চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবিত করার ক্ষমতা থাকা উচিৎ: সিলভিয়া প্লাথ

‘জীবনের শারীরিক এবং মানসিক অনুভূতিকে, সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ আর বৈচিত্র্যকে আমি যাপন করতে চাই। অথচ আমার কী তীব্র সীমাবদ্ধতা!’-বাঁচার এরকম আকুতি নিয়েও শেষ পর্যন্ত ত্রিশ বছর বয়সেই আত্মহত্যা করেন সিলভিয়া প্লাথ। জীবনের অধিকাংশ সময় অবসাদ আর বিষণ্নতায় ডুবে ছিলেন প্রখ্যাত এই আমেরিকান কবি, ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। যার জন্ম ১৯৩২ সালের ২৭ অক্টোবর। মৃত্যু ১৯৬৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। মৃত্যুর ঠিক আগে ১৯৬২ সালেই সিলভিয়া প্লাথ-এর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাউন্ড ডিপার্টমেন্ট-এর প্রধান পিটার অর। তিনি ‘দ্য পোয়েট স্পিকস’ সিরিজের অংশ হিসেবে প্রায় ২০০ কবির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সিলভিয়ার সাক্ষাৎকারটি ‘The Poet Speaks: Interviews with Contemporary Poets’ (Conducted by Hilary Morrish, Peter Orr, John Press, and Ian Scott-Kilvery, 1966) গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। এ সাক্ষাৎকারে সিলভিয়া কথা বলেছেন তাঁর লেখালেখির জগত নিয়ে, ব্যক্তি জীবন-রাজনীতি-বিশ্বযুদ্ধকে ঘিরে তার ভাবনা এবং কবিতাকে ঘিরে তাঁর বোঝাপড়া নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি বাংলায় ভাষান্তর করেছেন জুয়েইরিযাহ মউ:

পিটার অরর: কবিতা লিখতে শুরু করলেন কেন?
সিলভিয়া প্লাথ– জানিনা ঠিক কেন। আমি লিখতে শুরু করি অনেক ছোটবেলা থেকে। আমার মনে হয় আমি ছোটদের ছড়া খুব পছন্দ করতাম। এবং আমার মনে হতো আমিও এসমস্ত লিখতে পারি। আমার প্রথম লেখা কবিতা, প্রথম প্রকাশিত হয় কবিতাটি যখন আমি সাড়ে আট বছর বয়সের। এটা প্রকাশিত হয়েছিল ‘দ্য বোস্টান ট্রেভেলার’-এ। আর তখন থেকেই আমার মনে হয় আমি প্রফেশনাল হতে শুরু করি।

কী ধরণের লেখা আপনি লিখতেন যখন আপনি লেখালেখি শুরু করেন?
প্রকৃতি। আমার মনে হয় পাখি, মৌমাছি, বসন্ত এসমস্ত বিষয় যা উপহারস্বরুপ মানুষের কাছে যার অন্তর্গত কোন অভিজ্ঞতা নেই মানুষের কাছে। আমার মনে হয় বসন্তের আগমণ, মাথার ওপরের তারা, প্রথম তুষারপাত এবং এসমস্ত এক তরুণ কবির কাছে, একজন শিশুর কাছে উপহার।

আজ যদি অনেক বছর পর এসে কথা বলি এমন কোন বিষয় বা থিম কি বিশেষভাবে আকর্ষণ করে আপনাকে কবি হিসেবে, এমন বিষয় যা নিয়ে লেখার আকর্ষণ কাজ করে?
“আমি উদ্দিপ্ত হই যখন আমি অনুভব করি নতুন আবিষ্কার আসছে আমার কাছে।” কথাটি রবার্ট লয়েল-এর ‘লাইফ স্টাডিজ’ এর। এই গভীর আবিষ্কার খুব সিরিয়াস, খুব ব্যক্তিগত, খুব আবেগপ্রবণ অভিজ্ঞতা যা আমার মনে হয় আংশিক ট্যাবুও। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, রবার্ট লয়েল-এর কবিতা যেগুলো তিনি মানসিক হাসপাতালে থাকা অবস্থায় লিখেছিলেন সেগুলো আমাকে টানতো। বীভৎস, ব্যক্তিগত, সেসমস্ত ট্যাবুও। আমার মনে হয় আজকালকার (তৎকালীন) আমেরিকান কবিতাও আমি খুঁজে দেখতে চাই। বিশেষভাবে অ্যান সেক্সটোন, যিনি একজন মা হিসেবে তার অভিজ্ঞতাগুলো লিখেছিলেন। মা হিসেবে যার নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছিল, প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ এবং অনুভূতিপ্রবণ তিনি, তার কবিতার ভাষাশৈলী দুর্দান্ত। এমনকি কবিতাগুলোর দার্শনিক গভীরতাও ব্যাপক যা আমার মনে হয় নতুন এবং এক্সাইটিং।

আপনি, একজন কবি হিসেবে, একজন ব্যক্তি হিসেবে, যার দু’পাশে আটলান্টিক, যদি এভাবে বলি, একজন আমেরিকান হয়ে উঠছেন। ব্যাপারটিকে কীভাবে দেখেন?
এটা একটু বিব্রতকর অবস্থা, কিন্তু আমি গ্রহণ করে নিচ্ছি সেটা।

  কোনদিকে বেশি ঝুঁকে আছেন?
আচ্ছা, যদি আমি ভাষার কথা বলি, আমি আমেরিকান। আমি ভয় পাই, আমার কথা বলার ধরণ আমেরিকান, আমি পুরনো ফ্যাশনের একজন আমেরিকান ব্যক্তি। এটা একটা কারণ যেজন্য আমি ইংল্যাণ্ডে আছি এখন এবং যে কারণে সবসময় ইংল্যাণ্ডে থাকি। যদি আমি পঞ্চাশ বছর পূর্বে চলে যাই তাহলে দেখতে পাই যেসমস্ত কবি-রা আমাকে সবচে বেশি আকর্ষিত করে তারা সবাই আমেরিকান। সেক্ষেত্রে অনেক কম সমকালীন ইংলিশ কবিরাই আমাকে আকৃষ্ট করে, যা আমাকে স্বীকার করতেই হবে।

এর মানে কি এই যে, আপনি মনে করেন সমসাময়িক ইংলিশ কবিতা পেছন দিকে হাঁটছে আমেরিকান কবিতার তুলনায়?
না, ঠিক তা না। যদি এভাবে বলি একজন বৃটিশ সমালোচক আলভারেজ এর কথা ‘তার দ্বন্দ্বটা ভদ্র হওয়ার বিপদ সম্পর্কে খুবই প্রাসঙ্গিক এবং সত্য। আমি বলতে চাই আসলেই আমি অতো সুশীল নই এবং আমার মনে হয় সুশীলতা মাঝে মাঝে কঠোরভাবে দমন করে সুবুদ্ধি ও তৃপ্তিকে। যা ইংল্যাণ্ডের সর্বক্ষেত্রেই স্পষ্ট বরঞ্চ বিপদজনক। যতটা দৃশ্যমান তারচেও বেশি।’

কিন্তু আপনার কি মনে হয় না, যারা ভাতার অধীনে শ্রমজীবী হয়ে রাজধানীতে ইংরেজি সাহিত্য করে চলেছেন তাদের সাহিত্যকেই বলা হচ্ছে ‘ইংরেজি সাহিত্য’?
হ্যাঁ, আমি এটার সাথে একমত নই। আমি জানি আমি যখন কেমব্রিজ-এ ছিলাম তখন এটা আমার কাছে এসেছিল। একজন তরুণী আমার কাছে এসে বললেন ‘কী করে লিখো তুমি? কী করে প্রকাশ কর লেখা? যখন একজন লেখা প্রকাশ করার মানেই হল জঘন্য সমালোচনার মুখোমুখি হওয়া।’ এবং এ সমালোচনাটা ‘কবিতা’ হিসেবে কবিতা-র সমালোচনা হতো না। আমার মনে আছে একজন যখন আমার সমালোচনা করেছিল জন ডনি-র মতোন লেখার জন্য, কিন্তু জন ডনির মত শেষটা করতে পারিনি বলে। প্রথমবার আমি অনুভব করেছিলাম ইংরেজি সাহিত্যের ভার আমার উপর সেই মুহূর্তে। আমার মনে হয় বাস্তবিক সমালোচনার (ঐতিহাসিক সমালোচনা নয় যদিও) সামগ্রিক প্রভাব ইংল্যাণ্ডে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অসাড়। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমরা কী পড়ি? টি.এস.ইলিয়ট, ডিলান থমাস, ইয়েটস, এগুলো দিয়ে আমরা শুরু করি। শেক্সপিয়রকে জাঁকালোভাবে প্রদর্শণ করা হয়। আমার মনে হয় তরুণ কবিদের জন্য, সমসাময়িক কবিদের জন্য আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাওয়া অতোটা ভীতিকর নয় যতটা ইংল্যান্ডের কবিদের জন্য। এইসমস্ত কারণেই আসলে।

সিলভিয়া আপনি বলছেন আপনি নিজেকে আমেরিকান হিসেবেই পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, কিন্তু যখন আমি একটা কবিতা পড়ছি ‘ড্যাডি’র মত যেখানে আপনি কথা বলছেন মাইন ক্যাম্ফ, অশউইতস, ডাখাও নিয়ে আমার মনে হয় এগুলো এমন এক কবিতা যা একজন প্রকৃত আমেরিকানের পক্ষে লেখা সম্ভব নয়। কারণ এ নামগুলো অতোটা গুরুত্বপূর্ণ নয় আটলান্টিকের অপর পাড়ে? তাই নয় কি?
ওয়েল। এখন, আপনি আমার সাথে আমাকে একজন সাধারণ আমেরিকান ধরে নিয়ে কথা বলছেন। আমার অতীতে, আমি বলতে পারি আর কি, আমি একজন জার্মান এবং অস্ট্রিয়ান। আবার অন্য দিকে আমি প্রথম জেনারেশনের একজন আমেরিকান। এবং একারণেই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প নিয়ে আমার সচেতনতা এবং এসমস্ত বিষয় নিয়ে আমার ভাবনা স্বতন্ত্রভাবেই তীব্র। আর এসমস্তের পরেও আমি একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ, তাই মনে হয় এসমস্ত কিছুর প্রভাবেই কবিতাগুলো সম্ভব হয়ে ওঠে।

একজন কবি হিসেবে, আপনি কি ঐতিহাসিক ব্যাপারের প্রতি আগ্রহী?
আমি ইতিহাসবিদ নই, কিন্তু আমি নিজেকে ঐতিহাসিক জিনিসের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখি দিন দিন। ইদানীং ইতিহাস নিয়ে পড়ছি বেশ। নেপোলিয়ানের প্রতি আমি আগ্রহী। বর্তমানে আমি যুদ্ধের প্রতি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতি আগ্রহী এমনকি আমার মনে হয় যত দিন যাচ্ছে আমি আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছি ইতিহাসের প্রতি। বিশ বছর বয়সকালে ইতিহাসের প্রতি এতো আগ্রহী আমি ছিলাম না।

বিজ্ঞাপন

আপনার কবিতাগুলো কি এখন বইয়ের দিকে বেশি ঝুঁকে আছে? নিজের জীবনের চেয়ে বেশি?
না না, আমি মোটেও তা মনে করি না। আমার মনে হয় আমার কবিতা সবসময়ই আমি যে আবেগ এবং অনুভূতির মধ্য দিয়ে আমি যাপিত জীবনে যাই তা থেকেই তৈরি হয়। কিন্তু আমি এটাও বলে রাখতে চাই, আমি সেসমস্ত কান্নার প্রতি সহানুভূতি জানাতে পারি না যা একটি সুই বা ছুরি ছাড়া আর কোন কিছুর ক্ষেত্রেই মানে রাখছে না। আমি বিশ্বাস করি যে কারও নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবিত করার ক্ষমতা থাকা উচিৎ, এমনকি চূড়ান্ত বিপর্যয় যেমন মানসিক রোগগ্রস্ততা, নির্যাতন, সেরকমের অভিজ্ঞতাগুলোকেও। এবং একজনের নিশ্চয় সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে সুনির্দিষ্ট গঠনে নিয়ন্ত্রিত আকারে প্রকাশ করার যোগ্যতা থাকা উচিৎ। এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো অনেক দারুণ। কিন্তু এটা এরকম হওয়া উচিৎ নয় যে একটা বন্ধ বাক্সের মতোন, যেন আয়না প্রকৃতপক্ষেই, নার্সিসিস্টিক অভিজ্ঞতা। আমার মনে হয় এটা প্রাসঙ্গিক হতে হবে, বৃহৎ অর্থেই প্রাসঙ্গিক হতে হবে। বৃহৎ অর্থে যেমন হিরোশিমা, যেমন ডাখাউ… এরকম!

এবং এই যে আদি, আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া এগুলোর পেছনে তো বুদ্ধিদীপ্ত কোন নিয়ম-শৃঙ্খলাও আছে হয়তো?
আমার দৃঢ়ভাবেই মনে হয়, একাডেমিক হওয়ার কারণে, পিএইচডি ডিগ্রির গুরুত্বের প্রতি আকর্ষণ থাকার কারণে, একজন প্রফেসর হওয়ার জন্য কিংবা এসমস্তকিছুর খাতিরেই আমার একটা অংশ নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল যতক্ষণ পর্যন্ত সেগুলো অযথা কঠোর না হয়ে উঠছে।

কোন কোন লেখক দ্বারা আপনি যথেষ্ট প্রভাবিত?
এভাবে বললে তা সংখ্যায় অনেক কমই। খুঁজে পাওয়াও কষ্টসাধ্য আসলে কার দ্বারা প্রভাবিত আমি। আমি যখন কলেজে, তখন আমি নীরবতাপ্রিয় ও বিস্ময়কর আধুনিক লেখকদের প্রতি আকৃষ্ট ছিলাম। যেমন ডিলান থমাস, ইয়েটস, অড্যান। একসময়তো প্রচণ্ড পাগল ছিলাম অড্যানের প্রতি, তখন যাই লিখতাম অড্যানের প্রভাব পড়তোই। আবার যদি পেছনদিকে ফিরে যাই তবে দেখতে পাই, ব্লেইক-এর প্রতিও ছিলাম মনে হয়। এবং আমার তো মনে হয় এটা বলার অপেক্ষা রাখে না কেউ শেক্সপিয়র পড়লো এবং প্রভাবিত হল, এটা ঘটেই। এভাবেই।

সিলভিয়া, আপনার কবিতা পড়লে বা শুনলে পাঠক দু’টো জিনিস লক্ষ্য করা যায়। স্পষ্টভাবেই লক্ষ্য করা যায়। কবিতাগুলোর প্রাঞ্জলতা এবং পাঠকের উপর এর প্রভাব। এ দু’টো আবার পরস্পর নির্ভরশীলও। আপনি কি এটা সচেতনভাবে কবিতায় সৃষ্টি করেন যেন কবিতাগুলো প্রাঞ্জল হয় আবার যখন পাঠ করা হচ্ছে তখন যেন আকৃষ্ট করে শ্রোতা বা পাঠককেও?
এটা আমি আমার পুরোনো কবিতাগুলোর ক্ষেত্রে করিনি। যেমন– আমার প্রথম বই, ‘দ্য কলসাস’ (The Colossus), এটার কোন কবিতাই আমি জোরে জোরে পড়তে পারবো না এখন। এগুলো জোরে পড়ার জন্য আমি লিখিওনি। এগুলো শান্ত নিভৃত এক কোণে আমার মাঝে জন্ম নিয়েছে। যেটা আমি এখন পড়লাম এটা আমি ইদানীং লিখেছি। আমি আমার সাথে কথা বলেছি, আমার এ কথাগুলো বলা হয়েছে নিজের ভেতর এবং আমার মনে হয় এটা আমার লেখালেখির প্রক্রিয়ার ডেভেলপমেন্টের একটা অংশও বটে। এবং এই প্রাঞ্জলতার একটা কারণ এটাও যে এ কথাগুলো আমি নিজের সাথে নিজেই বলেছি। জোরে জোরেই বলেছি।

আপনার কি মনে হয় এটা প্রয়োজনীয় উপাদান একটা ভালো কবিতার যে সেই কবিতাটি জোরে পড়া যাচ্ছে?
হুম। আসলে আমি এরকমটা অনুভব করি এখন, এবং আমার মনে হয় এই যে বিষয়গুলো, কবিতা রেকর্ড করা, কবিতা পড়া বা বলা, কবিদের রেকর্ড থাকা, এটা দারুণ ব্যাপার। আমি উৎসাহিত বোধ করি এসবে। আমি এক্সাইটেড এটা ভেবে এটার একটা প্রতিক্রিয়া আছে, আছে না বলুন? কবিদের সেই পুরোনো ভূমিকাটা, অনেক মানুষের সামনে কথা বলার ব্যাপারটা এখানে আছে।

অথবা গান করা একটা দলের সাথে?
হ্যাঁ এক দল লোকের সাথে গান করা, সেটাই।

আচ্ছা কবিতার কথা আপাতত বাদ দিয়ে যদি প্রশ্ন করি, অন্য কিছু লিখতে ভালোবাসেন বা লিখেছেন?
উমম… আমি সবসময় আগ্রহী ছিলাম গদ্যতে। কিশোর বয়সে, ছোট-গল্প লিখতাম। এবং সবসময় ছোট-বড় গল্প লিখতে চেয়েছিলাম, একটা উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম। এখন এই পরিণত বয়সে বলতে পারি আমি অনেক বেশি আগ্রহ বোধ করেছিলাম গদ্যের প্রতি, উপন্যাসের প্রতি। আমার মনে হয়, উপন্যাসে, উদাহারণস্বরূপ, আপনি টুথব্রাশ কিংবা অন্য যেকোন ব্যক্তিগত জিনিসপত্র খুঁজে পাচ্ছেন যা নিত্য দিনের জীবনে আছে আপনার। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে সেটা একটু কঠিন। কবিতা, আমার মনে হয়, কষ্টসাধ্য শৃঙ্খলার ব্যাপার। আপনাকে অনেক দূর চলে যেতে হবে, অনেক দূর অনেক দ্রুত, ছোট্ট একটা জায়গার মধ্যেই যে আপনাকে মুখ ফেরাতে হবে সেসমস্ত ব্যক্তিগত বিষয়াদি থেকে। আমি সেসমস্ত মিস করি! আমি নারী, আমি পছন্দ করি আমার ছোট্ট গৃহস্থালি, বাসাবাড়ির ক্ষুদ্র বস্তু এবং এসমস্ত আমি উপন্যাসে খুঁজে পাই। সম্ভবত জীবনের তীব্র কোন কিছু নয় কিন্তু জীবনের চেয়েও গভীর, ব্যাপক। তাই আমি অধিক আগ্রহ বোধ করলাম উপন্যাস লেখার প্রতি।

এটা অনেকটাই ড. জনসন-এর সেই মতবাদের মতো, “কিছু জিনিস আছে যা কবিতার অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে উপযুক্ত কিন্তু বাকিগুলো নয়।” তাই নয় কি?
হুম, অবশ্যই, একজন কবি হিসেবে আমি বলতেই পারি সবকিছুই কবিতায় আনা সম্ভব। কিন্তু তা না। টুথব্রাশকে আমি কবিতায় আনতে পারবো না, আসলেও পারবো না।

অন্য কবি অথবা লেখকদের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন? কতটা ঘনিষ্ঠভাবে মেশা হয় আপনার?
আমি আসলে ডাক্তার, নার্স, উকিল বা অন্য যে কারও সাথেই মিশতে বেশি পছন্দ করি লেখকদের তুলনায়। আমি মনে করি শিল্পী এবং লেখকেরা সবচে বেশি নার্সিসিস্টিক মানুষ। আমি অবশ্য সে অর্থে বলছি না, আমি তাদের অনেককেই পছন্দ করি, এমনকি আমার বন্ধুদের অনেকেই কবি এবং শিল্পী। কিন্তু আমি আসলে এই ধরণের মানুষের সাথে মিশতে বেশি পছন্দ করি, ধরুন এমন কেউ যিনি মাস্টার্স করেছেন কোন প্র্যাক্টিক্যাল ফিল্ডে, এবং আমাকে কিছু শেখাতে পারবেন। আমি বলতে চাইছি, দেখুন আমার স্থানীয় একজন ধাত্রী আমাকে শিখিয়েছেন কী ভাবে মৌমাছি পালন করা যায়। দেখুন তিনি কিন্তু জানেন না আমি কী লিখি, কিন্তু আমি অনুভব করি যে আমি উনাকে খুব পছন্দ করি। এমনকি অনেক কবির চেয়েও বেশি। এমনকি আমার বন্ধুদের মধ্যেও আমি দেখতে পাই, এমন অনেককে যারা অনেক স্পোর্টস সম্পর্কে জানেন, কিংবা নৌকা সম্পর্কে জানেন অথবা জানেন কীভাবে একটা মানুষকে কেটে ফেলতে হয় এবং একটা অঙ্গ কেটে বের করতে হয় শরীর থেকে। আমি এইসমস্ত প্র্যাকটিক্যাল দক্ষতা সম্পর্কে খুব বেশি আগ্রহ বোধ করি। একজন কবি হিসেবে, একজনের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া প্রয়োজন। আমি সবসময় এমন মানুষকে ভালোবাসি যে আমাকে বাস্তবিকভাবেই কিছু শেখাতে পারবে।

যদি কবিতা না লিখতেন তাহলে কী করতেন আপনি? কারণ অবশ্যই কবিতা লেখা দুর্দান্ত কাজ যদি কেউ এতে সফল হয় তবে কিন্তু এমন কি কখনো হয়েছে যে খুব আফসোস হয়েছে অন্য কোন একটা কিছু করেন নি ভেবে?
আমার মনে হয় আমি অন্য কিছু করলে ডাক্তার হতাম। এটা আসলেও একেবারে অন্য মেরুর একটা চিন্তা লেখক হওয়ার বিপরীতের। আমার মনে হয়, আমি যখন ছোট ছিলাম আমার সবচে ভালো বন্ধুরা ছিলেন ডাক্তাররা। আমি ডাক্তারদের মতোন সাদা পোষাক পরতাম, এবং ঘুরে ঘুরে দেখতাম নবজাতক জন্ম নিচ্ছে এবং মৃতদেহ কাটা হচ্ছে। এগুলো আমাকে টানতো, কিন্তু আমি কখনোই নিজেকে সেই শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসিনি যার ফলে ডাক্তারি শেখা সম্ভব কিংবা বিস্তারিতভাবে জেনে-শিখে একজন ভালো ডাক্তার হওয়া সম্ভব। এটা বিপরীতমুখী বটে, কিন্তু কোন একজন মানবজীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকে সরাসরি প্রত্যক্ষ করছেন, তাদের সারিয়ে তুলছেন, সাহায্য করছেন, এইসমস্ত জিনিসগুলোর প্রতি আমার নস্টালজিয়া কাজ করতে থাকে। কিন্তু আমি অনেক ডাক্তারকেই জানি তো। তাই আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি খুশি ডাক্তার না হয়ে বরঞ্চ ডাক্তারদের সম্পর্কে লিখতে পেরে।

কিন্তু এই জিনিসটা, এই যে কবিতা লেখা, এটা নিশ্চয় আপনার জীবনে আপনাকে পরিতৃপ্তি এনে দেয়। তাই নয় কি?

অহ, পরিতৃপ্তি! আমার মনে হয় কবিতা লেখা ছাড়া বাঁচতে পারতাম না। এটা জল কিংবা রুটির মতোন, অথবা এমন একটা জিনিস যা খুবই প্রয়োজনীয়। আমি নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবি যখন আমি একটি কবিতা লিখি। একটা কবিতা লেখার পরে, আপনি খুব দ্রুত ‘কবি হতে চাই’ থেকে সরে গিয়ে বিরতি নিয়ে নিলেন, অথচ দু’টো কখনোই এক জিনিস নয়। কিন্তু আমি মনে করি কবিতা লেখার প্রকৃত অভিজ্ঞতা চমৎকার একটা জিনিস।

বিজ্ঞাপন