চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নারিন্দার মেথরপট্টি আর রামচরণ হেলা…

স্মৃতি-বিস্মৃতির ছেলেবেলা

এক
আমাদের বসুবাজার লেনের বাড়ি থেকে কিছুটা পথ হেঁটে গেলে মনির হোসেন লেন বাঁ দিকে রেখে ডান দিকে মোড় নিলেই পড়ে ঋষিপাড়া। ঋষিপাড়া পেছনে ফেলে একটু সামনে এগুলে পথের ধারে সারি সারি ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। ঝুপড়ি ঘরের সামনে খোলা লাল মাঠ- মাঠের শেষ মাথায় দুই মানুষ লম্বা খয়েরী রঙের দেয়াল। দেয়ালের ওপারে শক্তি ঔষধালয়। আরেকটু দূরে হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরি। সেই ফ্যাক্টরির চিমনি থেকে ধাবমান দুঃখের মতো নির্গত ধোঁয়ারা আকাশকে ভারি করে তুলত।

আমরা সকালবেলা সেই লাল মাঠ পেরিয়ে শাহ সাহেব বাড়ি মাড়িয়ে নারিন্দা সরকারী স্কুলে পড়তে যেতাম। স্কুলে যাওয়ার সময় আমাদেরকে মেথরপট্টির ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘরের পাশ দিয়ে যেতে হতো। ঘরের সামনে দড়ির খাটিয়ায় মেথররা ঘুমাত আর তাদের পাশে গায়ে কাদায় মাখামাখি এক পাল শূকরদের ঘোঁত ঘোঁত করে চড়ে বেড়াতে দেখতাম আমরা। তাদের গা থেকে ভুরভুর করে বেরুত রাজ্যের যত দুর্গন্ধ। দিনের পর দিন ওরকম দুর্গন্ধ আমাদের গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। মেথর পট্টির লোকজনেরা, তাদের বাচ্চারা আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত। তাদের তাকিয়ে থাকার অর্থ যে কী তা আমরা জানতাম না। আমরাও তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আমাদের মধ্যে তাকাতাকি বিনিময় হতো।

মাঝে মাঝে স্কুল থেকে ফেরার পথে আমরা মেথর পট্টির সামনে এসে দাঁড়াতাম।

মেথরপট্টির বয়স্ক মানুষদের কেউ কেউ আমাদের সঙ্গে যেচে কথা বলত। তারা আমাদের সাথে বাংলাতেই কথা বলতেন কিন্তু তাদের বাংলা ভাষা শুনতে যেন কেমন লাগত! টেনে টেনে কথা বলত তারা। তাদের বাংলা কথা শুনলে প্রথমে বুঝতে অসুবিধা হতো- এ কেমন বাংলায় কথা বলে তারা? পরে শুনতে শুনতে আর অসুবিধা হয়নি। বুঝে গিয়েছিলাম তাদের অন্যরকম বাংলা।

ঝুপড়ি ঘরের মেথরপট্টিতে রামচরণ হেলা নামে অনেক বয়স্ক এক লোক ছিলেন। রামচরণ সারাক্ষণই আয়েশি ভঙ্গিতে হয় খাটিয়ায় কাত হতে বসে থাকতেন না হয় শুয়ে শুয়ে হাতে বানানো সিগারেট টানতেন। আর তার সিগারেটের গন্ধ নাকে মুখে এসে ধাক্কা মারত আমাদের। রামচরণকে অমনভাবে শুয়ে বসে থাকতে দেখলে তাকে মনে হতো তিনি বুঝি পুরনো দিনের জমিদার।

বিজ্ঞাপন

রামচরণ মদ খেয়ে চুর হয়ে থাকতেন। তার চোখ দুটো থাকত ঢুলুঢুলু- যেন তা খুলে খুলে গড়িয়ে পড়ছে নিচে। তিনি আমাদের খুব খাতির-যত্ন করতেন। আমাদের বাবু-সোনা বলে ডাকতেন।

আমাদের দেখলে রামচরণ শোয়া বসা থেকে নিজে এগিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন।

রামচরণের চোখ জবা ফুলের মতো লাল হয়ে থাকত সবসময়। তার গায়ের রঙ এমনই কুচকুচে কালো যে রামচরণকে দেখলে যে কেউ-ই ভেবে নেবে জন্মের পর কেউ হয়ত রামচরণকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কয়লা মেশানো গুড়ো দিয়ে ভালো করে পিষে দিয়েছে।

আমরাও তার সাথে কথা বলতাম। আমাদের রঙ চা খাওয়াতেন তিনি। তবে তার সঙ্গে যখন আমাদের দেখা হতো তখন আমরা তাকে কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে তিনি আমাদেরকে এক আশ্চর্য রকমের উত্তর দিতেন। তিনি কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে হাসতে হাসতে উত্তরে রামচরণ বলতেন, কাম কারি, পায়সা পাই, মদ খাই, বউ পিটাই-
সব ঠিক আছে কিন্তু বউ পিটাই!
এ কেমন কথা?

দুই
আমরা যতবার রামচরণের কাছে গিয়েছি ততবার দেখেছি সে কত আদর করে তার বউকে তুলসি ডেকে বলেছে, তুলসি, বাবুয়াদের জন্য চা লিয়ে আয়- বলে আমাদের জন্য রঙ চা আনতে বলেছেন। রামচরণের বউ হলুদ শাড়িতে আবৃত কালো কুচকুচে লম্বা গড়নের তুলসি একটা ট্রেতে কয়েকটা টিনের কাপে আমাদের জন্য চা নিয়ে এসে হাসি হাসি মুখ করে রামচরণকে বলত, এই লেন আপনার চা- বলে তুলসি আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকত।

আমরা তার সঙ্গে কতদিন কথা বলেছি, চা খেয়েছি কিন্তু আমাদের কখনোই বিশ্বাস হয়নি রামচরণ হেলা তার এত আদরের বউ তুলসিকে কখনো পেটাতে পারে।

বিজ্ঞাপন