চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পরিবহন শ্রমিকদের ঔদ্ধত্যের উৎস কোথায়?

অনলাইন নিউজপোর্টালসহ প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমগুলোর আজকের অনলাইন সংস্করণের একটি উল্লেখযোগ্য খবর হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক পরিবহন ধর্মঘট বিশেষ করে বাস ধর্মঘট; যা পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের অতীত ঔদ্ধত্যের ধারাবাহিকতারই বহি:প্রকাশ। অর্থাৎ জনগণকে জিম্মি করে সরকারকে নত করার পুরনো কৌশল বলেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। আর এমন সময়ে এই ধর্মঘট ডাকা হলো যখন দেশবাসী ‘শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে বাসচাপা দিয়ে হত্যা’ মামলার রায় শোনার অপেক্ষায় আছে।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিভিন্ন অপরাধে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করার বিরোধিতায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলা ও উত্তরাঞ্চলের চার জেলায় বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। আজ সোমবার সকাল থেকে তাদের আকস্মিক এই কর্মসূচির কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন দূরপাল্লার যাত্রীরা। অনেকেই বাসস্ট্যান্ডে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে বাস না পেয়ে ফিরে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে খুলনা বিভাগীয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারশনের যুগ্ম সম্পাদক মোর্তজা হোসেন বলেছেন, ১০ জেলা যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার পরিবহন শ্রমিকরা সকাল থেকে স্বেচ্ছায় (?) এই কর্মবিরতি পালন করছেন। সূত্র: বিডিনিউজ২৪.কম।

এছাড়া আজ (সোমবার) সকাল থেকে রাজশাহীর সঙ্গে বিভিন্ন রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেন শ্রমিকরা। ফলে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। সূত্র: বিডিনিউজ২৪.কম। এসব পৃথক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে দুটি বিভাগীয় শহরসহ মোট ১৪টি জেলায় দিনভর বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।

পরিবহন শ্রমিক নেতাদের দাবি, তারা পরিবহন ধর্মঘট করছেন না; নতুন সড়ক পরিবহন আইনে অপরাধের শাস্তি বাড়ানোর কারণে সাধারণ শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় (?) এই কর্মবিরতি পালন করছেন। খুলনার পরিবহন শ্রমিক নেতারা বলছেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনের পর এটি কার্যকর করা হোক। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও আইনটি সংশোধন ছাড়াই বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়া হয়। এতে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে খুলনায় সব রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সূত্র: প্রথম আলো অনলাইন, ১৮ নভেম্বর ২০১৯।

তাহলে এবার দেখা যাক নতুন সড়ক পরিবহন আইনে শাস্তি ও জরিমানার বিষয়ে কী বলা হয়েছে:
১. অবহেলায় গাড়ি চালানোতে গুরুতর আহত বা প্রাণহানিতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদ- বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড।
২. উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড।
৩. লেন ভঙ্গ ও হেলমেট ব্যবহার না করায় অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা।
৪. ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোয় ছয় মাসের জেল ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড।
৫. নিবন্ধন ছাড়া গাড়ি চালানোয় ছয় মাসের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড।
৬. ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোয় ছয় মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড।

আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়ে আসছিল ‘মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩’ অনুযায়ী। সময়ের পরিবর্তনে ও চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন মহল থেকে আইনটি সংশোধন করে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার দাবিও উঠেছিল বহুদিন আগে। কিন্তু পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বাধার কারণে তা সম্ভব হচ্ছিল না। ২০১১ সালের আগস্টে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও খ্যাতিমান সাংবাদিক আশফাক মুনীর (মিশুক মুনীর) নিহত হলে সড়ক দুর্ঘটনাবিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।

বিজ্ঞাপন

এরপর গত ৫-৬ বছরে বেশ কয়েকটি আলোচিত দুর্ঘটনা ও ব্যাপক প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় সকল মহল এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং আইন সংশোধনের জোরালো দাবি ওঠে।  বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। ২০১৮ সালের প্রথম অধিবেশনে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয় ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ বিলের খসড়া। বিলটি মাননীয় স্পিকারের মাধ্যমে সংসদীয় কমিটি হয়ে চূড়ান্ত হলেও পরবর্তী প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছিল পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের চাপে। তখন সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক- দুটি সংগঠনের দুই শীর্ষ নেতাই মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। তবে গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় দেশজুড়ে গড়ে উঠা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন আইনটি জাতীয় সংসদে পাস হয়।

তবে বিলটি আইনে রূপ দিয়ে কার্যকর করার আগেই ওই বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আন্দোলনে নামেন মালিক-শ্রমিকরা। শ্রমিকদের ব্যবহার করে কথিত কর্মবিরতির নামে পরিবহন ধর্মঘট ডেকে টানা তিনদিন দেশবাসীকে জিম্মি করে রাখেন তারা। আশ্চর্যের বিষয় হলো তৎকালীন একজন মন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কথিত ওই কর্মবিরতির কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছিল। এরপর আইনটি পর্যালোচনার জন্য মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়; যেখানে মাননীয় আইনমন্ত্রীও সদস্য ছিলেন। এছাড়া জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকে ‘সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে’ সুপারিশমালা প্রণয়নের জন্য সাবেক নৌমন্ত্রী ও সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের শীর্ষ নেতা সাংসদ শাজাহান খানের নেতৃত্বে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।

এসব প্রক্রিয়া শেষে আইনটি কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত ২২ অক্টোবর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞপন জারি করে ঘোষণা দেয়া হয়, ১ নভেম্বর থেকে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকর হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে আইনটি কার্যকর করতে পুলিশসহ সকলের কাছে অনুরোধ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রচার শুরু হয়। সূত্র: কালের কণ্ঠ, ৩১ অক্টোবর, ২০১৯।

তবে সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর প্রচারণার ঘাটতির কারণে নতুন আইন সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সকল মহল ওয়াকিবহাল না থাকায় ১ নভেম্বর থেকে আইনটি কার্যকর হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রথমে এক সপ্তাহ, পরবর্তী সময়ে আরো একদফা সময় বাড়িয়ে আজ ১৮ নভেম্বর থেকে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয় সরকার। আর এদিন ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন ধর্মঘটের নামে শুরু হলো সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের উদ্ধতপনা।

যদিও এর পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। গত বছরের ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে বাসচাপা দিয়ে হত্যা মামলার রায়ের দিন অতি নিকটে। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ইমরুল কায়েশের আদালতে আগামী ১ ডিসেম্বর দেশকাঁপানো এ মামলার রায় ঘোষণার দিন রয়েছে। রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে গত ১৪ নভেম্বর বিচারক এ তারিখ নির্ধারণ করেন। নিষ্পাপ দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম মিমের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের রায় শোনার জন্য দেশবাসী অপেক্ষার প্রহর গুনছে। এর ঠিক দুই সপ্তাহ আগেই শুরু হলো ধর্মঘটের নামে উশৃঙ্খল পরিবহন শ্রমিকদের উলঙ্গ ঔদ্ধত্য; যা আমরা এর আগেও অনেকবার দেখেছি। তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীরকে বহনকারী মাইক্রোবাসকে চাপা দেয়া বাসের চালককে গ্রেপ্তার এবং পরবর্তী সময়ে তারেক মাসুদের স্ত্রীর করা মামলার রায়ের পর ধর্মঘট ডেকে দেশবাসীকে জিম্মি করেছিলেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা।

তবে ধর্মঘট এই ১৪ জেলায়ই শেষ নয়। খুলনার পরিবহন শ্রমিক নেতারা বলছেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে ২১ ও ২২ নভেম্বর সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন বর্ধিত সভা ডেকেছে। ওই সভার আলোচ্যসূচির ১ নম্বরে আছে সড়ক পরিবহন আইন সম্পর্কে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ। (সূত্র: প্রথম আলো অনলাইন, ১৮ নভেম্বর ২০১৯)। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তাদের কথায় আঁচ করা যায়, বৃহত্তর কোনো আন্দোলনে যাচ্ছেন তারা; যার মধ্যে দেশব্যাপি লাগাতর পরিবহন ধর্মঘটও থাকতে পারে।

রাষ্ট্রে বসবাস করে, সরকারের অনুমতি নিয়ে সড়কে যানবাহন চালিয়ে রাষ্ট্রের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন ও আইন অমান্য করার প্রবণতা দিনদিন যে বেড়েই চলেছে (ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে), তা আমরা বারবারই উপলব্ধি করছি। ধর্মঘট ডেকে সাধারণ মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ-দুর্দশায় ফেলে সরকারকে নতি স্বীকারে বাধ্য করে অযৌক্তিক দাবি আদায়ের এই কূটকৌশল মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, আর সরকার হলো রাষ্ট্রের চালক। তাই সরকারের উচিত জনগণের স্বার্থে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ঔদ্ধত্যের লাগাম এখনই টেনে ধরা। একইসঙ্গে তাদের ক্ষমতার উৎসও খুঁজে বের করা উচিত। তা না করতে পারলে সড়ক পরিবহন খাতে বিরাজমান বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য জ্যামিতিকহারে বাড়তেই থাকবে, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে সড়কে লাশের মিছিল।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View