চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

লৈঙ্গিক বিভেদের বাস্তবতা কি অস্বীকার করা যায়?

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নারীকে সম্মান জানানোর বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছরই দিবসটি পালন করা হয়। এবং প্রায় প্রতি বছরই নারী দিবস নিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেক মুখরোচক আলোচনা-সমালোচনা-বিদ্রূপাত্মক মতামত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দৃষ্টিগোচর হয়।

সামাজিক যোগাযোগের এসব মন্তব্য এখনকার এই সময়ে এড়িয়ে যাবার সুযোগ থাকে না, ফলে ফেমিনিজমের ছাত্র হিসেবে কিছু কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই বলতে হয়। ‘নারী দিবসের যৌক্তিকতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন এবং অনেকেই নানা যুক্তি উপস্থাপন করে বোঝাতে চান, এই দিবস পালন মূলত নারী ও পুরুষের মধ্যে ভেদাভেদ তৈরি করে। তারা বলতে চান, এই ভেদাভেদ করে মূলত নারীকেই খাটো করা হচ্ছে।’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনার মূল ভিত্তি হিসেবে আমরা দেখি, মানবিক পরিমণ্ডল মূলত নারী-পুরুষ-থার্ড জেন্ডারের সম্মিলন।

নারী-পুরুষ কিংবা থার্ড জেন্ডারের প্রত্যেকেই যেহেতু মানুষ সুতরাং লৈঙ্গিক বিভেদ মোটেও কাম্য নয়। কিন্তু কথা হচ্ছে লৈঙ্গিক বিভেদের বাস্তবতাও কী অস্বীকার করা সমীচীন? এখানে একটা বিষয় যে, লৈঙ্গিক বিভেদের সূত্রানুযায়ী প্রতিটি সত্তার জীবন-যাপন আর অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপট আলাদা। একজন নারী জন্ম থেকেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয় একইভাবে একজন পুরুষও। সামাজিক কাঠামো আর প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে গেঁথে দেওয়া যেখানে একজন নারীকে নানারকম বৈষম্যের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, এই বৈষম্যগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই। যদি সামাজিক বৈষম্যকে আমরা অস্তিত্বহীন ধরি তবুও নারীর শারীরিক ও মানসিক (প্রাকৃতিক, হরমোনাল) অভিজ্ঞতাগুলোও একজন পুরুষের মত নয়। সুতরাং তার অভিজ্ঞতা, চিন্তা-চেতনার ব্যবধান থাকবেই এবং এখানে পুরুষ ও নারীর যে বিভেদ সেটাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

কিংবা একজন নারী যদি সে নারী হিসেবে সম্মানিতবোধ করে তাহলে তাকে অসম্মানিত করাটা কতটুকু যৌক্তিক? আপনাকে কে বলেছে, নারী মানে ছোট? আর কোন শক্তিবলে আপনি পুরুষ বড় হয়ে গেলেন? অনেকেই লৈঙ্গিক বিভেদে যেতে চান না কিন্তু সেক্সুয়াল ইন্টারেস্টের ক্ষেত্রে ঠিকই বিষমকামিতার পক্ষে যুক্তি দেখান।

বিজ্ঞাপন

ছেলে হয়ে একটা ছেলেকে মানুষ হিসেবে কিংবা মেয়ে হয়ে একটা মেয়েকে বিয়ে করার কথা তারা ভাবেন না। এই ইন্টারেস্ট প্রাকৃতিক এই যুক্তি দেখায়ে অনেকে পার পেয়ে যান। কিন্তু নারীবাদ প্রমাণ করে দেখিয়েছে সেক্সুয়াল ইন্টারেস্ট কোনটাই প্রাকৃতিক নয়, এখানেও সামাজিক নর্মস অনেক বড় ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করে। অনেক স্ট্যাটাস দেখলাম- ‘নারী দিবসে তোড়জোড় মূলত তারাই করে যারা নারী দিবসের মাধ্যমে ফায়দা লুটে, ফেমিনিজম একটা বাতিল জিনিস।’ এটা ঠিক যে, ফায়দা লোটার ব্যাপারটা থাকেই।

প্রতিষ্ঠান কিংবা দর্শনকে ব্যবহার করে দুষ্কৃতকারীরা নিজ নিজ স্বার্থ হাসিল করে থাকেন। কিন্তু সেজন্য কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা দর্শনকে বাতিল করা যায় না। কারণ ফেমিনিজমই আমাদেরকে শিখিয়েছে এই যে সারাবিশ্বে এত এত ধর্ষণ, নির্যাতন, বৈষম্য এর পেছনের রহস্যগুলোকে। এগুলোকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকারগুলোকে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে।

নারীবাদ রাষ্ট্রগুলোকে, সরকারকে নানাভাবে বাধ্য করেছে, নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যৌক্তিক বেড়াজালে আবদ্ধ করে বুঝিয়েছে কেন নারী সুবিধাগুলো পাবার অধিকার রাখেন। তাই নারীবাদের সুদীর্ঘ ইতিহাস আমাদের জানা প্রয়োজন। কারণ ইতিহাস বলে, নারীদের আজকের এই অবস্থানে আসতে কী পরিমাণ আত্মত্যাগ আর সংগ্রাম করতে হয়েছে। একটা সময় মেয়েদের সম্পত্তির মালিক হবার অধিকার, কথা বলার অধিকার, ঘরের বাইরে কাজ করার অধিকার, শিক্ষা কিংবা চিকিৎসা এমনকি ভোটাধিকার পর্যন্ত ছিল না, যেটা আমরা বেগম রোকেয়ার অবরোধবাসিনীর গল্পগুলো পড়লেই জানতে পারি।

সুতরাং নারী দিবসে এতো শঙ্কিত হবার কিছু নেই। নারী দিবস আপনাকে আপনার বর্তমান অবস্থা থেকে তাড়িয়ে দেবে না, আপনার সচেতনতাগুলো বড়জোর আরেকটু শানিত করতে কাজ করবে। বছরব্যাপী নানা দিবস উদযাপিত হয়। কিন্তু নারী দিবস আসলেই দিবসের কার্যকারিতা নিয়ে টানাপোড়ন শুরু হয়। মানবতার ধোঁয়া তুলে নারীর ব্যক্তিগত বাস্তবতা, উদযাপনকে খাটো করার একটা নব্যপ্রয়াস বলা যায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ চায় নিখাদ শক্তি ও ক্ষমতা। নারীবাদ সেখানেই বাগড়া দিয়ে আসছে। নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে নিজ নিজ যোগ্যতায়। পুরুষতান্ত্রিক খুঁটি নড়ে যাবার ভয়ে এই এগিয়ে যাওয়াকে ভালো চোখে দেখছেন না কুশীলবরা। নারীকে মা বানিয়ে ঘরের ভেতর বাচ্চাকাচ্চা লালন- পালনের মধ্যে আবদ্ধ করতে পারলেই শান্তি কিংবা সেটাও যেহেতু পারা যাচ্ছেনা সেহেতু পুরনো শক্তি আর অহং ফলানোর মাধ্যমে যদি খানিকটা আত্মিক তৃপ্তি মেলে তাই এই টানাপোড়ন, এতো স্ট্যাটাস, এতো কমেন্টস। নাগরিক হিসেবে নারী এবং পুরুষ সমান সার্ভিস পেতে ও দিতে সক্ষম সেখানে বিভেদহীন থাকুন কিন্তু ব্যক্তি পরিচয়ে নারী আর পুরুষ ভিন্ন সেটাকে সম্মান করুন। সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন