চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ধর্মীয় উন্মাদনা দেশ ও মানুষকে বিপন্ন করে তুলছে

এক.
দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ আর মৌলবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা যে দিন দিন আশংকাজনকভাবে বাড়ছে তা আবার নতুন করে প্রমাণ করে দিলো খেলাফত মজলিসের কট্টরপন্থী ইসলামী নেতা মাওলানা মামুনুল হক। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানতে পারি, তিনি ১৩ নভেম্বর খেলাফত মজলিসের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত মূর্তি আর ভাস্কর্যকে অনৈসলামিক, ইসলাম বিরোধী আখ্যা দিয়ে এসব ভেঙ্গে ফেলার হুংকার দিয়েছেন। খেলাফত মজলিশ নেতা মামুনুল হক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, যদি দেশ থেকে সরকার এসব মূর্তি, ভাস্কর্য অপসারণ না করে তাহলে এর জন্য যে ভয়ংকর পরিণতি হবে তা এই সরকারকেই ভোগ করতে হবে। উগ্রপন্থী মামুনুল হক বঙ্গবন্ধুর ওপর নির্মিত ভাস্কর্যও ভেঙে ফেলার কথা বলেন এবং ভেঙে ফেলা সেই ভাস্কর্য বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই মামুনুল হক শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার কথা বলেই থেমে থাকেননি তিনি আরও বলেছেন সরকার যদি মূর্তি, ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে না আসে তাহলে আরেকটি শাপলা চত্বরের ঘটনা ঘটাবেন।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে কটাক্ষ এবং ২০১৩ সালে আওয়ামী সরকারকে উৎখাত করতে চরমপন্থি আল্লামা শফি হুজুরের নেতৃত্বে সংগঠিত শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামীর ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচির মতো আরেকটি শাপলা চত্বরের ঘটাবার হুমকি দেশে বিদেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সুশীল সমাজসহ দেশের প্রগতিশীল সব পক্ষ তার এই বক্তব্যে আশংকা ব্যক্ত করেছেন। তারা মনে করছেন মজলিশ নেতা উগ্রপন্থী মামুনুল হকের এই বক্তব্য ইতিমধ্যে মুক্তমনা, উদারপন্থী চিন্তাভাবনার মানুষজনকে আতংকের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

মামুনুল হকের এরকম এই বক্তব্যকে সরাসরি সমর্থন করেছেন আরেক চরমপন্থি ইসলামী নেতা হেফাজতে ইসলামের আমীর জুনাইদ বাবু নগরী। ২৮ নভেম্বর চট্টগ্রামে এক ইসলামী সমাবেশে বাবু নগরী মামুনুল হকের বক্তব্যর সঙ্গে সুর মিলিয়ে সরকার আর সরকার প্রধান শেখ হাসিনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, আমি কোন পার্টির নাম বলছি না, কোন নেতার নাম বলছি না…। কেউ যদি আমার আব্বার ভাস্কর্য স্থাপন করে সর্বপ্রথম আমি আমার আব্বার ভাস্কর্যকে ছিঁড়ে, টেনে হিঁচড়ে ফেলে দেব।’

কয়েকদিনের ব্যবধানে খেলাফত মজলিশ আর হেফাজতে ইসলামীর দুই নেতার এরকম ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিবাদ আর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরণের ভীতি আতংকের সৃষ্টি হয়েছে।

দুই.
মূর্তি আর ভাস্কর্য নিয়ে মামুনুল হক ও বাবু নগরীর বক্তব্য যে নিছক তাদের মনগড়া সেটা বোঝা যায় বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি মাওলানা জিয়াউল হাসানের বক্তব্য থেকে। তিনি ২২ নভেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘বাঙালি সংস্কৃতি বিজাতীয় সংস্কৃতি নয়, এটি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতিতে যেসব জিনিস শিরক বা আল্লাহর সঙ্গে অংশীবাদিতার মিশ্রণ ছাড়াই পালিত হয়ে আসছে, সেটিকে হঠাৎ করে শিরক সংস্কৃতি বলা নোংরা রাজনীতি ছাড়া কিছুই নয়। বুখারি শরিফের শুরুতেই রয়েছে—বিখ্যাত হাদিস, “ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়্যাত (নিয়তের উপর কাজ নির্ভরশীল)”। মূর্তি বা ভাস্কর্য মানেই শিরকের উপকরণ নয়। হযরত আয়শা (রা.)-এর ঘরে ঘোড়ার ছোট মূর্তি রাখা ছিল (সূত্র: বুখারি শরিফ-কিতাবুল আদাব)। কই, রসূল (সা.) তাকে তো নিষেধ করেননি। এই ছোট পুতুল বা মূর্তি পূজার জন্য ছিল না; বরং খেলার জন্য ছিল। তাই রসূল (সা.) নিষেধ করেননি। একইভাবে যেসব ভাস্কর্য সৌন্দর্য্য চর্চা ও রুচিশীলতার পরিচয় বা ঐতিহাসিক কোনও ঘটনার স্মৃতিফলক হিসেবে স্থাপিত হয়, তা ইসলামি শিক্ষানুযায়ী নিষিদ্ধ নয়।’

মূর্তি-ভাস্কর্যের পক্ষে বিপক্ষে ধর্মীয় নেতাদের এরকম বক্তব্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে একধরণের বিভ্রান্তির।

তিন.
দুই মৌলবাদী নেতার এরকম বক্তব্যে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের চোখ কপালে উঠেছে। সরকারের শীর্ষ নেতারা তাদের এই বক্তব্যকে সহজভাবে নিতে পারেননি উল্টো এই বক্তব্য নিয়ে সরকারের মধ্যেও এক ধরনের হতাশা দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সরকারপন্থী অনেক বুদ্ধিজীবীকে এখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলতে শোনা যাচ্ছে, বিগত দিনে আওয়ামী লীগের আশ্রয় প্রশ্রয় ও সুযোগ সুবিধা ভোগ করে ধর্মীয় এই অপশক্তিটি আজ পত্রপল্লবে বিকশিত হয়েছে। ইদানিং এই ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তিটি আওয়ামী লীগ তথা দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করার মতো দুঃসাহস দেখাচ্ছে।

অন্যদিকে দেশের প্রগতিশীল সকল সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠনসহ সুশিল সমাজ ও মুক্তমনারা মামুনুল হক আর বাবু নগরীর এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা সরকারকে অতি দ্রুত ধর্মীয় মৌলবাদী তথা জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী এসব উগ্রপন্থী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়ার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগের আমলে ধর্মীয় মৌলবাদের এই উত্থান কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

অন্যদিকে দেশের খেটে খাওয়া সকল ধর্মের সাধারণ মানুষ মনে করছেন, সরকার যদি আল্লামা শফি হুজুরের নেতৃত্বে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই ধর্মীয় মৌলবাদীদের ব্যাপারে আরও কঠোর অবস্থানে থাকত তাহলে তারা আজ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করার কথা উচ্চারণ করার সাহস পেত না।

চার.
আমি নিজেও ছাত্রজীবন থেকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। স্বপ্ন দেখি একটি উদার গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশের। কিন্তু বর্তমানে দেশে যে পরিস্থিতি দিন দিন দেখছি তাতে আমার সেই স্বপ্ন নিয়ে আমি নিজেই সন্দিহান। ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চের সেই অস্থির সময়গুলোতে আমি দেখেছি হেফাজতে ইসলামী কিভাবে সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে প্রশাসনের নাকের সামনে দেশবাসীকে তাদের দাপট দেখিয়েছে। তখন এব্যাপারে সরকারের রহস্যজনক নীরবতা ছিল। ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীগুলোর এই উত্থানের পেছনে কারা ছিলেন- সেসময় এরকম প্রশ্ন করা হলেও তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি বর্তমান সরকার বিভিন্ন সময় তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘সাইজ’ করতে ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী, জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী এসব ইসলামী গোষ্ঠীগুলোকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন। মূলত সরকারের মদদে এসব গোষ্ঠী নিজেদের শক্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করেছে। এখন তারা তাদের অর্জিত সেই শক্তি সরকারের বিরুদ্ধেই দেখাচ্ছে।

পাঁচ.
হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য খেয়াল করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ চিরকালের ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। এদেশে হিন্দু- মুসলমান- খৃস্টান-বৌদ্ধ সহ সব ধর্মের মানুষ পাশাপাশি একসঙ্গে থেকে নিজেদের ধর্ম পালন করেছে। দেশের ধর্ম প্রাণ সাধারণ মানুষ এখনো সেই বিশ্বাসে আঁকড়ে ধরে আছে কিন্তু কিছু সংখ্যক মধ্যপ্রাচ্যের অর্থকড়ি আর সন্ত্রাসবাদের প্রশিক্ষণ নিয়ে এদেশে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি করতে চায়- তারা দেশকে ইসলামীকরণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। এদের চাপাতির কোপে বিগতদিনে মুক্তমনা লেখক, ব্লগারদের নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। কেউ কেউ প্রাণের ভয়ে দেশ ছেড়েছেন।

দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে যদি শুনতে হয় এদেশে মূর্তি, ভাস্কর্য থাকবে না তাহলে এ বড় কষ্টের কথা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)