চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নদীর ‘জীবন্ত সত্তা’: জীবনানন্দের আলোকে

নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ (লিভিং এনটিটি) হিসেবে ঘোষণা করে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে গত ১ জুলাই। হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠনের রিটের প্রেক্ষিতে আদালত গত ৩ ফেব্রুয়ারি দেশের নদী রক্ষায় ওই ঐতিহাসিক রায়টি দিয়েছিলেন। এর ফলে দেশের নদীগুলো এখন থেকে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর মতোই আইনি অধিকার পাবে। আদালতের রায় অনুযায়ী নদীগুলো এখন ‘জুরিসটিক পারসন’ বা ‘লিগ্যাল পারসন’। এর মধ্য দিয়ে মানুষের মতো নদীরও মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হলো।

তবে নদী যে জীবন্ত সত্তা, তার যে প্রাণ আছে, সে যে মানুষের মতোই অনুভূতিপ্রবণ—সে কথা বহু আগেই লিখে গেছেন রূপসী বাংলার কবি বলে খ্যাত জীবনানন্দ দাশ। তার অসংখ্য লেখায় তার প্রমাণ রয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক:

বিজ্ঞাপন

‘বঁইচির ঝোপ শুধু- শাঁইবাবলার ঝাড়—

আম জাম হিজলের বন—

কোথাও অর্জুন গাছ—

তাহার সমস্ত ছায়া এদের নিকটে টেনে নিয়ে

কোন কথা সারাদিন কহিতেছে অই নদী?

এ নদী কে?- ইহার জীবন হৃদয়ে চমক আনে।’

‘এ নদী কে’? মানে নদী এখানে ব্যক্তি। ‘ইহার জীবন হৃদয়ে চমক আনে’—মানে নদীর জীবন আছে। জীবন্ত সত্তা। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকার ১৩৪৩ সালের আশ্বিন সংখ্যায় প্রকাশিত ‘নদী’ শিরোনামের এই কবিতার শেষ দুটি লাইন আরও মর্মস্পর্শী:

‘একদিন এই নদী শব্দ করে হৃদয়ে বিস্ময় আনিতে পারে না আর;

মানুষের মন থেকে নদীরা হারায়, শেষ হয়।’

সাতটি তারার তিমির কাব্যগ্রন্থের ‘ক্ষেতে প্রান্তরে’ কবিতায় নদী আরও বেশি শরীরী :

‘জলপিপি চলে গেলে বিকেলের নদী

কান পেতে নিজের জলের সুর শোনে।’

মানে নদীর কান আছে। সে নিজের সুর শোনে। মানে সে সুর তোলে। তার কণ্ঠ আছে।

নদীকে জীবনানন্দ প্রিয় মানুষের মতোই ভালোবেসেছেন। তাদের সুখে-দুঃখে কাতর হয়েছেন। ফলে মৃত্যুর পরে এই নদী তাকে ফের ডাকবে কি না সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন প্রথম দিককার কবিতা ‘ঝরা ফসলের গান’-এ:

‘ওগো নদী, ওগো পাখি,

আমি চলে গেলে আমারে আবার ফিরিয়া ডাকিবে নাকি!

আমারে হারায়ে তোমাদের বুকে ব্যথা যদি জাগে ভাই,

জেনো আমি দুখ জাগানিয়া—বেদনা জাগাতে চাই!’

নদীকে এখানে ভাই বলে সম্বোধন করছেন। তার চলে যাওয়ার পর নদীর বুকে ব্যথা জাগবে কি না সেই হাহাকারও এখানে স্পষ্ট।

ধূসর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ‘পেঁচা’ কবিতার প্রথম স্তবক:

‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে

হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে

শুধু শিশিরের জল

অঘ্রানের নদীটির শ্বাসে

হিম হয়ে আসে

বাঁশপাতা—মরা ঘাস—আকাশের তারা’।

অঘ্রান মাসে নদীর শ্বাসে মানে নিঃশ্বাসে বাঁশপাতা হিম বা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। অর্থাৎ নদী নিঃশ্বাস নেয়। মানে নদীর প্রাণ আছে।

সভ্যতার গড়ে ওঠা ও বিস্তারে নদী যে মানুষের সহায়ক এবং সে যে নিছক প্রবহমান ধারাই নয়, সে কথা বলছেন সাতটি তারার তিমির কাব্যগ্রন্থের ‘জনান্তিকে’ কবিতায়: ‘তবুও নবীন নুড়ি—নতুন উজ্জ্বল জল নিয়ে আসে নদী।’

নদীর জলে মানুষ তার মুখ দেখে। মুখ দেখে মানে সে তাকে চেনে নদীর আয়নায়। ‘আমরা’ কবিতার দুটি লাইন:

‘যদিও নদীর জলে,

যত দিন কেটে যায়,

দেখি -আরো বেশি

আমাদের ‍মুখ আরো বেশি ম্লান হয়।’

অর্থাৎ সময়ের সাথে সাথে ব্যক্তির মুখই যে শুধু ম্লান হয় তাই নয়, সে নদীর প্রতি কী আচরণ করলো সে কথাও নদী তাকে বলে দেয়। নদীর স্বচ্ছ জলে মানুষ তার পরিষ্কার চেহারাই দেখে। কিন্তু বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যার নোংরা জলে মানুষ তার ম্লান ও ধূসর রূপ ছাড়া কিছু দেখে না। নদী এখানে মানুষের অবিবেচক মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলে। নদী এখানে কেবলই প্রবহমান নিষ্প্রাণ ধারা নয়।

মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থের ‘পরিচায়ক’ কবিতায় বিকলাঙ্গ নদীর কথাও বলছেন:

‘এইদিকে বিকলাঙ্গ নদীটির থেকে পাঁচ-সাত ধনু দূরে মানুষ এখনও নীল, আদিম সাপুড়ে।’

অর্থাৎ মানুষ যে তার শিল্প আর নগরায়ণের জন্য নদীকেই বিকলাঙ্গ করে তোলে, এখানে সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

‘স্ট্যান্ডে’ শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন:

‘নদী এখানে ট্রামের লাইনের মতো যেন

বিজ্ঞাপন

কিম্বা টেলিগ্রাফের তারের মতো

টেলিফোনের তারের মতো

নদীকে এখানে কে কবে দেখেছে?’

দেশের বিপন্ন নদীগুলোর দিকে তাকালে মনে হবে তিনি বোধ হয় কবিতাটি সম্প্রতি লিখেছেন।

ধূসর পান্ডুলিপির ‘অনেক আকাশ’ শিরোনামের কবিতার কয়েকটা লাইন:

‘যেইখানে পৃথিবীর মানুষের মতো ক্ষুব্ধ হয়ে

কথা কয়, আকাঙ্ক্ষার আলোড়নে চলিতেছে বয়ে

হেমন্তের নদী, ঢেউ ক্ষুধিতের মতো এক সুরে

হতাশ প্রাণের মতো অন্ধকারে ফেলিছে নিঃশ্বাস।’

অর্থাৎ হেমন্তের নদী মানুষের মতো ক্ষুব্ধ হয়’ কথা কয়। মানুষের মতো তারও জীবনে হতাশা আসে। তারপর অন্ধকারে সে নিঃশ্বাস ফেলে।রূপসী বাংলার কয়েকটা লাইন:

‘বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে

কৃষ্ণা দ্বাদশীর জোছনা যখন মরিয়া গেছে নদী চড়ায়

সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল হায়,

শ্যামার নরম গান শুনেছিল একদিন অমরায় গিয়ে

ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়

বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।’

বেহুলার পায়ের কাছে বাংলার নদী কেঁদেছিল। এখানে নদী অনুভূতিপ্রবণ। সে ঘুঙুরের মতো কেঁদেছিল মানে ঘুঙুরের যে ঝংকার, রিনিঝিনি, নদীর চ্ছলাৎ চ্ছলের সাথে তার মিল। মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থের ‘উদায়স্ত’ কবিতায়ও নদীর অনুভূতির তর্জমা: ‘সূর্যের উদয় সহসা সমস্ত নদী চমকি করে ফেলে’। নদী চমকিত হয়। অর্থাৎ নদীর অনুভূতি আছে।

মহাপৃথিবীর ‘আবহমান’ কবিতায় বলছেন: ‘নেউলধূসর নদী আপনার কাজ বুঝে প্রবাহিত হয়।’

নিজের কাজ বুঝে কে চলে? যার বোধ আছে। এখানে নদী বোধসম্পন্ন প্রাণী। তবে সেই নদীর উপর মানুষের অধিকার অনেক সময়ই অনধিকার চর্চা হতে হতে নদী মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত বিবিধ কর্মকাণ্ডে বিপন্ন হলে সেও মানুষের ভালোবাসা চায়।

রূপসী বাংলার একটি কবিতার অংশ:

‘আমাদের কালিদহ—গাঙুড়—গাঙের চিল তবু ভালোবাসা

চায় যে তোমার কাছে—চায়, তুমি ঢেলে দাও নিজেরে নিঃশেষে।’

অর্থাৎ কালিদহ ও গাঙুড় নদী মানুষের ভালোবাসা চায়। বস্তুত পৃথিবীর সব নদীই মানুষের ভালোবাসা চায়।

এই অংশেরই আরেকটি লাইন: ‘দেখিয়াছি নদীটিরে—মজিয়াছে ঢালু অন্ধকারে’। মজিয়াছে মানে তারও অনুভূতি আছে; আনন্দ প্রকাশের অবকাশ আছে।

নদী শুধু মানুষের মতো নয়; মানুষের ‍হৃদয়কেও তিনি নদীর সাথে তুলনা করেছেন। মহাপৃথিবীর ‘হে হৃদয়’ কবিতার শুরুটা এরকম: ‘হে হৃদয়, একদিন ছিলে তুমি নদী;

পারাপারহীন এক মোহনায় তরণীর ভিজে কাঠ

খুঁজিতেছে অন্ধকার স্তব্ধ মহোদধি’।

শ্রেষ্ঠ কবিতা কাব্যগ্রন্থের ‘সে’ কবিতায় নদীর জলকে প্রেমিকার চোখের সঙ্গে তুলনা করে লিখেছেন : ‘সে আমাকে নিয়েছিল ডেকে; বলেছিল; এ নদীর জল তোমার চোখের মতোই ম্লান বেতফল।’

মৃত্যুর পরে তিনি যেমন শঙ্খচিল-শালিক বা কমলালেবু হয়ে ফিরতে চেয়েছেন, তেমনি মানুষ যদি মানুষ না হয়ে নদী হতো, সেই আকাঙ্ক্ষার কথাও আছে এই কবিতার শেষ দুই লাইনে:

‘ভালোবেসে ষোলো আনা নাগরিক যদি

না হয়ে বরং হতো ধানসিঁড়ি নদী।’

জীবনানন্দের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সবচেয়ে বেশি পঠিত কবিতা বনলতা সেনের শেষ দুটি লাইন:

‘সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—

ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

অর্থাৎ পাখিদের মতো নদীও ঘরে ফেরে। পাখির যেমন ঘরে ফেরার তাড়া, তেমনি নদীরও। এখানে পাখির মতো নদীও প্রাণী হয়ে ওঠে। তারও জীবনের, বেঁচে থাকার তাড়না এখানে স্পষ্ট। এখানেও নদী জীবন্ত সত্তা।

বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থে ‘শিরিষের ডালপালা’ শিরোনামের একটি কবিতার দুটি লাইন:

‘বিকেল বলেছে এই নদীটিকে: ‘শান্ত হতে হবে’।

অর্থাৎ নদীর সাথে বিকেলের কথা হয়। এখানে বিকেল বস্তুত সময়। সময় কথা বলে নদীর সাথে। এখানে সময়েরও প্রাণ আছে। কথা বলা মানে সেখানে বাক্যশব্দসেমিকোলন থাকে। জীবনানন্দের কবিতার এটিই শক্তি যে, সেখানে জড়বস্তুতেও প্রাণ সঞ্চারিত হয়। নদী কখন মানুষে পরিণত হয়, পাঠক তা টেরই পায় না।

জীবনানন্দ বারবার ফিরে আসতে চেয়েছেন নদীর কাছে। এমনকি মৃত্যুর পরেও ভোরের কাক হয়ে, শঙ্খচিল শালিকের বেশে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে। পউষের রাত্রিতে শুয়ে থেকেছেন নদীর কিনারে। নদীর জলে খুঁজেছেন নিজের প্রতিকৃতি। নদী তাঁর কাছে সৌন্দর্যের বারতাও নিয়ে আসে। তাই বারবার নদীর গোলাপি ঢেউয়ের কাছে ফিরে আসেন। নদী তার কাছে এক অপার রহস্যও বটে। নদীর জলে তিনি শুনতে পান প্রেম ও নক্ষত্রের গান। তিনি গোধূলি নদীর মৌন জলে রূপসীর মতো প্রিয়ার মুখখানা দেখে ধীরে, ধীরে আরো ধীরে শান্তি ঝরতে দেখেন, আকাশ হতে স্বপ্ন ঝরতে দেখেন। তাঁর করুণ চোখও মাঝে মধ্যে পথ ভুলে ভেসে যায় ময়জানি নদীর পাশে। যখন হৃদয়ে তাঁর তাতার বালির মতো তৃষা জেগে ওঠে, তখন নদীর আঁধার জলে ভরে যায় তাঁর বুক। তিনি দেখেন গ্রামবালিকা স্নান সেরে তার শাড়ি যখন দুপুরের রোদে নদীর তীরে শুকোতে দেয়, তখন তা যেন হলুদ পাতার মতন সরে যায়।

জীবনের নিত্যদিনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর সঙ্গে নদীর যে সম্পর্ক, জীবনানন্দ তিনি উপলব্ধি নিজের জীবন দিয়ে। তিনি যখন মৃত্যুর ঘুমে শুয়ে রবেন, তখনও এই নদীর পাশে নিজেকে কল্পনা করেন। যেন এই নদী মৃত্যুর পরেও তাকে আপন মমতায় বেঁধে রাখে। আকাশের থেকে দূরে আরো দূর নির্জন আকাশে যখন তিনি অকারণ ঘুমে ঢুলে পড়ে যান, তখন তিনি এই নদীর পাশেই জেগে ওঠেন। দেখেন তাঁর শ্মশানচিতা বাংলার ঘাসে ভরে আছে। বাসকের গন্ধ পান। দেখতে পান আনারস ফুলে ভোমরা উড়ছে। গুবরে পোকার ক্ষীণ গুমরানি বাতাসে ভাসছে। এরা তাঁকেই ভালবাসে। এদের ভালবাসার টানেই তিনি ফিরে আসেন বারবার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View