চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ধরেই নিলাম প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারদের মন ছোট, তবে…

শিক্ষক তিনি, মানুষ গড়েন যিনি। এমন একটা কথা শুনে আসছি ঠিক যেদিন থেকে মস্তিষ্কে কোন কথা ধারণ করে রাখতে পারি। তবে শিক্ষক জাতি গড়েন বলতে কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের কথা বলা হয়েছে বুঝতে পারছি না। তবে এটা নিশ্চিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে বাদ দেওয়া হয়েছে মেরুদণ্ড গড়ার কাজ থেকে। হুম, এখানে শিক্ষক বলতে আমি সরকারি মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে এই শহীদ মিনারে দেখতে পাইনি।

সেখানে খুব সাদামাটা কিছু মানুষকে দেখতে পেয়েছি। যাদের শার্ট খুব কম ইস্ত্রি করা হয়, একদম কম দামী কিছু পোশাক পরিহিত অবস্থায় স্কুল বা বাজারে চলাচল করে। হাতের ছাতাটা থাকে কালো কাপড়ের, শংকর যার কোম্পানির নাম। চা বা পান খাওয়ার ইচ্ছা মনে জাগলেও পকেট জাগে না। একটাই কারণ এক কাপ চায়ের দাম ৬ টাকা। দিনে ছয় টাকা করে চায়ের বিল আসলে, মাসে আসে একশত আশি টাকা। আর চায়ের দোকানে দু’ চার জন পরিচিত ব্যক্তি থাকে যাদের কাছে ‘এক কাপ চা খান’ এই কথাটা ছুড়ে না দিলে যা শুনতে হয়, আরে প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার আর কত সোশ্যাল হবে? ওরা কি ম্যানার বোঝে? এ রকম কথা কানে বহুত আসে, শুধু থাকে না প্রতিবাদের ভাষা। কারণ মন চাইলেও পকেট চায় না। তার কারণ পকেটটা খুব ভারি থাকে না। শুধু চায়ের দোকান কেন রিকশা, ভ্যান বা যেকোনো যানবাহনে চলাচলের সময় দু এক পয়সা কম দিতে চাইলে শুনতে হয়, প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারি করে মন একেবারে ছোট হয়ে গেছে। একেবারে হাড়কিপটা, ভাড়া নিয়ে খালি টকঝক করে। স্কুলের মাঠ পার হলেই শুনতে হয়, প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার মানেই সে হবে ছোট মনের অধিকারি, কৃপণ, পোশাক হবে নিম্নমূল্যর। একদম খেটে খাওয়া মানুষদের মতো।

বিজ্ঞাপন

ধরেই নিলাম প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারদের মন ছোট, তবে সেটা কিন্তু সোনালী ব্যাংকের চেক বইয়ের জন্য। আপনার শিশু সন্তানকে আপনি দুধ খাওয়াবেন, ভাতের মাড় না। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তান কতটা সচ্ছলতার মাঝে বড় হয় সে খবর কেউ রাখে না।

যে শিক্ষকদের মূল বেতন ৯৭০০ টাকা, মেডিকেল ভাতা ১৫০০ টাকা, বাড়ি ভাড়া ৪৮৫০ টাকা, টিফিন ২০০ টাকা। বিভিন্ন খাতের টাকা এক করে তারা বেতন হিসাব করে সংসার চালায়। অথচ ওই বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম প্রহরী শিক্ষকের সমসাময়িক বেতন পায়। একজন শিক্ষক আর বিদ্যালয়ের দপ্তরির বেতনের পার্থক্য দাঁড়ায় ১০০০ টাকা (প্রায়)। তাহলে এই বেতন দিয়ে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ এমন করে দিন অতিবাহিত করে একজন শিক্ষক। সংসারের টানাটানি ফেলে কিভাবে চায়ের দোকানে গিয়ে দু’চার জনের বিল দিবে, কিভাবেই ইস্ত্রি করা শার্ট গায়ে দিয়ে বিদ্যালয়ে রোজ দিন উপস্থিত হবে, ভাড়া নিয়ে বা কেন টকঝক করবে না!

একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ৩০ দিনের লাঞ্চ খরচ পায় ২০০ টাকা, আর সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দিন পায় ২৫০ টাকা। ২০০ টাকা মাসে হলে দিন কয় টাকা হয় আর সেই টাকা দিয়ে লাঞ্চে কি কি খাবার পাওয়া যায় প্রশ্ন রইল। শিক্ষকদের হাত খরচের কথা নিয়ে চায়ের দোকানে তো ঝড় উঠবেই। শিক্ষককে সম্মান করলে জাতি সম্মান পান, শিক্ষক উপহাসের পাত্র হলে জাতির কোন কিছু আসে যায় কি না প্রশ্ন রইল।

অথচ মাননীয় শিক্ষা বিভাগের মন্ত্রী, সচিব, উপ-সচিব এরা বলে থাকেন- প্রাথমিক শিক্ষা হলো সকল উচ্চশিক্ষার মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ডই যদি হবে- শিক্ষকরা কেন শহীদ মিনারে এসে অবস্থান করবেন, বেতন বৃদ্ধি আর সামান্য সম্মান এর জন্য। শহীদ মিনারে অবস্থানকালে অনেক আমলাদের মুখে শুনেছি, আন্দোলন করতে এসেছে প্রাইমারি স্কুলের মাস্টাররা, কি ড্রেসআপ এদের। দেখেই মনে হচ্ছে এরা সরকারের তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা। আরে শার্টটা অন্ততপক্ষে ইস্ত্রি করা থাকবে, বোরকাটা একটু সুন্দর হবে।

বিজ্ঞাপন

আমলারা হয়ত ভুলেই গেছে এই তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা আপনাকে অ, আ, ক, খ, ১, ২, A, B, C, D শেখানোর জন্যই আপনি সরকারি কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতে পেরেছেন। প্রাথমিক শিক্ষা আপনার ভিত্তি মজবুত করে দিয়েছিল বিধায় আজ আপনি সরকারের আমলা হয়েছেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরকারের অনেক মাঠ পর্যায়ের কাজ করে দেয়, যা বড় বড় আমলারা জানেই না। যেমন- পোলিও খাওয়ানো, বছরের শুরুতে বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিশু জরিপ করা, স্যানিটারি ল্যাট্রিন গণনা করা, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা, ভোট গ্রহণ করা ইত্যাদি কাজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা করে থাকেন। আর এ থেকে সরকার স্পষ্ট তথ্য পেয়ে থাকেন, বিনিময়ে শিক্ষকরা পান সরকারের ১৫তম গ্রেডের বেতন আর সন্মানের দিক দিয়ে সরকার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছে গরীব স্কুল মাস্টার।

হেন ডাক তখনও বদলায়না যখন বাংলা সিনেমা তৈরি করা হয়। সিনেমার ধরনটাও এমন থাকে স্কুল মাস্টার হবে গরীব, স্বল্প আয়ের মানুষটির হাতে থাকবে বাপ দাদা আমলের ছাতা। এ থেকে বোঝা যায় স্কুল মাস্টারের জীবন কাটবে খুব নিম্নভাবে। বাস্তব জীবনে তো নিম্নভাবে কাটবেই, সিনেমাতেও বাদ যাবে না।

একটা শিশুকে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ শেখাতে কতটা পরিশ্রম করা হয় তা শুধু গরীর মাস্টার আর সৃষ্টিকর্তা জানেন। বৈষম্য দূর হোক শুধু বেতনে না, সন্মানের দিক থেকেও। প্রাথমিক শিক্ষা যদি সকল শিক্ষার মেরুদণ্ড হয়ে থাকে তাহলে শিক্ষকদের মাস স্বচ্ছল কাটবে সেই ব্যবস্থা করা হোক। তাদের সন্মান দেওয়া হোক। গরীব স্কুল মাস্টার হিসাবে ডেকে না, শিক্ষার পিলার তৈরি করার মূল নিবেদক হিসাবে।

ছোটতে একটা প্রবাদ শুনতাম ‘ছোট ছেলে বড় করছে কি করছে মাও, বর্ষা শেষ হইছে কি করছে নাও।’ সময় শেষ হলে আমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে ভুলে যাই। কিন্তু না আমরা আর ভুলে যেতে চাই না। ছোট সময় মায়ের অবদান যেমন মনে রাখব, ঠিক বর্ষা শেষে নৌকার কথাও মনে রাখব। সেই সূত্র ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কথাও মনে রাখব। বিল্ডিং এর নিচের পিলার যত মজবুত করা যায় ছাদের উচ্চতা তত বৃদ্ধি পায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনেক আদর যত্নে শিশু সুলভ আচরণ দিয়ে বর্ণ শেখানো হয় দেখেই উচ্চতর শিক্ষার গাদা গাদা নোট তারা নিজেরাই তৈরি করতে পারে। শিক্ষকের সম্মান শিক্ষকতায় তার সন্মান বৈষম্যতায় নয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View