চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নিসফু মিন শা’বান

এক.
পনেরো শাবান। গভীর রাত। মুমিনদের মা হঠাৎ আঁচ করলেন রাসুলে মকবুল বিছানায় নেই। প্রেমাস্পদ কোথায় গেলেন? উৎকণ্ঠা! অজানা ভয়। চারিদিকে শত্রুর অভাব নেই। মাকড়সার জালের মত ঘিরে আছে। সুযোগ পেলেই আক্রমণ করার সম্ভাবনা। বের হয়ে গেলেন ঘর থেকে। খুঁজতে হবে। সতর্কদৃষ্টে এগিয়ে চললেন। মদিনা মোনাওয়ারার বিখ্যাত কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকি’। নবীপত্নী নবীর খোশবো নিতে নিতে ওখানে চলে গেলেন। দুনিয়ার বাদশাহ ওখানেই। জিয়ারত করছেন। ‘মরা মানুষের’ জিয়ারত। যারা কবরে শায়িত আছেন। নবীজি যা করেছেন, তা সুন্নাত। উত্তম কাজ। তাতে সওয়াব আছে। তাই আমরাও করি। করতে থাকবো। নবীজির চোখ। জাহের-বাতেন অগোচর নয়। হুয়াল আওয়ালু, ওয়াল আ-খিরু, ওয়াযজ্বা-হিরু, ওয়াল বা-তিন। সবজান্তা।

তবু প্রশ্ন: আম্মাজান আয়েশা (রা.)- এর প্রতি। সন্দেহ-সংশয় কিছুই না। একটু নাড়িয়ে দেখা। স্বামী-স্ত্রীর মধুর দুষ্টুমিতে এ ধরনের প্রশ্ন নেতিবাচক নয়। মনের আবেগটা মুখ দিয়ে বের করে আনার প্রয়াশে এমন প্রশ্নের উদাহরণ অগুনতি। ‘তুমি কি এই আশঙ্কা করছো যে, আল্লাহ এবং তাঁর রসুল (দ.) তোমার সাথে অবিচার করবে?’ ‘সিদ্দিকজাদী’ ভড়কে গেলেন না। শান্তসুরে জবাব দিলেন- ‘ভেবেছিলাম আপনি অন্য কোন স্ত্রীর ঘরে তাশরীফ নিয়েছেন হয়ত!’ আম্মাজান এমনটা ভাববেন না কেন? নবীজি যে সর্বোত্তম হক আদায়কারী। আমি বলছি না। মা আয়েশাও না। জন্মের শত্রু মক্কার কাফের-মুশরিকদের মাধ্যমে স্বীকৃত। হুযুর এবার অমীয় বাণী শোনালেন- “শা‘বানের পনেরো তারিখের রাত। মহা-মর্যাদাবান।

বিজ্ঞাপন

এ রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে বিশেষ তাজাল্লী বর্ষণ করেন। শুধু তা নয়। মক্কার বিখ্যাত গোত্র ‘বনু কালব’- এর ভেড়া-বকরির পশমগুলোর চেয়েও অধিক সংখ্যক পাপীকে মার্জনা করেন।” ভেড়া-বকরি। কেবল উদাহরণ মাত্র। লক্ষ্য- আধিক্য বুঝানো। কেননা ঐ গোত্রের ভেড়া-বকরি মক্কার জমিনে সর্বাধিক। বুঝা যায়, ঐ রাতে কতজনের পাপ মাফ হবে, আল্লাহ এবং রসুলই ভালো জানেন (১)।

অন্য হাদিসে তার প্রমাণ মেলে। হাদিসটি বিরুদ্ধবাদীদের আলবানিকর্তৃক স্বীকৃত সহীহ। হযরত মুয়াজ বিন জাবাল (রা.)- এর বর্ণনা। রাসুলে আকরাম, সরকারে দো’জাহান (দ.)- এঁর ইরশাদ- ‘মধ্যশাবানের রাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর সমস্ত মাখলুকের প্রতি বিশেষ মনযোগ আরোপ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যক্তি ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেন’(২)।

সমর্থন পাওয়া যায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) এর হাদীসেও। রাসুলে দো-জাঁহার ইরশাদ মোবারক—‘পনেরো শা‘বানের রাত্রে(নিসফে মিন শা’বান) মাওলায়ে কায়েনাত তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করে দেন। কেবল দুজন বঞ্চিত। প্রথম জন ‘পরশ্রীকাতর’, অন্যজন ‘বিনা কারণে হত্যাকারী’’ (৩)।

হাদীসের ভাষায় যেটি ‘নিসফে মিন শা‘বান’, কুরআনের ভাষায় সেটি ‘লাইলাতুম-মুবারাকাহ’ (৪)। ভারতীয় উপমহাদেশে ‘শবে বরাত’ বা ‘লাইলাতুল বরাত’। ইরান ও আফগানিস্তানে ‘নিম শা’বান’। মালয় ভাষাভাষীগণের কাছে ‘নিসফু শা’বান’। তুর্কিরা বলে ‘বিরাত কান্দিলি’।

তবুও অনেকেই এটিকে বেদাত বলে। কারণ হিসেবে বলে, ‘শবে বরাত’ শব্দদ্বয় কুরআন-হাদিসের কোথাও নেই। দেখুন, ‘নামাজ’ শব্দটিও কুরআন-হাদিসে কোথাও নেই। কিন্তু এর বদলে ‘সালাত’ আছে। একইভাবে ‘রোযা’র বদলে ‘সওম’, ‘বেহেশত’র বদলে জান্নাত, ‘দোজখ’র বদলে জাহান্নাম। তেমনি ‘শবে বরাত’- এর বদলেও ‘লাইলাতুম-মুবারাকাহ’ কিংবা ‘নিসফে মিন শা’বান’ আছে। সুতরাং এ আপত্তি সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য।

বরাত না হয় মানলাম, ইবাদত করতে হবে কেন? হালুয়া-রুটি কোথায় আছে? প্রশ্ন করা যায়, ঐ রাতে ইবাদত করা নিষেধ আছে কোথায়? নাই। তবে ইবাদতেও নিষেধাজ্ঞা জারি করার সুযোগ নাই। কারণ, যা নিষিদ্ধ নয়, তা’ই তো সিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা জীন-ইনসান তাঁরই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং, রাতজুড়ে ইবাদত কোনো অসুবিধা নেই। সারাবছর করে না। বরাতের উচিলায় হলেও অন্তত একটা রাত মাওলার সান্নিধ্যে কাটানোটা মন্দের ভালো। গভীর রাতে মাওলার প্রেমে সিক্ত আঁখি দুটিই মাওলার নিকট সবচে’ প্রিয়। তাই, খোদার দরবার থেকে কাউকে ফিরিয়ে আনতে চাওয়া মোটেও উচিৎ নয়।

বিজ্ঞাপন

হালাল খাবার হালুয়া-রুটিতেও আপত্তি শোনা যায়। বিশেষ দিনকে কেন্দ্র করে খায়- এতেই সমস্যা। দেখুন, ঈদুল ফিতরে সেমাই-নুডুস-পলান্ন ইত্যাদি খাই আমরা। ওটা কিন্তু খাওয়ার বিশেষ দিন না। ঈদ পেয়ে আনন্দিত হয়ে খাই। কোনো একটা উপলক্ষকে কেন্দ্র করে খাওয়া সুন্নাত। অতএব, বরাতের হালুয়া-রুটিতে সমস্যা থাকার কথা না। আমের সিজনে আম, জামের সিজনে জাম, লিচুর সিজনে লিচু খাওয়াতে যদি দোষ না থাকে, তবে বরাত নামক ইবাদতের সিজনে হালুয়া-রুটিতে দোষের কিছু নাই।

দুই.
রাসূলে আকরাম নামাজ পড়ছেন। মেরাজ-রাজ, যিনি নামাজ এনেছেন তাঁর নামাজ। ভাবা যায় কত প্রেম তাতে? কত আবেগ সে নামাজে? সে নামাজের মকবুলিয়্যত কীরূপ! আচ্ছা, যিনি নামাজ এনেছেন, তাঁরও বুঝি নামাজ পড়তে হয়?

দীর্ঘক্ষণ তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে রইলেন। সচরাচর এমনটি দেখা যায় না। পা মোবারক দুটোকে এবার ছুটি দিলেন। চলে গেলেন সিজদায়। সে এক দীর্ঘসময়ের ঘটনা। সিজদায় গেলেন তো গেলেন, উঠার নামগন্ধ নেই! আম্মাজান আয়েশা বেশ ভড়কে গেলেন। সাড়া-শব্দ নাই, নড়াছড়া নাই। আহ্, সিজদা! আচ্ছা, সিজদা যদি স্রষ্টা আর সৃষ্টির মিলনের ক্ষেত্রে নেটওয়ার্কের মত কাজ করে, তবে সে সিজদা কীরূপ? যিনি করছেন, আর যাঁকে করছেন উভয়ের রসায়ন কীরূপ? সিজদা কতটা মধুর হলে এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিজদায় কাটিয়ে দেয়া যায়? নিস্তব্ধ রজনী।

আম্মাজান মনে মনে ভীষণ ভয় পেয়ে বসলেন। রসুলে আকরাম এত দেরি করছেন কেন? কোনো অঘটন ঘটে যায় নি তো? মুখে শব্দ করাও কঠিন, পাছে নামাজের কোন অসংযোগ হয়ে যায়! হার্টের ক্রিয়া-কলাপও প্রায় বন্ধ হবার যোগান। ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেন। জান্নাতকা মালিকের পা মুবারকে স্পর্শ করলেন। স্পন্দন অনুভূত হলো! আহ্, শান্তি! স্পন্দনটা যেন রসুলে অতুলের পা মোবারক হতে নিজের অন্তরে অনুভূত হলো। একটু আগেও যে শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিলো প্রায়। হঠাৎ কানজোড়া সংজ্ঞায়িত হলো। কী যেন একটা শব্দ আসছে। ঠিক যে স্থানে নবীজি সিজদা করলেন ওখান থেকে। কান দুখানা আরো একটু প্রশস্ত করে দিলেন।

এবার স্পষ্ট শুনা যাচ্ছে- ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আয়ুযু বিআপয়িকা মিন ইক্বাবিকা, ওয়া আয়ুযু বিরিজ্বা-য়িকা মিন সাখাত্বিকা, ওয়া আয়ুযু বিকা মিনকা, লা আহস্বী ছানা-আন আলাইকা আনতা কামা আছনাইতা আলা নাফসিকা’–‘হে জগৎরাজ! তোমার বিচার চাই না, অনুকম্পা চাই। যত অসন্তোষ-ক্রোধ আছে, সেগুলির বিপরিতগুলো দান করো। আমি তো তোমার প্রতিই ধাবমান। তুমি ঠিক তেমন তুমিই, যেমনটা তুমি বলেছিলে’।

‘তুমি ঠিক তেমন তুমিই, যেমনটা তুমি বলেছিলে’। সিজদা ঠিক এমনই হওয়া চাই, যে সিজদায় বলে দেয়া যায় আল্লাহ কেমন। যে সিজদায় খোদা তাআলার নিকট নম্র হয়ে, বিনীতাবস্থায় ‘হে জগৎরাজ! তোমার বিচার চাই না, অনুকম্পা চাই। যত অসন্তোষ-ক্রোধ আছে, সেগুলির বিপরিতগুলো দানিও। আমি তো তোমার প্রতিই ধাবমান’ টাইপের মধুর আলাপ করা যায়! আর সিজদা যদি এমন সিজদা হয়, তবে তার মকামিয়্যত অনুধাবন জরুরী। অতএব বলা অপরাধ- ‘রসুল আমার মতো’। যারা বলে তাদের কাছ থেকে দূরে থাকা উচিৎ।

নবীরাজ নামাজ সমাপ্ত করলেন। আম্মাজান আয়েশা শিহরিত। মনের ভেতর তোলপাড় চলছে। প্রশ্ন করবে করবে ভাবতে ভাবতেই উল্টো প্রশ্ন শোনে বসেন- ‘হে আয়েশা! তুমি কি জানো, আজ কোন রাত?’ অটোমেটিক সিস্টেমে উত্তর আসে- ‘আল্লাহু ওয়া রাসূলু আ’লামু- আল্লাহ এবং তাঁর রসুলই অধিক জ্ঞাত’। ‘‘এটা পনেরো শা’বান। এ রাতে বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত প্রার্থনাকারিদের মার্জনা করা হয় (৬)’’ বলতে বলতে রসুলে কাওনাইন অবসর গ্রহণ করলেন…

এসব প্রমাণাদির পরেও যদি কেউ শবে বরাতকে বেদাত বলতে চায়, তবে তার জন্য কুরআনের এই বাণী দিয়েই ইতি টানি- “তোমাদের মুখে যা আসে তাই বলে দিও না- এটা হালাল ওটা হারাম। এতে আল্লাহর নামে সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা চালানো হবে। আর যারাই আল্লাহর নামে এ ধরনের মিথ্যা কথা প্রচার করে, তারা কখনই কল্যাণ বা সাফল্য লাভ করতে পারে না” (৭)।

তথ্যসূত্র
(১) তিরমিযী শরীফে, ইমাম ইবনে মাজাহ তাঁর সুনানে, ইমাম বায়হাকী তাঁর শুয়াবুল ঈমানে, ইমাম ইবনে আবী শাইবাহ তাঁর মুসান্নাফে, ইমাম বগবী তাঁর শরহেস সুন্নায়, ইবনে আহমদ তাঁর মুসনাদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
(২) সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫৬৬৫,
(৩) মুসনাদে আহমদ-৬/১৯৭, হাদীস-৬৬৪২,
(৪) তাফসীরে কবীর, তাফসীরে রুহুল মাআনী, তাফসীরে রুহুল বায়ান, তাফসীরে কুরতুবী, তাফসীরে তবরী, তাফসীরে বগবী, তাফসীরে খাযেন, তাফসীরে ইবনে কাসির ইত্যাদি।
(৫) উইকিপিডিয়া।
(৬) বায়হাকি শুয়াবুল ইমান। ৩য় খণ্ড- ৩৮৪-৩৮৫। হাদিস নং- ৩৮৩৫।
(৭) সূরা নাহল: ১১৬।