চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ধর্ষণ ও নারী নিপীড়ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, সংস্কৃতি

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই চট্টগ্রামে গণধর্ষণের শিকার হওয়া এক তরুণীর খবর নিশ্চয়ই পড়েছেন? ওয়ারীতে সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর মেরে ফেলা হয়েছে, সেই খবরটিও চোখে পড়েছে নিশ্চয়ই? আর সফেদ পাঞ্জাবী পরিহিত মাদ্রাসার একজন সিরিয়াল রেপিস্ট এর কাহিনী, সেটিও নিশ্চয়ই চোখ এড়ায়নি আপনার?

‘সিরিয়াল রেপিস্ট’ শব্দটি অস্বাভাবিক লাগছে? ধর্ষণের পর ধর্ষিতাকে ধর্মগ্রন্থ ছুঁইয়ে কীরা-কসম কাটিয়ে তার মুখ বন্ধ কি শুধু ধরা পড়ে যাওয়া ওই একজন হুজুরই করে? ‘ভিকটিম’ বা নির্যাতিতার মুখ বন্ধ রাখতে আর কেউ কি আর কোনো তরিকায় চেষ্টা করে না? যদি না করে, তাহলে ভয়-ডর দেখিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখার যে খবর পত্রিকায় আসে সেগুলো কিভাবে আসে? পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য সাংবাদিকেরা নিশ্চয়ই এগুলো বানিয়ে-বানিয়ে লেখেন না?

বিজ্ঞাপন

গত জুলাইয়ের ২ তারিখে বিভিন্ন পত্রিকায় আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়ে, সেখানে জানা গেছে গত ছয় মাসে প্রতিদিন গড়ে তিনটি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদন প্রকাশ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে গত ছয় মাসে ৬৩০ জন নারী ধর্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর ৩৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে অন্তত ৭ জন।

এ তো গেল শুধু ধর্ষণের পরিসংখ্যান। তবে, পরিসংখ্যানে যে প্রকৃত ঘটনার চেয়ে সংখ্যা আরো কম আছে, তা নিয়ে আপনার কোনো সন্দেহ আছে? আমার কিন্তু নেই। কারণ যত ঘটনা ঘটে তার সব পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না। বহু ঘটনাই ছলে-বলে-কৌশলে ডর-ভয়-ভীতি দেখিয়ে ধামাচাপা দেয়া হয়। ফলে, অপ্রকাশিত সেসব ঘটনা এই পরিসংখ্যানের বাইরেই থেকে যায়।যৌন নির্যাতন-ধর্ষণ-নারী নিপীড়ন

ছয় মাসে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে ধর্ষণের সংখ্যা ৬৩০টি। অপ্রকাশিত কত হবে? এর চেয়ে অন্তত ৩ গুণ? তিনগুণ হলে মোট সংখ্যাটি হবে ১৮৯০। আর ৫ গুণ হলে মোট সংখ্যাটি কত হবে? আপনি নামতা কষতে থাকুন। সেই অবসরে আপনাকে আরো কিছু তথ্য জানাই।

আপনি কি মনে করেছেন নারী নির্যাতন মানেই ধর্ষণ? জ্বী না। ধর্ষণ একটি চূড়ান্ত ঘটনা। যেটিকে সমাজ অন্যান্য নিপীড়নের তুলনায় গুরুত্বের সাথে দেখে। ধর্ষণ ছাড়াও নারী প্রতিনিয়তই নানাবিধ নিপীড়নের শিকার হতে থাকে। যেমন যৌন হয়রানি ও সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন ও যৌতুকের জন্য নির্যাতনসহ আরো নানান ঘটনা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, গত ছয় মাসে যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১২৭ জন নারী। এদের মধ্যে ৮ জন হয়রানি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। আর যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন ৩ জন নারী ও ২ জন পুরুষ।

এছাড়া পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৯২ জন নারী। এদের মধ্যে ১৩৭ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। আর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ২৬ জন নারী। এছাড়া আরো ২৯ জন নারী শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

গত ৬ মাসে যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮৮ জন নারী। যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ৫১ জনকে। এছাড়া যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ২জন।

এর বাইরে, গত ছয় মাসে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ১১জন নারী।

বিজ্ঞাপন

এই যে মৃত্যুর মিছিল এর মধ্যে ক’জনের নাম আমরা জানি? একজন নুসরাত বা একজন খাদিজার ঘটনা যখন তোলপাড় তৈরি করে, তখনি আমরা নড়েচড়ে বসি। তারপর আবার যেই-কে-সেই। নুসরাতের নিপীড়ক সিরাজের মতন, নেত্রকোনার কেন্দুয়ার মাদ্রাসা-হুজুর বেলালীর মতন সিরিয়াল রেপিস্ট আরো আছে। শ’য়ে শ’য়ে আছে।

এই ঢাকা শহরের রাস্তায়, শপিং মলে, নিউ মার্কেটে, গাউছিয়ায়, সিনেমা হলে মেয়েদেরকে দেখলেই যে সব পুরুষেরা গা ঘেঁষে দাঁড়ায় এবং মেয়েদের বুক তাক করে কনুই বাঁকিয়ে গুঁতো দিয়ে যায়, তারা কারা? তারা কি জীবনে একবারই এমন কনুই বাঁকিয়ে মেয়েদের বুক তাক করেন? নাকি বার-বারই সুযোগ পেলেই এটি করে তারা? তাহলে তারা কি সিরিয়াল নিপীড়ক নয়?

যেসব ভদ্দরনোকেরা মেয়েদের ফেসবুক ইনবক্সে শিশ্নের ছবি, নগ্ন নারী বক্ষের ছবি, মৈথুনরথ নর-নারীর ছবি পাঠান, তারা কারা? তারা কি জীবনে এক নারীকেই এধরনের ছবি পাঠান? তারাও কি সিরিয়াল কিলারের মতন নয় ধারাবাহিক যৌন নিপীড়ক?যৌন নির্যাতন-ধর্ষণ-নারী নিপীড়ন

ধর্ষণ থেকে শুরু করে নারী নিপীড়নের যতগুলো ধরনের কথা উপরে বলা হলো, সেগুলো নিয়ে এবারে ‘প্যাটার্ন স্টাডি’ করুন। অর্থাৎ উপরের ঘটনার ধরনগুলো ভালো করে খতিয়ে দেখলেই বুঝবেন যে, এই দেশে নারী নির্যাতন দৈবাৎ ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং নারী নির্যাতন এদেশে সংস্কৃতির অংশ।

কন্যাকে, স্ত্রীকে, নারীকে এই দেশে হেয় করে দেখা হয়। তার উপরে জোর খাটানো যায় বলে এই দেশের সংস্কৃতি মনে করে। নারীর নিপীড়নকে এই দেশের সংস্কৃতি অনুমোদন করে বলেই এমনকি সিনেমায়, গানে ও কবিতায়ও পর্যন্ত নারীর উপর নানান রকম জবরদস্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়। আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?

“চুমকি চলেছে একা পথে, সঙ্গী হলে দোষ কী তাতে” গানটি খেয়াল আছে? অথবা মনে আছে কি ‘মেলায় যাই রে’ গানটির কথা? এই গানেই আছে, “বখাটে ছেলের ভিড়ে ললনাদের রেহাই নাই” কলিটা। এই গানগুলোকে আপাত অর্থে নির্দোষ মনে হলেও এগুলো নির্দোষ নয়। এগুলো জন-মানসের প্রতিচ্ছবি। অর্থাৎ, সমাজ নারীকে এভাবেই দেখে। নারীর ‘না’-এরও মূল্য নেই। ‘হ্যাঁ’ এর ও মূল্য নেই। তাই, জোর করেও একা পথে চলা চুমকির সাথী হয়ে যাওয়ার আবদার ধরা যায়।

কোনো নারীকে সমাজে তার অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দিতে চাইলে তার চরিত্র ধরে টান দেয়া হয়। তাকে নষ্টা, ভ্রষ্টা, পতিতা, মাগি বলা হয়। নারীটি ‘ক্যারেক্টার এসাসিনেশান’-এর শিকার হয়। অর্থাৎ তার চরিত্রে ‘কালিমা লেপন’ করা হয়। কেননা এই সমাজ মনে করে, নারীর চরিত্রে একবার দাগ লাগিয়ে দিতে পারলেই হলো। সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুলেও আর সেই ময়লা উঠবে না। তাই, কোনো তরুণের সাথে তরুণীর প্রেম ভেঙে গেলে বা কোনো ছাত্রকে ডিঙিয়ে ছাত্রীটি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে গেলে নারীটির চরিত্র ধরে টান দেয়া হয়; করা হয় অশ্লীল ইঙ্গিত।যৌন নির্যাতন-ধর্ষণ-নারী নিপীড়ন

এই যে সমাজের মানসিকতা এটি তো ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকল শ্রেণীতে বিরাজমান। বিরাজমান বলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুমানা মঞ্জুরকেও মেরে-পিটিয়ে-রক্তাক্ত করে অন্ধ করে দিতে পারে একজন পুরুষ। এই সংস্কৃতি বিরাজমান বলেই মিতুর স্বামী আত্মহননের আগে স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে কথা তুলতে পারে। এই সংস্কৃতি বিরাজমান বলেই এমনকি অগ্নিদগ্ধ নুসরাতের চরিত্র নিয়েও কথা বলে এই সমাজ। এই সংস্কৃতি বিরাজমান বলেই নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়শার চরিত্র নিয়ে কথা বলে এই অসুস্থ সমাজ।

অতএব, ধর্ষণ ও নারী নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে গেলে শুধু টোটকায় কাজ হবে না। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক ঘটনা বা দুর্ঘটনা নয়। এগুলো একই সূত্রে গাঁথা একই দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্ন-ভিন্ন বহি:প্রকাশ মাত্র।

নারী প্রশ্নে এই সমাজের সর্বাঙ্গে ব্যথা। তাই, কোনো বিশেষ এক জায়গায় ওষুধ না দিয়ে এখন এন্টিবায়োটিক খাবার সময় হয়েছে। এই সমাজকে ভেতর থেকে সারিয়ে তুলতে হলে সার্বিকভাবে নারী প্রশ্নে সমাজের মনোভাব পাল্টাতে হবে। এক দিনে এই কাজে সফল হওয়া যাবে না। কিন্তু উদ্যোগ নিতে হবে। আইন দিয়ে, প্রচার-প্রচারণা দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা করে একটি সামগ্রিক উদ্যোগ ব্যতিরেকে এই রোগ থেকে মুক্তির উপায় নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)