চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নদী-সংযোগ ‘মেগা প্রকল্প’ নিয়ে ভারতীয় পরিবেশবিদদের শঙ্কা

নদী একত্রীকরণে ভারতের উচ্চাবিলাসী ‘মেগা প্রকল্প’র কাজ প্রায় শেষের দিকে। এই প্রকল্পে দেশটির ব্যয় হচ্ছে ১১ লাখ কোটি রুপি (১৬৮ বিলিয়ন ডলার)। কিন্তু প্রকল্পের উপযোগিতা আর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে চিন্তিত মতামত দিয়েছেন ভারতের পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা। তারা পরিবেশ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুতি, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজ্যগুলোর ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থের কারণে শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্প ব্যর্থ হবে বলে মত দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম কোর্য়াটজ।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর ভারতের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ বৃহত্তম গোদাভারী ও কৃষ্ণা নদী একত্রিত হলো। এটি অন্ধ্রপ্রদেশের একটি খাল দিয়ে সংযোগ করা হয়েছে। এটি শেষ করতে খরচ হয়েছে ১৩শ’ কোটি রুপি(১৯৬ মিলিয়ন ডলার)।

বিজ্ঞাপন

প্রথম প্রকল্প শেষ হওয়ার পরে চলমান দ্বিতীয় ‘কিন-বেতা’ প্রকল্পের জন্য খরচ ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৬৭৬ কোটি রুপি(১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার)। এটির কাজ শেষ হবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে।

এই প্রকল্প কাজ করবে যেভাবে: হিমালয় ও উপনদী মিলিয়ে মোট ৩৭ নদী নিয়ে এই প্রকল্প। যেসব নদীতে উদ্বৃত্ত পানি আছে সেগুলোতে বাঁধ দেওয়া হবে যাতে করে কম পানির নদীগুলো প্রয়োজনীয় পানি ধরে রাখা যায়। এই জন্যে ৩০টি খাল ও ৩ হাজার ছোট বড় জলাধার নির্মাণ করা হবে। এই জলাধার থেকে আবার ৩৪ গিগাওয়াট পানি বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এই খালগুলোর প্রস্থ ধরা হবে ৫০ থেকে ১০০ মিটার। আর এর প্রসার হবে ১৫ হাজার কিলোমিটার।

ভারতের ন্যাশনাল ওয়াটার ডেভোলপমেন্ট অথরিটির ওয়েবসাইটে এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘যদি এই জলাধার নির্মাণ এবং নদীগুলোর সংযোগ স্থাপন করা যায়, তাহলে আঞ্চলিক বৈষম্য(রাজ্যের ক্ষেত্রে) কমে যাবে। সেই সাথে অভ্যন্তরীণ কৃষি ও শিল্প কারাখানায় পানি সরবরাহ, পানি বিদ্যুৎ নৌ চলাচলে অনেক সুবিধে হবে।’

এই প্রকল্পের আওতায় প্রতি বছর ১শ ৭৪ টিলিয়ন লিটার পানি পাওয়া যাবে এবং ৮৭ মিলিয়ন একর জমিতে সেচ সুবিধে হবে। কিন্তু এই প্রকল্পকে হঠকারী এবং বিপজ্জনক উল্লেখ করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভারতেরই পরিবেশবিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।

ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউটের সিনিয়র গবেষক উপালি অমরসিংহের মতে, এই প্রকল্পের ফলে ৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে।

আর ভারতের নদী গবেষণা সেন্টারের পরিচালক ড. লাথা আন্থানার বলেন, নদী কোনো পাইপলাইন না যে এটা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

আন্থনা বলেন, প্রথমত, ঘাটতি এবং উদ্বৃত্তের কোনো ধারণা আমাদের নেই। তাহলে এটা আমরা নির্ধারণ করবো কিভাবে? নদীর একটি প্রাকৃতিক ধারা আছে বছরের পর বছর ধরে এটাই দেখা যাচ্ছে। তাহলে ঘাটতি এবং উদ্বৃত্তের কথা বলার আমরা কে? নদী এটা যতোটা সম্ভব বহন করবে।

তিনি আরো বলেন, নদী কোনো পাইপলাইন না যে এটাকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো। আপনি গঙ্গার সাথে অন্যটার তুলনা করতে পারবেন না। এর ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট আছে। আপনি যখন পানি অপসারণের জন্য খাল কাটবেন, সেই সাথে অনেক মানুষের জীবন এবং ইকো-সিস্টেমও অপসারিত হবে।

আন্থানা বলেন, ‘কিন-বেতা’ প্রকল্পের জন্য পান্নার ন্যাশনাল পার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোনো রকম ছাড়পত্র ছাড়া সরকার এটি রাজনৈতিক কারণে করছে। মূলত দেশের ভৌগলিক সীমারেখা নতুন করে আঁকার জন্য। যদি সেখানে পানি উদ্বৃত্ত থাকে এবং বন্যাও হয়, তবু নদীর এটা দরকার। প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম এভাবেই কাজ করে। আপনি এটাকে বাঁধা দিতে পারেন না।

এই প্রকল্পের কোনো বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই বলেও জানান, সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভারস এন্ড পিপলের সমন্বয়কারী হিমাংশু থ্যাক্কার।

বিজ্ঞাপন

হিমাংশু বলেন, নদী সংযোগ প্রকল্প যে ভালো হবে সেটা কিভাবে বলেন। এই বলার পেছনে বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। অসম্পূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বলা হয়েছে এটি দেশের জন্য ভালো হবে। এর বিকল্প কি হতে পারে তা যাচাই না করেই এই প্রকল্পের ইতি টানা হয়েছে। যেমন জলবিভাজিকা উন্নয়ন, বৃষ্টি ফলে ফসল, ভূ-গর্ভস্থ পানির পুনব্যবহার, বিদ্যমান অবকাঠামো এই সব ব্যাপার বিবেচনা করেই উপসংহার টানতে হবে। কিন্তু এখানে এইরকম কোনো বিষয়ে অনুশীলন করা হয়নি।

হিমাংশু আরো বলেন, গোদাভারি নদীর অববাহিকায় মহারাষ্ট্রের মার্থাওয়াদা অঞ্চল এখনো শুকনো। কিন্তু একই সময়ে গোধাভারি থেকে কৃষ্ণায় পানি অপসারণ করতে চায়। এর উপর ব্যাপক কাজ করতে হবে। কারণ এগুলো প্রকৃতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

আন্তঃসংযোগ এই প্রকল্পকে ‘আতঙ্কজনক এবং অশুভ’ পরিকল্পনা বলে উল্লেখ করেন, ভারতের ন্যাশনাল কনভেনার ও ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অফ পিপলস মুভমেন্ট’র মেধা পাটেকার।

তিনি বলেন, পুরো পরিকল্পনাটাই ‘আতঙ্কজনক এবং অশুভ’। নদীর জল অনুসন্ধানে পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক দিককে উপেক্ষা করা হয়েছে।

এই প্রকল্পের খরচ বাবদ যে ৫ দশমিক ৬ লাখ কোটি রুপি (৮৫ মিলিয়ন ডলার) কথা বলা হয়েছে সেটি নিয়েও আপত্তি তার। তার ধারণা এতে শেষ পর্যন্ত খরচ হবে ১০ লাখ কোটি রুপি।

তিনি আরো বলেন, বড় প্রশ্ন হলো কারা এই তহবিল দিতে যাচ্ছে? এটি কি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিতে যাচ্ছে? যদি তারা এটি দিয়ে থাকে, তাহলে তাদের একমাত্র লক্ষ্য জমি। এছাড়া এসব অঞ্চলে যারা বসবাস করে তাদের সামাজিক জীবন সহ সবক্ষেত্রে কি রকম প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে সে বিষয়ে তারা কিছু করছে না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তারা গ্রামবাসীর সঙ্গে আলোচনা পর্যন্ত করেনি।

নদী সংযোগকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক  ‘শত্রু’ বলে আখ্যায়িত করেন দিল্লির জহুলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস প্রফেসার ভি রাজামানি। তিনি বলেন, এই নদী সংযোগ প্রকল্প বড় সব জলাধার নির্মাণের সঙ্গে জড়িত। খাল কখনো নদী হয় না। এটি পরিবেশকে সাহায্যও করবে না।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, নদীর সাথে যাদের জীবন-যাপনের সম্পর্ক তারা কি করবে? যখন পানি প্রবাহিত হয়, তখন এর সাথে অনেক বিষয় যুক্ত থাকে। এর সাথে ছোট ছোট জীব এবং সামুদ্রিদক জীবনের সম্পর্ক আছে। জলাধার নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিকভাবে এগুলো আর কাজ করবে না। এর ফলে অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোকি করবে?

রাজভানি বলেন, বাস্তুচ্যুতরা শহরের বস্তিতে পৌঁছাবে। তাই নদী সংযোগ প্রকল্প হলো সামাজিক শত্রু, অর্থনৈতিক শত্রু। এটা শেষ পর্যন্ত সভ্যতা ধ্বংসের নেতৃত্ব দেবে।

এই প্রকল্প টেকসই হবে না বলে বলছেন ভারতের সেন্টার ফর সাইন্স এন্ড ইনভিরিমেন্টের ডেপুটি ডিরেক্টর সুস্মিতা সেনগুপ্তা। তিনি বলেন, এই ধরনের পানি অপসারণ প্রকল্প যেখানে চলে সেখানে বসবাসকারী সম্প্রাদায়ের স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুতি ঘটে।

সেনগুপ্তার ভাষায়, ভারতে পানি বন্টন ইস্যুটা রাজ্য-রাজ্যের বিষয় এবং পানি উদ্বৃত্ত থাকা রাজ্যগুলো তা দিতেও চায় না এবং চাইবেও না। এছাড়া এই প্রকল্পের সাথে পরিবেশের ব্যাপারটি বেশ বড় আকারে জড়িত।

তিনি বলেন, আরেকটি বড় সমস্যা হলো জলাধার নির্মাণ ও পানি অপসারণের সময় পলিগুলো কোথায় জমা করা হবে সেটাও স্পষ্ট না। এই প্রকল্প কি কারো খামারে পরিণত হবে? কোনো কৃষকে কি ক্ষতি করবে, নাকি করবে না। সরকার এর একটি দিকও স্পষ্ট করেনি। সুতরাং পরিবেশ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের স্বার্থ, সামাজিক, অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় আমি মনে করি এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে না।

এই প্রকল্পটি ১৯৮২ সালে কংগ্রেস সরকারের আমলে শুরু হলেও বর্তমান মোদি সরকারের আমলে এই প্রকল্পের কাজে গতি আসে। ২০০২ সালের অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকারের আমলে প্রকল্পটিকে বিশেষ কাঠামোতে নিয়ে আসা হয়েছিলো।