চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ধানের ন্যায্য দাম পেতে খাদ্য মহাপরিচালকের তিন পরামর্শ

‘রুটি, কেক, চিপস, বিস্কুট জাতীয় খাবারে চালের ব্যবহার বাড়ানো যায়’

ধানের কম দাম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আর বিতর্কের মধ্যে কিভাবে তার দাম বেশি পাওয়া যাবে; তা নিয়ে তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরিফুর রহমান অপু।

তার মতে, চালের তৈরি খাদ্যে ও উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা এবং চাল সংরক্ষণের জন্য পেডি সাইলো নির্মাণ করা গেলেই একদিকে চালের ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে বেশি পরিমাণে চাল সংরক্ষণ করাও সম্ভব হবে। আর এতে কৃষক তার উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য পাবে।

বিজ্ঞাপন

চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে আরিফুর রহমান অপু বলেন, মাঝেমধ্যে আমরা অধিক আলু বা গমের আটা খাচ্ছি। কিন্তু চালের খাদ্যে বৈচিত্র্য আনলে চালের ব্যবহার বাড়বে। একই সঙ্গে কৃষকরাও ধানের ন্যায্য মূল্য পাবে।

কিভাবে খাদ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে অর্থাৎ চালের বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে হবে তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি।

“প্রতিদিন আটা বা ময়দা দিয়ে রুটি, কেক, চিপস, বিস্কুট জাতীয় অনেক খাবার তৈরি হচ্ছে। কিন্তু চাউল দিয়েও এগুলো তৈরি করা যেতে পারে। ভিয়েতনাম, চীন জাপানসহ বিভিন্ন দেশে চাল দিয়ে এগুলো তৈরি করা হয়।”

আরিফুর রহমান বলেন, যেহেতু দেশের জমিগুলো ধান উৎপাদনের জন্য বেশি উপযোগী সেক্ষেত্রে চালের ব্যবহারে বৈচিত্র্য আনতে হবে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রত্যেকবার আমরা যদি ৪শ গ্রাম খাবার খাই এর মধ্যে অন্তত দেড়শ গ্রাম আটা বা ময়দা জাতীয় খাবার খাচ্ছি। কিন্তু যদি আটার পরিমাণ আরো ১শ গ্রাম কমিয়ে দেয়া যায় তাহলে চালের ব্যবহার বেড়ে যাবে। তবে শুধু খাদ্যে বৈচিত্র্য নয় উৎপাদনেও বৈচিত্র্য আনতে হবে।

‘‘কৃষকরা উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনছে না। তারা অভ্যাসগত ভাবে ধান উৎপাদন করছে। তাদের উচিত আমন, বোরো ও আউশ উৎপাদন করা, মাঝেমধ্যে অন্য ফসলও উৎপাদন করা। এতে জমিরও উর্বরতা বাড়বে। কৃষকও লাভবান হবে।’’

চাল সংরক্ষণের বিষয়ে এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, বিশ্বে ধান সংরক্ষণ করে তা শুকানোর জন্য পেডি  সাইলো (ধান সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা) রয়েছে। সেগুলোতে গরম বাতাস দিয়ে ২ থেকে ৪ হাজার মন ধান শুকানো যায় এবং ধান পরিষ্কার করা যায়। ওই পেডি সাইলোর ধান দুই বছর রাখলেও কোন সমস্যা হয় না এবং সেই ধান থেকে ভাল চাল বের করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা নেই।

তবে তারা এই বিষয়ে কাজ করছে উল্লেখ করে খাদ্য অধিদপ্তরের এই মহাপরিচালক বলেন, এ বিষয়ে আমরা ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্য যাচাই) করছি। প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে তদারকি করছেন। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি করে তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেয়া হবে। প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী দেখে করণীয় সিদ্ধান্ত নিবেন।

বিজ্ঞাপন

‘‘ব্যবসাযীরা কংক্রিট দিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ লাখ টনের একেকটি গুদাম নির্মাণ করতে পারে। কিন্তু সরকারিভাবে স্টীল দিয়ে করলে হয়তো পৌনে দুই কোটি টাকা লাগবে। এধরনের ৫টি গুদাম নির্মাণ করা গেলে অতিরিক্ত আরো ১০ লাখ টন চাল মজুদ করা

ধানের দাম পেয়ে খুশি কৃষকরা

যাবে। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।’’

জিডিপিতে কৃষকরাই বেশি অবদান রাখে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো ধনী লোকের বছরে ১শ কোটি টাকা বাড়লে তা জিডিপিতে প্রভাব রাখে না, কিন্তু কৃষকের ১০ টাকার ধান উৎপাদন করলে সেটা মোট জিডিপিতে অবদান রাখে। অর্থাৎ কৃষকের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লেই দেশের জিডিপি বাড়ে।

এ বছর কত টাকা দামে কি পরিমাণ খাদ্যশস্য কেনা হবে জানতে চাইলে আরিফুর রহমান অপু বলেন, যেহেতু এবার বাম্পার ফলন হয়েছে তাই দুই কোটি টনের বেশি ধান উৎপাদন হতে পারে। এবার ধানের মন ৭শ টাকা ধরে প্রতি কেজি চাল ৩৬ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১০ লাখ টন চাল আর দেড় লাখ টন গম কেনার সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া আরো এক লাখ টন আতপ চালসহ মোট সাড়ে ১২ লাখ টন খাদ্যশস্য কেনার সিদ্ধান্ত হয়। সারা বছর কী পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন হয় সেটা হিসাব করেই চাল কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৪ লাখ টন কেনা হতে পারে বলে জানান তিনি। কারণ এই মূহূর্তে সাড়ে ১২ লাখ লাখ টনের মত খাদ্যশস্য মজুদ আছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) আরিফুর রহমান অপু

তবে কোনোভাবেই আমদানি শুল্ক কমানোর চিন্তাধারা নাই উল্লেখ করেন তিনি।

কৃষকদের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, কৃষকরা বলেছে, তারা আগে যে ধান উৎপাদন করছে সেই চাল এখন বিক্রি করতে পারেনি। গত বছর তারা প্রাকৃতিক কারণে মার খেয়েছে। কিন্তু এবার ধানের দাম পাচ্ছে না। কৃষকরা এবার ধানের দাম না পেলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। আমরা একটি অভাবী রাষ্ট্র ছিলাম। উৎপাদনও হতো কম। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এখন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। তাই এখন কৃষকদের মুখে হাসি থাকার কথা। কিন্তু উল্টো তারা এখন ভারাক্রান্ত।

‘‘তবে সরকার যদি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে পারতো তাহলে কৃষকরা এই সমস্যার সম্মুখীন হতে না। কিন্তু এটা সরকার এখনও করতে পারেনি। কারণ আমাদের খাদ্য মজুদ রাখার সক্ষমতা কম। ইতোমধ্যে ১০ লাখ টন মজুদ রয়েছে। এর সাথে আরো হয়তো ৭ বা ৮ টন রাখা যায়। সরকারের কেনার লক্ষ্যমাত্রা ১২ লাখ টন। তাহলে এত পরিমাণে চাল মজুদ রাখবো কোথায়?”

এমন প্রশ্ন রেখে আরিফুর রহমান অপু বলেন, ‘চাইলেও আমরা এই মুহূর্তে চাল কিনতে পারতেছি না। কারণ মজুদ রাখার জায়গা সংকট।’

‘‘কৃষকরা এখন যে পরিমাণে ধান শুকায় তাতে প্রায় ২০ শতাংশ আদ্রতা থেকে যায়। এখন যদি কৃষকদের কাছে থেকে ধান কিনে আনা যেত এবং সেগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় শুকিয়ে চাল করা যেত তাহলে সেটা লাভবান হতো। কিন্তু এই ধান শুকানোর সরকারের কোনো ব্যবস্থা নেই। আর তাই কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা যাচ্ছে না এই মুহূর্তে। কারণ এই ধান কিনে গুদামে রাখলে তাতে চারা গজিয়ে যাবে।’’

Bellow Post-Green View