকল নগ্নতা চুষে, কামড়ে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেন কোমলতা।

একটা স্বপ্ন বিহ্বলতার মধ্যেই থাকেন কবি, তার পাঠককেও সেই আবেশ দেন। কেন বলছিলাম মহাকাব্যের সম্ভাবনার কথা সে প্রসঙ্গে আসি। প্রথম কবিতায় কূর্চি পাখি-তে পাই, ‘কবে হয়েছিল শুরু?/কখন হলো শেষ!/আমি তো জানি শুধু আমিই হয়েছি নিঃশেষ../..আকাশে ভেসে যাবার আগে পাখিটি শুধু এই কথাটিই বলে যায় মেঘেদের!’

এখানে কূর্চি নামে একটি পাখির দেখা পাই আমরা যে নিরুদ্দেশে চলে যায়। সে কোথায় এবং কেন চলে যায় জানা যায় না। তবে তার যাওয়া বেদনা বিধুর। পরবর্তী কবিতাতেও আছে কূর্চি। মনে হবে কূর্চি কোথাও এসে হাজির হয়েছে, ‘.. কূর্চির মুখে মেঘের মতন কালো চুলের নেকাব’ (কূর্চি এবং আগুন পাখি…)।

এরপর ‘সেই রাতেই’ কবিতায় আবারো কূর্চি। সে বুঝি এক প্রেমিক ডাকাতের খপ্পরে পড়েছে। সেই রাতে যে সর্বস্ব লুটে নেবে কূর্চির। এরপরও কূর্চিকে নিয়ে বেশ কিছু কবিতা আছে। যাতে একটি ঘটনার ধারাবাহিকতা অনুমান করে নেয়া যায়। এখন যদি পুরো কবিতার বইটিই হতো কূর্চির পরিণতি নিয়ে, শুধু তাকে নিয়েই তাহলে সমালোচক হিসেবে আমি একে মহাকাব্য বলে যুক্তি দিতে পারতাম। সেই সুযোগ নেই।

কিন্তু রোমান্টিক কবিদের কাতারে নীলসাধুকে রাখা যাচ্ছে । যারা নিজেদের প্রেম, দুঃখ সব নিয়ে প্রকৃতির কাছে এসে ফরিয়াদ করে। ঈশ্বর নির্ভরশীলতার বিপরীতে প্রকৃতির কাছে এসে নিজেদের ‘হালকা করার’ ইচ্ছা প্রকাশ করেন তারা। এটা কবিতার আধুনিক চেহারা। যেমন- ‘লোহিত সাগরের তীরে বিষণ্ণ বিকেল/বালুকা বেলায় দাঁড়িয়ে আমি/তরঙ্গে তরঙ্গে নাচে কষ্টের জলযান/তাৎপর্য হীন অভ্যন্তরে কাঁদে মরা চাঁদ/প্লাবিত হই ব্যাধিতে;’।

রোমান্টিক কবিরা অবশ্যই আধ্যাত্মিক হন। নীলসাধুও তাই। বাস্তবের পৃথিবী তাদের ভালোবাসে না। এই নামে একটি কবিতাও লিখেছেন তিনি, ‘এই পৃথিবী আমাদের ভালোবাসেনি!’। কিন্তু এই বৈরাগ্যের কারণ কি? কারণ হলো বাস্তবের পৃথিবীতে নিগৃহীত হওয়া, ধর্ষিত হওয়া। এই কবিতায় রেহেনা ধর্ষিত হয়। কিন্তু ধর্ষকের বুকে ছুরি মেরে তাকে হত্যার দায়ে রেহেনার ফাঁসি হয়। অনেক সহবত রেহেনা তাকে শিখিয়েছেন মা, কিন্তু ছুরি মারতে হয় কীভাবে তা শেখাননি। তবু অপমানিত না হওযার ক্রোধে আপনা হতেই ছুরি বসে যায় ঘাতকের বুকে।

আত্মরক্ষার প্রয়োজনে পুরুষ খুন করে ফেঁসে যায় নারী। ফলে এই কবিদের আর ভালো লাগে না বাস্তবের পৃথিবী। তারা কল্পনায় এক পৃথিবী তৈরি করে। যেখানে প্রেম আছে, বিরহ আছে, প্রণয় আছে। আর নীলসাধুর কবিতায় বিস্তর রোদ, ছায়া আর বৃষ্টি আছে। প্রেয়সীর হাসিতে বৃষ্টি শেষে রোদ আসে, কষ্টে মেঘ জমে আকাশে-ইত্যাদি। তারা এমন এক স্বপ্ন চরাচরে চলে যায় যেখানে, ‘না পারার আক্ষেপ নেই। কাছে যাবার তাড়া নেই!’ তাদের শুধু ‘আলিঙ্গনের তুমুল ইচ্ছে’। কবিতার শুরুটা এমন – ‘আলিঙ্গনের তুমুল ইচ্ছেটা বৈশাখের একলা দুপুরে/রাধাচূড়ার হলদে আভায় ভেসে কূর্চির শাড়ির সবুজ আঁচলে মিশে যেতে থাকে!’ রোমান্টিক কবিদের মতো নীলসাধুরও সবকিছু প্রাকৃতিক। ‘আমি ডুবে যেতে চাই তোর মাঝে’ কবিতায় আছে- ‘কাননিকা জুড়ে অজস্র বুনো ফুলে আমি তোর ছায়া দেখি/তারা যেমন টিপটিপ করে জ্বলে নিভে/তেমনি আমার বুকে তুই জ্বলতে থাকিস অবিরাম;/আমি ব্যথাতুর রাত পাখি হয়ে/ঘুরে বেড়াই/ জনপদ থেকে জনপদে।’

যেন তারারা মিটি মিটি না জ্বললে টিপটিপ করে বুকের মাঝেও প্রেম জ্বলত না। অথবা রাত পাখি না থাকলে জাগা যেত না। এসব রোমান্টিকতা আমরা জীবনানন্দ দাসের কবিতায় পাই, তবে ভিন্নভাবে। নীলসাধু জীবনানন্দের কবিতার অনুসারী বলতে হয়।

নীলসাধুর কয়েকটি দীর্ঘ কবিতা আছে। যা তার কবিতা লেখার ক্ষমতাকে প্রকাশ করে। তবে তিনি কেন পুরোপুরি ইউরোপীয় রোমান্টিক নন তার কারণগুলো এবার বলি। শেলি বলেছিলেন, কবিতার আইন প্রণেতা, যদিও সেই স্বীকৃতি তাদের নেই। কিন্তু নীলসাধুর তেমন উদ্দেশ্য নেই। তিনি নীতি অথবা আদর্শ প্রচারক নন। বরং তিনি একান্ত গোপন প্রেমিক পুরুষ। তার পুরুষরা সদা প্রকৃতি তথা নারীর দিকে যেতে চায়। নারীকে পেতে চায়। নারীর মধ্যেই তার সকল প্রশান্তি লুকিয়ে। যৌনতায় লিপ্ত হতে চায়। প্রাকৃতিক এক জীবনের কথা বরং বলা আছে নীলের কবিতায়। কোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত তিনি প্রণয়ন করেন না, কাউকে কিছু মানতেও বলেন না। ইনফ্যাক্ট কাব্যই করেন তিনি। বৃষ্টি, বসন্ত, শ্রাবণ, শিমুল, কাশবন এসব নিয়েই তার বাস। এসবের আড়ালে তারা মিলন ও বিরহের কাহন।

যৌনতা নীলসাধুর কবিতায় ভালোভাবেই আছে। যৌনতাকে কবি উপভোগ করতে চান। নারীর লাজ ঘুচিয়ে দিয়ে তাকে উদ্দীপ্ত করা পুরুষের দেখা আমরা পাই তার কবিতায়। নারী ও পুরুষের দার্শনিক যে উপস্থাপন পশ্চিমের দর্শনে আছে তার দেখাও নীলসাধুর কবিতায় রয়েছে। নীলসাধুর পুরুষ কাম তাড়িত, সে প্রকৃতি তথা নারীর কাছে যায়। নারী তাকে ভালোবাসায় জড়িয়ে নেয়। দুইয়ের মিলনে নতুনের সৃষ্টি হয়। সুখানুভূতিও তো সৃষ্টিরই ব্যাপার। আনন্দ যে জাগে তাতেও সৃষ্টি থাকে। সুখও সৃষ্টি করতে হয়। নীলসাধু প্রণয়ের মধ্য দিয়ে এসব স্ফূর্তি জাগ্রত করেন।

ভাষার দিক দিয়ে তিনি শুধু একটি কবিতায় ব্যতিক্রম। গণ মানুষের রুচি হঠাৎ তার কবিতায় ধরা দিয়েছে। অন্যথায় প্রেমের মতো ভাষাতেও তিনি দেখেছি বেশ প্রমিত ঘরানার। শুধু অল্প কয়েকটি কবিতায় ব্যতিক্রম- ‘আমার ডর করে’ এর একটি, আরেকটি হলো, ‘একজন উলঙ্গ মানুষ’ (এই কবিতায় অবশ্য নীলসাধু পার্থিব)। ‘কপিলা’ কবিতায় আছে- ‘আমারে ঘুম পারাইতে হইলে/তার আগে কারে ঘুম পারাইতে হইবো জানস?/ও মাগো! থাক কইতে অইব না/ তুমার কুন শরম নাই!’

নীলসাধুর কবিতা পড়তে ভালো লাগে। তার এই রোমান্টিকতা কমই পাওয়া যায় বাংলায়। তিনি যেন একটা ‘স্বর্গ’ কোথাও খুঁজে পেয়েছেন। সবকিছু থেকে নিজেকে আড়াল করে নিয়ে কাব্য করার মন তার রয়েছে। মাঝে মাঝে যদিও বাস্তবের পৃথিবীতে ফিরে আসেন। কিন্তু তার মূল প্রবণতা উড়ু উড়ু রোমান্টিকতা। বর্তমান সময়ে অনেক নীতি, উদ্দেশ্য ও কর্ম পরিকল্পনা, রাগ, ক্ষোভ নিয়ে কবিতা লেখার দলে তিনি নেই। ফলে তাকে অনন্য এক কবি বলা যায়। তিনি কাব্য চর্চায় রত। কাব্য লেখেন। সুন্দর একটা পটভূমি রচনা করেন। তার রোমান্টিকতা ছড়িয়ে যাক সবার প্রাণে।

‘কূর্চি এবং রোদছায়ার গল্প’
নীলসাধু
প্রকাশক: শ্রাবণ প্রকাশনী
১৩২ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
দাম- ১৮০ টাকা।

সৌজন্যে: বইনিউজ।