বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে ইসলাম রাষ্ট্র ধর্ম থাকার বিষয়ের বিরোধিতা করে দায়ের করা একটা রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশে এ ইস্যুতে কোর্টের ভূমিকা এটিই প্রথম না। সংবিধানের ৮ম সংশোধনী অনুসারে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করেছিলেন এরশাদ। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল এরশাদের তখন ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা! বিরোধী আন্দোলন সামাল দিতে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করেন তিনি। আদালত তার বৈধতা দিয়েছিলেন।
তবে এরশাদ যে খুব খারাপ একটা চরিত্র তাও আমাদের বলে দিয়েছেন কোর্ট! এরশাদ হলেন বাংলাদেশের সেই ব্যক্তি যিনি সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃক ঘোষিত দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি। জনতা টাওয়ার মামলার সেই সাজার কারণে এরশাদ পাঁচ বছর কোনো নির্বাচন করতে পারেননি। এই আমলনামাটি বাংলাদেশে এরশাদ ছাড়া আর কারো নেই। আর সপ্তম সংশোধনী বাতিলের সময় কোর্ট শুধু এরশাদকে খারাপ না, তাকে বিচারের সম্মুখিন করতেও বলেছিলেন।
সেই এরশাদ যখন হাইকোর্টের বেঞ্চগুলো দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে নিয়ে গেলেন, তখন সেরা আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারকরাও কষ্ট পেয়েছিলেন! কারণ তাদের কষ্ট করে সেসব মফঃস্বল শহরগুলোতে যেতে হতো! বাংলাদেশের সব পেশার মানুষদের প্রয়োজনে হাতিয়া-থানচিও যেতে হয়। কিন্তু বিচারকদের তা মানায় না।
অতএব তখন কোর্ট তার আদেশে খারাপ চরিত্র এরশাদের সিদ্ধান্তকৃত হাইকোর্টের বেঞ্চ ঢাকার বাইরে নিয়ে যাবার অষ্টম সংশোধনীর ধারাটি অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দেন। কিন্তু খারাপ এরশাদের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম অংশটি কোর্ট বাতিল করেননি। সেই থেকে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম। তবে এরপর বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হতে শুরু করে! শুধু একবার না, পরপর পাঁঁচবার! এই দোষ নিশ্চয়ই রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামের না।
যেমন সামরিক শাসক এরশাদ তার ক্ষমতা জায়েয করতে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করেছিলেন এ দোষটাও ইসলামের ছিলো না! এরশাদ হঠাৎ দেখেন বাংলাদেশের একটা জাতীয় মাছ ইলিশ আছে, জাতীয় ফল কাঁঠাল আছে, কিন্তু জাতীয় তথা রাষ্ট্রীয় একটা ধর্ম নাই! এমন একটা অসংগতি এরশাদ বেঁচে থাকতে কি করে রাখেন! এরজন্যে বাংলাদেশে ইসলাম রাষ্ট্র ধর্ম হলো তার মতো একজন কামরুল হাসান ঘোষিত ‘বিশ্ববেহায়া’ এবং সুপ্রিমকোর্ট ঘোষিত দুর্নীতিবাজের হাতে! ইসলাম রাষ্ট্র ধর্ম হবার পর দেশ যেখানে পবিত্র হবার কথা সেখানে উল্টো হতে থাকে অপবিত্র, দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন! ইসলামের এসব অবমাননার অপরাধে নিশ্চয় ওই রাজনীতিকরা ইসলাম নির্দেশিত পথে শাস্তি পাবেন। ইসলামের পুরস্কারের নাম বেহেস্ত। শাস্তির নাম দোজখ।
বাংলাদেশের লোকজন সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের কথা বলে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল! সেই স্বাধীন সংবিধানের জাতীয় চার নীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা সংযোজন করা হয়! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দেশের সবচেয়ে নিগৃহীত সম্প্রদায় ছিল হিন্দু সম্প্রদায়। হিন্দু-মুসলমান ধর্মীয় ভিত্তিতে দেশ বিভাগ হয়। সিংহভাগ হিন্দু তখন ভারতে চলে যান।
কিন্তু এরপরও দেশপ্রেম, জন্মভূমির টান এসব রোমান্টিক কথাবার্তায় (!) উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে যায়নি! এরজন্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় পাকিস্তানিরা দেখেছে এটি হিন্দুদের ষড়যন্ত্র! তারা ষড়যন্ত্র করে কিছু মুসলমানের মাথা খেয়েছে! তাদের ফুসলিয়ে নিয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধে! নতুবা কোন সাচ্চা মুসলমান কি মুসলমানদের দেশ পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করতে পারেন? এরজন্যে মুক্তিযুদ্ধ নির্মূলকে পাকিস্তানি এবং তাদের এদেশীয় দোসররা হিন্দু নির্মূল হিসাবে দেখেছে! তারা পুড়িয়ে দিয়েছে তাদের বাড়িঘর। পুড়িয়ে দেবার আগে লুট করে নিয়ে গেছে সব বিষয় সম্পদ! এমনকি রাস্তায় লুঙ্গি খুলেও পরীক্ষা করেছে ব্যাটা হিন্দু না মুসলিম!
ভারতে আশ্রয় নেওয়া মুক্তিযুদ্ধের নেতারা অবশ্য তখন বলা শুরু করেন স্বাধীন বাংলাদেশ হবে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। তখন আবার তাদের কৌশলগত কারণেও এটা বলতে হয়েছে! কারণ এটি তখন না বললে কিন্তু ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকতো না। তাই মুক্তিযুদ্ধের নেতারা প্রতারক হোন আর যাই হোন, বুদ্ধিমান ছিলেন। যুদ্ধের পরও তারা সেই অভিনয় করে যেতে থাকেন! বাংলাদেশ অফিসিয়ালি হয় একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। কিন্তু বাংলাদেশ তখনই মুসলমান রাষ্ট্রগুলোর সংগঠন ওআইসির সদস্য হতে দেরি করেনি! অথচ এই ওআইসির প্রভাবশালী সদস্যরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলো। পঁচাত্তরে হত্যাকাণ্ডের পর আর ধর্মনিরপেক্ষ অভিনয় চলেনি। শুরু হয় সব ডাইরেক্ট একশ॥
জয় বাংলা একটা হিন্দুয়ানি শ্লোগান! তাই পাকিস্তান আদলে রাষ্ট্রীয় শ্লোগান হয় বাংলাদেশ জিন্দাবাদ! কর্নেল তাহেরসহ শতশত মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের হত্যাকারী জিয়ার হঠাৎ নজরে এলো সংবিধানের ওপরে বিসমিল্লাহ লেখা নেই! এটা অন্যায়, হিন্দুয়ানি ষড়যন্ত্র! এটা চলতে পারে না! অতএব জিয়ার মতো একজন ইসলামপ্রেমিক ব্যক্তি সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন করেন। এরশাদ ছিলেন জিয়ার চেয়েও ভালো মুসলমান! এক শুক্রবারে এক মসজিদে জুম্মা পড়তেন!
গোয়েন্দারা এক সপ্তাহ আগে থেকে নজরদারি রাখতো সেই মসজিদে। আর এরশাদ মসজিদে দাঁড়িয়ে বলতেন, তিনি আগের রাতে এ মসজিদে নামাজ পড়ার স্বপ্ন দেখেছেন! এরশাদ অবশ্য যে কথাটি বলতেন না সেটা হলো, তিনি স্বপ্ন দেখার এক সপ্তাহ আগে মসজিদটি নিয়ে স্বপ্ন দেখে ফেলেছিলেন গোয়েন্দারা! তাই তারা এক সপ্তাহ আগে থেকে নজরদারির কাজ শুরু করেন! এভাবে জিয়ার হাতে বিসমিল্লাহ এরশাদের হাতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ফিরে আসে!
মূলতঃ এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়া এই দুই নেত্রীর বিকাশ হয়। এই নেত্রীরা এরশাদের বিরুদ্ধে কতো যে খারাপ কথা বলেছেন, তার কোন লেখাজোখা নেই! কিন্তু এই দুই নেত্রী অন্তত একটি ইস্যুতে এরশাদের অনুসারী! রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম ইস্যুতে। স্বামী জিয়ার সংবিধানে বিসমিল্লাহ খালেদা জিয়া মেনে চলবেন এটি স্বাভাবিক। কিন্তু এরশাদের রাষ্ট্রধর্মও তিনি বাদ দেননি।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে একুশ বছর পর ক্ষমতায় ফিরিয়ে সংবিধান সংশোধনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা শেখ হাসিনার ছিলো না। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সে ক্ষমতা হয়। তখন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বের কমিটি প্রতিদিন কত আগডুম বাগডুম করেছে! আবার শেখ হাসিনার সামনে যাবার পর সুরঞ্জিত বাবুও বলতে শুরু করেন ‘বাক বাকুম পায়রা’! আরেক সাংবিধানিক জগাখিচুড়ির যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশের! যেখান জাতীয় চারনীতির একটা ধর্মনিরপেক্ষতা! আবার রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম! এটি কোন কিসিমের ধর্ম নিরপেক্ষতা?
বাংলাদেশের হিন্দুরা ও সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগকে আপন ভাবেন। আওয়ামী লীগও ভাবে তারা তাদের ভোটব্যাংক! ব্যাটারা যাবি কই? ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করার পর অন্য ধর্মাবলম্বীরা কার্যত এদেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। দেশের হিন্দুসহ সব সংখ্যালঘুর বড় আশা ছিল আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরলে সাংবিধানিক এই বৈষম্য ঘুঁচবে। কিন্তু তা যে আর হবে না তা আওয়ামী লীগ এরমাঝে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ কেন এটা করেছে এরও একটা ব্যাখ্যা দেই। একবার আমার এলাকার কিছু আদিবাসী খাসিয়াদের জমিজমা দখল করলো স্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু লোকজন! ক্ষতিগ্রস্ত খাসিয়ারা এলো আমার কাছে। আওয়ামী লীগের এমপিকে ফোন করতেই তিনি জবাব দিলেন, খাসিয়া ভোট কয়টা? ভোট যেদিকে বেশি আমি সেদিকে! এই হলো দেশের সংখ্যালঘুদের প্রকৃত অবস্থা! তারা আওয়ামী লীগকে আশ্রয় ভাবেন! আওয়ামী লীগ করে ভোটের হিসাব! কাজেই ক্ষমতাসীনদের বলবো ধর্মনিরপেক্ষতার নামে দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতারণা করে কী লাভ?
ভোটের জন্যে আপনাদের কাছে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম! কাজেই বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র তথা ধর্মীয় রাষ্ট্র ঘোষণা করলেইতো হয়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতারিত সংখ্যালঘু তথা হিন্দুরা এমনিতেও নানাভাবে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বুদ্ধিমানরা বুঝে গেছে এই দেশ আসলে তাদের না। অতএব দেশটাকে ইসলামী ধর্মীয় রাষ্ট্র ঘোষণা করলে যাদের পোষাবে, জন্মভূমির মায়ার কথা বলে কেউ এখানে পড়ে থাকতে চাইলে মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে অথবা চলে যাবে। কেউ কারো ক্ষমতার গুটি অথবা বাগড়া হবে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)






