চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নতুন বেতন কাঠামোর বিরুদ্ধে বৈষম্যসহ নানা অভিযোগ

প্রধানমন্ত্রীর ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সুবিধা কমানো যাবে না’ বলে সুস্পষ্ট নির্দেশনা অমান্য, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ, ক্যাডার ও ননক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম বৈষম্য সৃষ্টির ‘ষড়যন্ত্র’, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণে সরকারের অঙ্গিকার পরিপন্থি, সংবিধানের মৌলিক অধিকার এবং জাতিসংঘের আন্তজার্তিক আইনের বিরুদ্ধ এমন অন্তহীন অভিযোগ সদ্য জারিকৃত চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫’ এর বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশ সম্মিলিত সরকারি কর্মকর্তা পরিষদ (বাসসকপ) এর মহাসচিব মোঃ জিন্নাত আলী বিশ্বাস এবং সংগঠনটির সহসভাপতি ও প্রাইমারি এডুকেশন সার্ভিস এসোসিয়েশন’এর সহ-সভাপতি শেখ অহিদুল আলম চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সম্প্রতি ঘোষিত ৮ম বেতন কাঠামোর বিরুদ্ধে বৈষম্য সৃষ্টির নানা অভিযোগের ডালা খুলে বসেন। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে গত ২৪ ডিসেম্বর সপ্তাহ ব্যাপী আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণাসহ দাবি অনাদায়ে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলো বাসসকপ’র নেতারা।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের ননক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তাদের একমাত্র জাতীয় সংগঠন বাসসকপ’র মহাসচিব ও সহ-সভাপতি আলাপকালে ২৩ ডিসেম্বর তারিখে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে উত্থাপিত নয় দফা দাবির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যাসহ তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের বৈষম্যের শিকার হওয়ার প্রকট রূপ তুলে ধরেন।

বেতন বৃদ্ধির নামে ব্যাপক বৈষম্য
বেতন শতকরা শতভাগ বৃদ্ধি করা হলেও উপরের গ্রেডে এ বৃদ্ধি যেমন জ্যামিতিক হারে বিপরীতে নিচের গ্রেডে তা জ্যামিতিক হারে হ্রাস পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন বাসসকপ’র সহ-সভাপতি এবং প্রাইমারি এডুকেশন সার্ভিস এসোসিয়েশন’র সহ-সভাপতি শেখ অহিদুল আলম। উদাহারণস্বরুপ তিনি বলেন, ২০তম গ্রেডে মুল বেতন ৪১০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮২০০ টাকা। এখানে ১০০% বৃদ্ধি হিসেবে ৪১৫০ টাকা বেড়েছে। কিন্তু প্রথম গ্রেডে ৪০ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭৮ হাজার টাকা হয়েছে। এখানে বেড়েছে ৩৮ হাজার টাকা। এ বিধানকে ‘তেলা মাথায় তেল দেয়া’, ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ মন্তব্য করে তা বাজারে অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করেছে বলে ক্ষোভ জানান তিনি।

প্রশাসন ক্যাডারের প্রতি ক্ষোভ
‘বৈষম্যমূলকভাবে’ প্রশাসন ক্যাডারে পদ ছাড়াই পদোন্নতি দেয়ার সুযোগ আছে উল্লেখ করে বাসসকপ’র মহাসচিব মোঃ জিন্নাত আলী বলেন, প্রশাসন ক্যাডারের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব ইত্যাদি পদগুলোতে পদের চেয়ে দুই বা আড়াইগুণ বেশি পদোন্নতি দেয়া হয়। যা অন্য ক্যাডার, ননক্যাডার কাউকেই দেয়া হয় না। এর ফলে পদের বাইরে কর্মকর্তাদের ওএসডি করতে হয়। এদের বেতন-ভাতাদি খাতে ব্যয় সরকারের ক্ষতি। এছাড়াও বাধ্য হয়ে এদেরকে বিভিন্ন বিভাগের শীর্ষপদে প্রেষণে পদায়ন করাও একধরনের রাষ্ট্রীয় অপচয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ক্ষোভ প্রকাশ করে বাসসকপের এই নেতা বলেন, বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী বড় বড় সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল পদে সরকারি কলেজের প্রফেসরদের যাওয়ার সুযোগ রহিত করা হয়েছে। প্রিন্সিপাল তৃতীয় গ্রেড পক্ষান্তরে প্রফেসর ৪র্থ গ্রেড। ফলে এটা প্রশাসন বা অন্য বিভাগের লোকদের প্রেষণে আনার একটি পায়তারা বলেও অভিযোগ করেন জিন্নাত আলী।

স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণে বাধা, ক্ষোভ প্রশাসন ক্যাডারের প্রতি
উপজেলা পর্যায়ে কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রকৌশল, প্রাণি সম্পদ ইত্যাদি বিভাগে ষষ্ঠ গ্রেডভুক্ত কর্মকর্তাসহ অন্যান্য ১৬ টি বিভাগের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতাদি উত্তোলনের ক্ষমতা ষষ্ঠগ্রেডভুক্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) নিকট অর্পণ করা হলে উপজেলা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হবে বলে মন্তব্য করেন জিন্নাত আলী। এতে করে শ্রেণী বৈষম্য তৈরি হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

উপজেলা পরিষদ আইনে শুধুমাত্র উপজেলা চেয়ারম্যানকে এই সমস্ত বিভাগসমুহের উন্নয়ন কার্যক্রমের তদারকিসহ আনুষাঙ্গিক কাজের দায়িত্ব দেয়া আছে উল্লেখ করে অহিদুল আলম বলেন, প্রশাসন ক্যাডারের উর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তা সুকৌশলে শ্রেণি বৈষম্য তৈরি করার লক্ষ্যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ন্ত্রণ, খবরদারি করার মানসিকতা নিয়েই এ আদেশ জারিতে প্রভাব রেখেছে। এর ফলে উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এক্ষেত্রে আরও অভিযোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এতে ইউএনও’র ক্ষমতায়ন করতে গিয়ে এমপি’র ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যানের বদলে ইউএনও’কে শক্তিশালী করা হইছে। এটা স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার পরিপন্থি। ইউএনও পদটিকে পরিবর্তন করে উপজেলা পরিষদ সচিব করার পক্ষেও অনেকের মত রয়েছে বলে দাবি করেন এ দুই নেতা।

চিত্র: (বাম থেকে) মোঃ জিন্নাত আলী বিশ্বাস ও শেখ অহিদুল আলম

আরও অভিযোগ
‘সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সুবিধা কমানো যাবে না’ প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরও ক্যাডার, ননক্যাডারদের সূচনা স্কেলে বৈষম্যের সৃষ্টি করে একধরনের শ্রেণী বিন্যস্ত করে ফেলা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন অহিদুল আলম। ‘টাইম স্কেল উঠিয়ে দিলেও বিকল্প ব্যবস্থায় যেনো সুবিধা আগের চেয়ে বৃদ্ধি করা হয়’ প্রধানমন্ত্রীর এমন সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও তা পূরণ হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

বাসসকপ’র নয়দফা দাবির যৌক্তিকতা ও ব্যাখ্যা
গত ২৩ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাসসকপ’র উত্থাপিত নয় দফা দাবির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যাসহ তুলে ধরেন জিন্নাত আলী ও অহিদুল আলম। তারা বলেন, ননক্যাডারদের ১ম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা তথা নুন্যতম মাস্টার্স পাস প্রয়োজন হলেও স্নাতক পাস হলেই বিসিএস দিয়ে ক্যাডার হওয়া যায় উল্লেখ করে বাসসকপ’র এই দুই নেতা বলেন, চাকরীতে প্রবেশ পদে বেতন গ্রেডে ভিন্নতা সমাজের একটি বৃহৎ মেধাবী গোষ্ঠির প্রতি অবিচার স্বরুপ।

সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা হলেও (যদিও পিছিয়ে গোষ্ঠির জন্য বিশেষ ধরনের ব্যবস্থার সুযোগ রয়েছে) নতুন চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫’এ ক্যাডার ও ননক্যাডারদের প্রবেশ পদে ৮ম ও ৯ম গ্রেডের বিধান তার পরিপন্থি বলেই দাবি করে বাসসকপ। এটা জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের মানবাধিকার দলিলের পরিপন্থি বলেও অ্যাখ্যা দেন অহিদুল হক। তিনি বলেন, বিসিএস ক্যাডাররা অগ্রসর শ্রেণীর প্রতিনিধি হলেও তাদের ‘অযাচিতভাবে’ বেশি সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সংবিধান লঙ্ঘণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘণ করা হয়েছে।

ননক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তাদের মধ্যে গবেষক, বিজ্ঞানী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন দপ্তরসমূহের কর্মকর্তারা রয়েছেন। ক্যাডার, ননক্যাডার সকল প্রথম শ্রেণির চাকরির প্রবেশ পদের বেতন গ্রেড এক ও অভিন্ন ৮ম গ্রেড করার দাবি বাসসকপ’র।

টাইমস্কেল/ সিলেকশন গ্রেড সুবিধা বাতিল করার ‘অপরিনামদর্শী’ সিদ্ধান্তের ফলে ( ১০ ও ১৬তম বছরে উচ্চতর গ্রেড সুবিধা) কর্মকর্তা কর্মচারীরা আর্থিকভাবে সামাজিকভাবে আরও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন বলে দাবি করে বাসসকপ। চাকরির বয়স বৃদ্ধির সাথে পদোন্নতির বিকল্প হিসেবে দেয়া প্রনোদনা টাইম স্কেল বাতিল করায় সিনিয়র-জুনিয়র একটি সংঘর্ষ হবে বলে মন্তব্য করেন জিন্নাত আলী। তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট সময় পরে গ্রেড এক হয়ে যাওয়ায় চাকরির ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ভঙ্গ হবে। এছাড়াও বর্তমানে ১০ ও ১৬ বছর যাদের চাকরি নেই তারা সম্পূর্ণ বঞ্চিত হবেন।

সরকার যেখানে সামাজিক, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি যেমন বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা প্রবর্তন করছে সেখানে এই ধরনের টাইম স্কেল/ সিলেকশন গ্রেড উঠিয়ে বৈষম্যমূলক বিধান প্রবর্তন করলে সিনিয়র কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অসুবিধায় পড়বে বলে মন্তব্য করেন জিন্নাত আলী।

ননক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টিতে সাংগঠনিক কাঠামো যুগোপযুগী করার দাবি করে বাসসকপ।

স্বাধীনতার পর থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গৃহ নির্মাণ লোন বাবদ সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পায় উল্লেখ করে জিন্নাত আলী বলেন, পে কমিশনের সুপারিশে এই ক্ষেত্রে ৬০ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দেয়ার কথা বলা হলেও তা মানা হয়নি। বাসসকপ’র পক্ষ থেকে গৃহ নির্মাণ লোন ৪০ লাখ থেকে ৫০ লাখ করার দাবি জানানো হয়।

সমগ্র চাকরিজীবনে কমপক্ষে ৪ টি পরবর্তী উচ্চতর স্কেল/গ্রেড পরিবর্তনের সুযোগ দাবি করেছে বাসসকপ। এছাড়াও গুচ্ছ সার্ভিস করার দাবি জানান জিন্নাত আলী ও অহিদুল হক। এর ফলে কাজের ধরণ অনুযায়ী কয়েকটি মন্ত্রণালয় নিয়ে একটি গুচ্ছ সার্ভিস করার মাধ্যমে একটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাদের গুচ্ছের অন্য মন্ত্রণালয়েও নিয়োজিত হয়ে পদোন্নতির সুযোগ পাবেন।

প্রেষণ প্রথা বিলুপ্ত করে স্ব স্ব বিভাগের লোককে শীর্ষস্থানে পৌছানোর সুযোগ করে দেয়ার দাবিও জানান তারা। এতে করে একটি বিভাগের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ রুদ্ধ হবে না বলে উল্লেখ করা হয়। অন্য সার্ভিসের কাউকে উচ্চতর পদে নিয়োগ দেয়া হলে তার আন্তরিকতার ঘাটতিসহ দেশে বিদেশে তার প্রশিক্ষণ ও নির্দিষ্ট সময় পরে তার মাদার ডিপার্টমেন্টে ফিরে যাওয়ায় রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয় বলে মন্তব্য করেন তারা।

বিজ্ঞাপন