চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিতর্কিত নাটকের ‘স্তালিন’

ভয়ংকর, অমানবিক, নির্দয়, কূটবুদ্ধিসম্পন্ন-এসবই তাঁর (স্তালিন) বিশেষণ? কিন্তু কেন? কেন স্তালিন এত নিষ্ঠুর?

রুশ সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ যোশেফ স্তালিনকে নিয়ে নির্মিত মঞ্চ নাটক ‘স্তালিন’ নিয়ে চরম উত্তেজিত রাজধানীর নাট্যপাড়া! নাট্য নির্দেশক কামালউদ্দিন নীলুর পরিচালনায় ঢাকার মঞ্চে নাটকটি নিয়ে এসেছে সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি)। সোমবার নাটকটির প্রথম শো হওয়ার পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘স্তালিন’।

বিশেষ করে নাটকটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, এতে যে স্তালিনকে দেখানো হয়েছে সেটা বিকৃত। মঙ্গলবার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় নাটকটি দেখে চড়াও হন একদল দর্শক। নাটক শেষে তাঁরা একযোগে প্রতিবাদ করেন। স্লোগান দেন নাট্যশালার বারান্দায়। নাটকের সঙ্গে জড়িত সকলের উদ্দেশ্যে ইতিহাস বিকৃতিরও অভিযোগ করা হয়। বলা হয় ‘স্তালিন’ নাটকটিতে যাকে দেখানো হয়েছে সেই স্তালিন ভয়ংকর, অমানবিক ও নির্দয়। দর্শকের প্রতিবাদী মুহূর্তের ভিডিও ক্লিপও এখন সোশাল মিডিয়ায়।

বিজ্ঞাপন

সোমবার থেকে শুরু হওয়া ‘স্তালিন’-এর প্রদর্শনী দেখেছেন শিল্প সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত অনেকেই। ‘স্তালিন’ নাটকে সত্যি সত্যিই ইতিহাস বিকৃতি রয়েছে বলেও সরাসরি মন্তব্য করেছেন অনেকে।

বিশেষ করে ‘স্তালিন’ নিয়ে সরব সোশাল মিডিয়া। এখানে অনেককেই উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে তর্ক-বিতর্কে সামিল হতেও দেখা যাচ্ছে।

নাটকটি দেখেছেন ব্যান্ড দল ‘মেঘদল’-এর সদস্য ও কবি শিবু কুমার শীল। নাটকটি দেখে পরবর্তীতে পুরো বিষয়টি ফেসবুকে লিখেছেন তিনি। বিশেষ করে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দর্শকের প্রতিবাদী মুহূর্তের স্বাক্ষী আছেন জানিয়ে তিনি লিখেন: সিএটি নির্মিত, কামালুদ্দিন নীলু নির্দেশিত ‘স্তালিন’ নাটক দেখে দর্শকদের একাংশের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক, প্রাসংগিক। আমি অন্য অনেকের মত সেখানে উপস্থিত ছিলাম ফলে চাক্ষুষ ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করেছি। নাটক শেষ হবার পর কলা কুশলীদের কুর্নিশ করা পর্যন্ত এই দীর্ঘ ৩ ঘন্টা পুরো অডিয়েন্স জুড়ে এক ধরনের গম্ভীর আবহ বিরাজ করছিল। যদিও এটি একটি স্ল্যাপেস্টিক কমেডি। নাটক চলাকালীন কোনো হাসির রোল আমি লক্ষ্য করিনি। কেনো সেই ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। যাই হোক নাটক দেখে বেরিয়ে যেতে যেতে কিছু দর্শক খুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিল। তারা বলছিল, সাম্রাজ্যবাদের দালাল, এনজিওর টাকায় বানানো নাটক, তথ্যবিকৃতি ইত্যাদি বেশ উচ্চস্বরে। কিন্তু সেখানে ঘৃতাহুতি দিলেন স্বয়ং কামালুদ্দিন নীলু । থিয়েটার হলের অভ্যন্তরের গেটের সামনে তিনিও একইভাবে উচ্চস্বরে নিজেকে বড় মার্ক্সিস্ট দাবি করছিলেন। দুই পক্ষই টেম্পার লুজ করায় বেশ অপ্রীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়। আমার যেটা মনে হয়েছে এসব না করে লিখিত ভাবে এই নাটকের কন্টেন্ট নিয়ে প্রতিবাদ করা যেতো। অপরদিকে নাটক কর্তৃপক্ষ একটা মুক্ত আলোচনার প্রস্তাব রাখতে পারতো। এসব না করে মাথা গরম করাটা সমিচীন হয়নি।

নাটকের কাহিনী নিয়ে এই শিল্পী বলেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে জোড়াতালি দেয়া ‘স্তালিন’ নাটকটি দেখার পর কেবল এটাই মনে হয়েছে যে এই নাটকের ইন্টেনশন ভালো না। কেবল স্তালিন নয় গোটা মার্ক্সিজম, কমুনিজম, লেনিন, মাও সে তুং সকল ব্যাক্তি, তত্ত্বের বিরুদ্ধেই এই নাটক। স্তালিন সম্পর্কে পশ্চিমা প্রপাগান্ডাই এর প্রধান উপজিব্য। স্বীকার করছি এটি হয়ত একজনের ইন্টারপ্রিটেশন মাত্র কিন্তু অবাক ব্যাপার হচ্ছে একটি মতবাদ বা একটি তত্ত্বকে ঘিরে বহুস্তরের ইন্টারপ্রিটেশান হাজির করা যেতো তখন হয়ত দর্শক নিজেই তার পছন্দসই ইন্টারপ্রিটেশানটা পিক করতো। তা না করে এক রৈখিকভাবে সাম্রাজ্যবাদী প্রপাগাণ্ডাকে ভর করেই এই নাটকের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।

নাটকটি দেখে সোশাল মিডিয়ায় কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন কবি ও সাংবাদিক রুদ্র অনির্বাণ। তিনি বলেন: ভয়ংকর, অমানবিক, নির্দয়, কূটবুদ্ধিসম্পন্ন-এসবই তাঁর (স্তালিন) বিশেষণ? কিন্তু কেন? কেন স্তালিন এত নিষ্ঠুর? কেন কাছের মানুষকেও হত্যা বা বন্দি করার নির্দেশে তিনি অবিচল? কেন গাছের আড়ালে পাখি ভেবে আকস্মিক খেয়ালে গুলি করছেন নিজেরই দেহরক্ষীকে? কিসের জন্য ত্যাগ করছেন আপন সন্তানকেও? কেন নিজের পলিট ব্যুরোর সদস্যদের কারও ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছেন না? কেন সিনেমায় প্রেমময় দৃশ্যেও এতটাই বিরক্ত, ‘মহান’ স্তালিন? সিএটির সংলাপ প্রধান, টান টান উত্তেজনাপূর্ণ ‘স্তালিন’ নাটকে এই প্রশ্নটি অমীমাংসিত। কেন শুধু এই স্তালিনকেই তুলে ধরলেন নীলু (কামালউদ্দিন নীলু) স্যার?

‘স্তালিন’-এর বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ নিয়ে কথা হতে পারে, তাই বলে নাটক বন্ধ! এমনটা চান না নাট্য জগতের তুখোড় অভিনেত্রী বিন্যা মির্জা। ‘স্তালিন’ প্রসঙ্গে এই অভিনেত্রী লিখেন,নাটক পছন্দ বা অপছন্দ হতেই তো পারে! সমালোচনা থাকবে,তাই বলে নাটক বন্ধ! এটা যারা শুরু করেছেন তাদের ঘরেও আসবে নিশ্চিত। প্রথমে নিজের ঘরে শুরু করেছি! এখন বাইরের লোক থেকে ঘর সামলাও!

এরপর এই অভিনেত্রী আরো বলেন, আমার ধারণা কামাল উদ্দিন নীলু স্যার সারাজীবনে অজস্রবার ‘রুশ-ভারতের দালাল’ কথাটি শুনেছেন। আজ শুনলেন ‘মার্কিন/সাম্রাজ্যবাদের’ দালাল। একটা নাটক করেই? নাটকীয়ভাবেই তাঁর জীবনাদর্শ বদলে গেল! বলশেভিক ভক্তির বাইরে কোনো রাস্তা নাই? এটাই তো মার্কিন রাস্তা- ‘হয় আমার পক্ষে নাহয় আমার বিপক্ষে’!

‘স্তালিন’-এ কাজ করেছেন ২০ জন। এর মধ্যে ১৫ জনকে মঞ্চে দেখা যায়। স্তালিন চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাহাদাত। এ ছাড়া আরও অভিনয় করেছেন সাবিনা সুলতানা, রায়হান আখতার, এ কে আজাদ, মোহাম্মদ রাফী সুমন, শাওন কুমার দে, শিপ্রা দাস, শান্তনু চৌধুরী, সুব্রত প্রসাদ বর্মণ, মর্জিনা মুনা, মেজবাউল করিম, চিন্ময়ী গুপ্তা, কাবেরী জান্নাত প্রমুখ।