চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নির্বাচন কমিশন কি পারবে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রমুখী করতে?

ভোটাররা যে ভোট দানে আগ্রহ হারিয়েছে তা দৃশ্যমান হলো ঢাকা উত্তরের সিটি নির্বাচনে৷ সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় উঠে এসেছে ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের না যাওয়ার খবর৷ এ নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শাফিন আহমেদ বলেছেন, জাতীয়সহ বেশ কয়েকটি নির্বাচনে অনিয়ম হওয়ায় ভোটাররা সিটি নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

ভোটারদের উপস্থিতি কম নিয়ে সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে শাফিন আহমেদ বলেন, কম ভোটার মানে নির্বাচনে মানুষের আস্থা কম। ভোটারদের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়ভাবে কম। গত নির্বাচনগুলোতে অনিয়ম হওয়ায় ভোটাররা ভোট দেয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংবাদপত্রে আরও খবর বেরিয়েছে, মিরপুর বাংলা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট চারটি কেন্দ্র। ১৪৭ নং কেন্দ্রটি মহিলাদের। এ কেন্দ্রে মোট চারটি বুথ। এরমধ্যে দু’টি বুথে কোনো ভোটই পড়েনি। আর দু’টির একটিতে দু’টি, একটিতে ১০টি ভোট পড়েছে ।কেন্দ্রের ১নং বুথের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার রুম ছেড়ে অন্যদের নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। অপেক্ষায় থাকছেন একটি ভোটও যদি তার ব্যালট বক্সে পড়ে।কিন্তু ঘড়ির কাঁটা দুপুর ২টা অতিক্রম করলেও কোনো ভোটার ভোট দেয়নি তার বুথে। এরইমধ্যে রাস্তা থেকে এক নারীকে আসতে দেখে ভেবেছিলেন তার ভোট শূন্যতা কাটবে৷ কিন্তু তিনিও অন্য বুথের ভোটার। হতাশা নিয়ে এ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার বলেন, ভাই যদি একটা ভোটও পড়তো। লজ্জায় কিছুই বলতে ইচ্ছে করে না। আর দুই ঘণ্টায় যদি একটা দুটোও ভোট পড়তো। এমন নির্বাচন আর কখনোই দেখিনি। একই চিত্র এ স্কুলের প্রায় সবগুলো কেন্দ্রের কক্ষগুলোয়।

৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে ভোটারদের ভোট দিতে না পারার খবর দেশি-বিদেশি সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে৷ এ কারণেই মানুষ হয়তো সরকার দলের প্রতীক হতেও মুখ ফিরিয়ে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীমুখী হয়ে উঠছে৷ তার প্রমাণ দেখা গেল পটুয়াখালী পৌরসভা নির্বাচনে৷ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী কাজী আলমগীরের চেয়ে ছয়গুণ বেশী ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী মহিউদ্দিন আহমেদ।

বিজয়ী প্রার্থী মহিউদ্দিন সদ্য আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত ও পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি। তিনি এবার পটুয়াখালী পৌরসভার নির্বাচনে জগ প্রতীক নিয়ে নৌকার বিরুদ্ধে লড়েছেন। এমন নমুনা আসন্ন উপজেলা পরিযদ নির্বাচনেও দেখা যাচ্ছে৷ অধিকাংশ উপজেলাতেই দল মনোনীত প্রার্থীর চেয়ে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরাই ভোটের দিক থেকে এগিয়ে৷ আর একটি কথা হল এই বিদ্রোহী প্রার্থীরাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কিছুটা হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করল৷ না হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো এখানেও বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার ঘটনা ঘটতো৷

কিন্তু দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই৷ অধিকাংশ উপজেলাতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীরাই৷ ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এনে নির্বাচন হতে সরে দাঁড়াল ২০ দল, ঐক্যফ্রন্ট, বিএনপি, বামগণতান্ত্রিক জোট৷ ঢিলেঢালা ভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে কেবল ১৪ দল ও মহাজোটের শরীকরা৷ জাতীয় পার্টির প্রার্থী সিটি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলল৷ ১৪ দল শরীকরাও হয়তো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পরে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিরোধী দলের লাইন ধরবে তাই নয় কি?

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ঢাকা সিটি নির্বাচনেও কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)।কিন্তু এমন নির্দেশে ভোটার উপস্থিতি কি বাড়লো? দেশের বিভিন্ন উপজেলায় আওয়ামী লীগের অনেক বিদ্রোহী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিল নির্বাচন কমিশন৷ তাদের এসব বাতিল ন্যায্য হলে হাইকোর্ট কিভাবে তাদের মনোনয়ন ফিরিয়ে দিল? এক্ষেত্রে যদি বলা হয় নির্বাচন কমিশন এসব প্রার্থীদের সাথে অন্যায্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা কি অযৌক্তিক বলা হবে? ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করলেন নিজেদের দায় এড়িয়ে গেলেন৷ সিটি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুললো মহাজোট শরীক জাতীয় পার্টি৷ উপজেলা নির্বাচনে যদি ১৪ দল শরীকরাও অভিযোগ তোলে? অভিযোগ তোলে আওয়ামী লীগ দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীরা? ২০ দল, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোট জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচন বর্জনের লাইনে গেল৷ ১৪ দল, মহাজোট ও আওয়ামী লীগ দলীয় বিদ্রোহীরাও সে লাইনে গেলে সে দায়ও কি রাজনৈতিক দলগুলোর? নির্বাচন কমিশনের কি কিছুই দায় নেই?

বিজ্ঞাপন

গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা অনিবার্য৷ মানুষ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে এমনটাই গণতান্ত্রিক রীতি৷ কিন্তু ভোটারদের ভোটদানে অনাগ্রহ গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত৷ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান সিটি নির্বাচন নিয়ে বলেন, একদিকে এই নির্বাচনে কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। অন্যদিকে গত সাধারণ নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় জনগণের মনে হয়েছে, তারা ভোট দিল কি দিল না, তাতে ফলাফলে কিছু যাবে আসবে না। ক্ষমতাসীনেরা যে ফল চায়, তা তারা কোনো না কোনোভাবে তৈরি করবে। তাই জনগণ নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে৷

এই নির্বাচন ও দেশের মানবাধিকার নিয়ে কাতার ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। প্রভাবশালী এই গণমাধ্যমটির ‘হেড টু হেড’ শো’তে আরও উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশি হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনীম, এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ-এশিয়া বিশ্লেষক আব্বাস ফায়েজ ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুইডিশ সাংবাদিক তাসনিম খলিল। অক্সফোর্ড ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত ওই ‘হেড টু হেড’ শো’তে প্রায় অর্ধ শতাধিক দর্শক উপস্থিত ছিলেন। সংরক্ষিত নারী আসন-মনোনয়নপত্রঅনুষ্ঠানে বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় নির্বাচন, বিরোধীদের ওপর নির্যাতন, মানবাধিকারসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেন আল-জাজিরার সাংবাদিক ও উপস্থাপক মেহেদী হাসান।

মেহেদী হাসান প্রশ্ন তোলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয় ও বিরোধীদের দমন ও পরবর্তীতে বর্জনে কি মনে হয় না বাংলাদেশ ক্রমশ একটি একদলীয় দেশে পরিণত হতে চলেছে?

মেহেদী হাসান আরও প্রশ্ন তোলেন, মিন্টু কুমার দাস নামের ঢাকার এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে রাস্তা অবরোধের অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, তিনি ২০০৭ সালে মারা গেছেন। এটা কি বিব্রতকর না? গওহর রিজভী এসব প্রশ্নে বিব্রতবোধ করেন৷ তিনি স্বীকার করেন, যখন এ ধরনের অভিযোগ তোলা হয় তা আসলেই বিব্রতকর।

সংসদ নির্বাচনের পরিস্থিতি ভোটারদের ভোটদানের এমন আগ্রহ কমিয়ে দিলে অনুরূপ পরিস্থিতি উপজেলাতেও বহাল থাকলে কোন পর্যায়ে নামবে এ অনাগ্রহ? জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচন বর্জনের লাইনে গেল বিএনপি, ২০ দল, ঐক্যফ্রন্ট,বাম গণতান্ত্রিক জোটের ৮টি দল৷ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পর যদি অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের লাইনে যায় মহাজোট, ১৪ দল শরীক ও আওয়ামী লীগ দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তখন কি হবে? যদি তারা মনে করে ভোট দিলেও যা না দিলেও তা ফলাফল নির্ধারন করবে ক্ষমতাসীনরা৷ সুতরাং অযথা নির্বাচন করে পয়সা খরচ করার কী যুক্তি? তখন কেমন হবে নির্বাচন? তখন কি শতভাগ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার ঘটনা ঘটবে না? সেটা কেমন গণতন্ত্র হবে?

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মান রাখলো আওয়ামী লীগ দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা৷ তারা না থাকলে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার হিড়িক লেগে যেতো৷ মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ হতো নির্বাচনটি৷ আপাতত মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ হতে রেহাই পেলেও নিকট ভবিষ্যৎ কি আশংকামুক্ত? নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে দায় না চাপিয়ে নিজেদের কার্যক্রমের আত্মসমালোচনা করবেন কি? নির্বাচনে জনগণের ভোটের আগ্রহ হারিয়ে ফেললে জনগণ কেন নির্বাচন খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়কে ভাল চোখে দেখবে? নির্বাচন কমিশনকেই ভোটারদের ভোটদানের আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে হবে৷ আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন কেবল নির্বাচন নয় এটি ভবিষ্যতের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আস্থা অর্জনের একমাত্র উপায়৷ তাই নয় কি?৷

ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন রাজশাহী-১ আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী, নাটোর-৪ আসনের এমপি আব্দুল কুদ্দুস ও নেত্রকোনা-৫ আসনের এমপি ওয়ারেসাত হোসেন বেলালকে নির্বাচনী এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে৷ নির্বাচন কমিশন কি পারবে দেশব্যাপী সকল ক্ষমতার অপপ্রয়োগ কে প্রতিরোধ করে একটি অবাধ সুুুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিয়ে ভোটারদের ভোটদানের আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে? পারবে কি আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব কথাটার বাস্তবায়ন দেখাতে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View