চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নতুন ‘গেন্দাফুল’, পুরনো বিতর্ক

এতো বিতর্কের পরও, গীতিকার রতন কাহারকে স্বীকৃতি দিতে কেন পারছে না পরিচিত এলিট সমাজ?

অত্যন্ত লজ্জার বিষয়, আবার বাংলা লোকসংস্কৃতির অপমান চাক্ষুষ করতে হচ্ছে বাংলার মানুষের। কোনো ক্রেডিট ছাড়াই ‘গেন্দাফুল’ এর সেই বিখ্যাত দুই লাইন চুরি হয়ে গিয়েছিলো সনি মিউজিকে। গোটা ভারত জুড়ে প্রতিরোধ, প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তবে রতন কাহারের পক্ষ থেকে নেই কোনো কপিরাইট ক্লেইম। কোনোকালেই রতন কাহারের অনবদ্য সৃষ্টি এবং প্রতিভার মর্যাদা তো দিতে পারলামই না উল্টো তার কালজয়ী সৃষ্টির দু’লাইন, এক চটকদার হিন্দি গানের পাঞ্চলাইন হিসেবে বাংলা সংস্কৃতির ছেলেখেলার এক জঘন্যতম নিদর্শন হয়ে থেকে গেলো। এটাই কি চেয়েছিলেন গানওয়ালা রতন কাহার?

এই বিতর্কের পর দীর্ঘ সময় গেছে। গোটা ভারতের অন্তর্জালে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই বিতর্ক। শেষমুহুর্তে দায় স্বীকার করে, টিম বাদশার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় রতন কাহারের সঙ্গে। দেওয়া হয় ক্ষতিপূরণ বাবদ টাকাও।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ লকডাউনের পর করোনাকালেই রতন কাহারকে আবার বাদশার সেই অ্যালবাম ভিডিও তে গান গাওয়া অবস্থায়, নৃত্যরত ভিডিওতে যুক্ত করা হয়। তবে সেই ভিডিও নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক। বহুল্যচর্চিত সেই-

বিজ্ঞাপন

‘বড়লোকের বিটি লো / লম্বা লম্বা চুল
এমন মাথা বিন্ধে দিব / লাল গেন্দা ফুল৷’

অ্যালবামে গানের গায়ক বলা হয়েছে রতন কাহারকে। তবে দেওয়া হয়নি তাকে গীতিকারের সম্মান। গীতিকারের জায়গায় এখনও বাদশার নাম। আবারও ভারতের বাংলা সংস্কৃতি প্রেমী মানুষেরা, এই নিয়ে শুরু করেছেন বিতর্ক ও প্রতিবাদ।

গাঁয়ের একচিলতে মাটির উঠোনে একা একা বসে, সেই প্রতিবাদের কোনো আঁচই গায়ে লাগেনি স্রষ্টার! দোচালা মাটির ঘর এখন নেই! সেখানেই পাকা হয়েছে। পাকা বাড়ি করে দিয়েছে সিউড়ি পৌরসভা। চাঁদপানা ছোট্ট মেয়েটার একঢাল চুলে লাল ফিতে দিয়ে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে নিজের ট্র্যাজিক জীবনের কাহিনি তরুণ লোকশিল্পীকে শোনাচ্ছিলেন কুমারী মা। তন্ময় হয়ে সে গল্প শুনেছিলেন শিল্পী। পিতৃপরিচয়হীন নিজের একরত্তি মেয়েটা সম্পর্কে কথায় কথায় বলেছিলেন কুমারী মা, ‘এই যে এত্ত চাঁদ রূপ মেয়ের, হবে না-ই বা কেনে? জানিসই বড়লোকের বিটি আছে বটে’। এই গল্প থেকেই জন্মায় কালজয়ী সেই গান, ‘বড়লোকের বিটি লো’।

আজ আর গুছিয়ে বলতে পারেন না স্মৃতির ইতিহাস। শুধু অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন, কোন সুদূরের পানে। ১৯৭২ সাল সেটা। সে দিনের সেই তরুণ শিল্পী রতন কাহার এখন অশীতিপর বৃদ্ধা। তিনি এই গল্প শোনার পর বেঁধেছিলেন গান, যা আজ কালজয়ী! বসিয়েছিলেন নিজের মতো করে মাটির সুর! আজও সেই সুরেই জনপ্রিয়।

১৯৭৬ সালে গানটির রেকর্ডিং করেন স্বপ্না চক্রবর্তী। তারপর সেই গান অশোকা রেকর্ড কোম্পানির দৌলতে লোকের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করে৷ জেতে গোল্ডেন ডিস্ক পুরস্কারও। তিনিও দেননি স্বীকৃতি।

এখনও একই রকম জনপ্রিয় গানটির স্রষ্টা রতন শুরুটা করেছিলেন আলকাপ দিয়েই। যাত্রার দলে ডাগরআঁখির ‘ছুকরি ’ সাজতেন তিনি৷ সং সাজতেন। তাতে দু’চার টাকা পেতেন। অন্য কোনো তাগিদ ছিল না, জীবন নিয়ে। কোনো দিন অর্থও টানেনি তাকে। পরে তিনি নিজের উদ্যোগে তৈরি করেন ভাদু গানের দল। সেই নিয়েই জীবন ও বেঁচে থাকার ছোট জীবিকা। বেঁধেছেন অজস্র ঝুমুর গান। নেচে নেচে সে সব গেয়েছেনও, বহু মঞ্চে ও উঠানে। পুরস্কার, শংসাপত্র এত পেয়েছেন, যে একচিলতের ঘরে আর তা রাখার জায়গা নেই৷ এসব দিলে, মনে আনন্দও হয় না আর! এখন টাকা পেলে ছেলেদের হাত তুলে দেন, তাতেই বেজায় খুশি হয় গানওয়ালা রতন কাহার। দুটো ওষুধ কিনতে পারে। সরস্বতীর বরপুত্রর লক্ষ্মীলাভ হওয়া সহজ কথা নয় কোনদিনই৷ এই গান ব্যস্ত মানুষটাই একদিন গান ছেড়ে দেওয়ার পথ ধরেন। চলে আসতে চান গানের পথ ছেড়ে! সাংসারিক তীব্র অনটনের কারণে এমনই স্থির করে জীবিকার প্রয়োজনে হাঁটতে শুরু করেন শ্রমের পথে! একসময় নিরন্তর দারিদ্রের সঙ্গে লড়তে লড়তে একেবারে বন্ধ হয়ে যায় গান বাঁধা৷ তবে কি তাতে মন টেকে?

সেই সঙ্কট কাটিয়েও ওঠেন একসময় রতন কাহার! তবে এই গানপাগল মানুষটার খ্যাতি জোটেনি তেমন, তবে মানুষের মনের কুলঙ্গিতে ঠাঁই পেয়েছে তাঁর সুর। বীরভূমের প্রত্যন্ত গ্রাম বাসিন্দা মানুষটা বিড়ি বেঁধে, খেতে কাজ করে সংসার চালিয়েছেন৷ অভাব অনটন নিত্যসঙ্গী জীবনভর আর তাকে সঙ্গে নিয়েই মহানন্দে হেঁটে চলেছেন লালমাটির পথে। তিন ছেলে এক মেয়ের কেউই মাধ্যমিকের গণ্ডি টপকাতে পারেনি পয়সার অভাবে৷ মেয়েটা ভালো গান গায়, কিন্তু একটা হারমোনিয়ামও কিনে দিতে পারেনি অসহায় বাবা রতন কাহার৷ মেয়েও বাবাকে নিয়েছে নিজের মতো। তবে শ্রদ্ধা আছে অটুট।

এখন আর বিড়ি বাঁধার ক্ষমতা তেমন নেই৷ গানওয়ালা পারে না অন্য কাজও করতে! এখন সম্বল সরকারি ভাতা এবং অনুষ্ঠান করে পাওয়া, ওই ক’টা টাকা! ভেঙেছে শরীরের দেওয়াল! কৃষ্ণ কালো মাটির উপর দাঁড়িয়ে দুই চোখের কিনারে চলকে ভেসে আসে এক উজ্জ্বল আলো! তাতেই গিয়েছেন নিজের নৌকায় বিস্মৃতির আড়ালে৷ কে আর কদর করে তাঁর! সময়নান্তরের বাঁক তাকে পিছিয়ে নিয়ে গেছে ভবনদীর কিনারে।

লোক সংগীতের রসিক লোক ছাড়া, আর সকলেই তাকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে আজীবন!  সেই কুমারী মা নিজের জীবনের সব গল্প বলেছিল রতনকে৷ ওর জীবনের আশ্রয়দাত্রী ছিল হরিদাসী৷ সেই প্রৌঢ়ার একটা ঝুমুরের দল ছিল৷ ওর কাছে থেকেই সুর নিতে গিয়ে তখনই আলাপ৷ সেই তরুণীর গল্পে এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন, যে গানটা লেখার সময় ওই গল্পটাই মাথায় ঘুরছিল রতন কাহারের৷ ইশারায়-ইঙ্গিতে সেই মেয়েকে বাবুর বাগানে দেখা করতে বলত তার প্রেমিকটি৷ অল্প বয়সে না বুঝে সেই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে মেয়ে৷ যখন টের পায় শরীরে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে, তখন পিতৃত্ব অস্বীকার করে প্রেমিক৷ সে তো তথাকথিত বড় ঘরের। শুরু হয় জীবনের টানাপোড়েনের লড়াই। তাই তার ঔরসে জন্মানো নিষ্পাপ শিশুটিকে উদ্দেশ্য করেই তৈরি হয় ‘বড়লোকের বিটি লো’ গানটি।

একসময় চুটিয়ে কাজ করেছেন আকাশবাণীতে৷ পাহাড়ি সান্যালই তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ভালোবাসার আকাশবাণীতে। নিয়মিত কাজ করেছেন তখন, একটানা বেশ কয়েক বছর। অভিমান জড়ানো গলায় বলেন, ‘আমাকে নিয়ে অনেকেই ব্যবসা করেছেন। আমার লেখা , আমার বাঁধা গান নিয়ে এসে রেকর্ড করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন৷ সবাই আশ্বাস দেন৷ কিন্তু কিছুই হয় না।’ আবার মুহূর্তেই অবশ্য অভিমান গায়েব হয়ে শিশুসুলভ সারল্য ঝরে পড়ে উনার কণ্ঠে, ‘ওরা আমাকে খুব ভালোবাসতেন৷ পাহাড়ি সান্যাল, আর্য চৌধুরী, আনন গোষ্ঠীর রাজকুমার সাহারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন আমার সঙ্গে৷ আনন গোষ্ঠীর সঙ্গেই এসে খাতায় বড়লোকের বিটি লো গানটা লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন স্বপ্না চক্রবর্তী৷ তবে তিনি রেকর্ড করার আগেই আমি গানটা গেয়েছিলাম রেডিওতে। তবে অনামী শিল্পীর রেকডিং রাখেনি আকাশবাণী। এখনও রাখে না। ফলে ইতিহাস নেই।

পূর্ণচন্দ্র দাস বাউলও গেয়েছেন আমার গান, ভাঙা গলায় বললেন রতন কাহার। তিনি আরও বললেন, আমার এই গানগুলি কিশোরী (দাশের) বাবুর ‘চন্দ্রভাগা’ পত্রিকাতে ছাপা হয়েছিল। আরও বহু কাগজে হয়েছে ছাপা!

আমাকে যারা চিনেছেন -বুঝেছেন, তারা কাজ দিয়েছেন৷ তবে সময়ের দুর্বার স্রোতে ধীরে ধীরে কাজ কমতে শুরু করে আমার জীবন থেকে৷ কেন্দ্রের পলিসিতে প্রসার ভারতী তার অনুষ্ঠানটা বন্ধ করে দেয় একসময়। পুরোনো মানুষ যারা ছিলেন, তারা অন্য জায়গায় চলে গেল৷ আর আমার জীবনে শুরু হয় ভাঁটা। থেমে যায় স্বাভাবিক ছন্দ। রতনের চিরকালের পছন্দের গান মাটির গান। আজও তাই ঝুমুর -ভাদুতেই ডুবে রয়েছেন তিনি৷ এখনও বাঁধছেন নতুন নতুন গান। নতুন প্রজন্ম খোঁজ নেয় না তেমন! তবে কেউ কেউ তার কাছে আসেন আবেগ নিয়ে!

ছবি: রাধামাধব মন্ডল

শিলাজিতের জন্য ভাদু গান লিখেছিলেন তিনি৷ এই সময়ের জনপ্রিয় শিল্পী শিলাজিৎ হাজার তিনেক টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন রতন কাহারের হাতে৷ তাতে বেশ খুশিই হয়েছিলেন। বিদ্যাসাগর কলেজে অনুষ্ঠান করে খুব প্রশংসা পান, সেই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে রতনের কথা শুনেছিলেন শিল্পী কালিকাপ্রসাদ৷ ২০১৭ মার্চে শেষ বার সিউড়ির অনুষ্ঠানে আসার পথে, রতন কাহারের বাড়িতে আসারও কথা ছিল! কিন্তু সে সময় দুর্ঘটনায় পড়ে তিনি চলে যান।

রতন কাহার বেঁচে আছে গাঁয়ের মাটিতেই! এই ভাবনার মানুষের সংখ্যা বাড়লেও, রতন কাহার আজও মাটির গহীন অন্ধকার কোণে বসে বাঁধছেন নতুন নতুন গান। মাটি, মানুষের গান। যে মানুষটা গানকে তার নিজের কন্যাসম মানতেন, গানের কথা সুর কাউকে নির্দ্বিধায় দিয়ে দিতেন, বদলে কেউ টাকা দিতে এলে বলতেন, ‘আমি বিটি বিচে টাকা লুবো না।’ কেউ জানতেও চায় না আর সেই মানুষটার কথা। এতো বিতর্কের পরও, স্বীকৃতি দিতে কেনো এতো দেরি? কেন অবহেলা? কোনো উত্তর নেই। গ্রামীণ শিল্পী জীবন আটকে রয়েছে দারিদ্র ও লাঞ্ছনায়!