চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দ্রোহ ও প্রেমের শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরী

মৃত্যুদিনে দ্রোহ ও প্রেমের শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরী:

গানের পরতে পরতে প্রেম ও দ্রোহ সমানভাবে চালিয়ে গেছেন। সমাজের যেকোনো অসঙ্গতিতে তিনি কথা বলেছেন গানে। আগুনের কথা যেমন বলেছেন, তেমনি রংপুরে পুলিশের হাতে ধর্ষিত তরুণী ইয়াসমিনও হয়েছেন গানের বিষয়বস্তু। আবার টিনেজ প্রেমিকের অনুভূতি নিয়েও তাকে গাইতে দেখি ‘এই নষ্ট শহরে নাম না জানা যে কোন মাস্তান’ বা ‘রিক্সা কেন আস্তে চলে না’-এর মতো কালজয়ী গান।

‘গাড়ি চলে না চলে না/চলে না রে, গাড়ি চলে না’। বাউল শাহ আব্দুল করিমের লেখা বাংলাদেশের গানের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি। এই গানের মধ্য দিয়ে দেহতত্ত্বের বিষয়টি এতো চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে যা অনবদ্য। আর এই গানটি বাংলাদেশের সব শ্রেণির মানুষের কাছে জনপ্রিয় করতে বিশেষ ভূমিকা রাখা মানুষটির নাম সঞ্জীব চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন

যে মানুষটি গানে গানে বলে গেছেন মানব জীবনের গাঁথা। প্রেম, বিরহ, সমাজ, রাজনীতি, প্রতিবাদ, দ্রোহ সমানভাবে তার গানে লেপ্টে আছে। ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি দেহ ত্যাগ করলেও তার সেই দেহ নামক গাড়িটির সৃষ্টিশীলতা এখনও চলমান।

কবি, সাংবাদিক, গীতিকার, সুরকার, গায়ক এবং সংগঠক হিসেবে খ্যাতি ছিল মেধাবী মানুষ সঞ্জীব চৌধুরীর। বর্তমান সময়ে বাপ্পা মজুমদার যে দলটির দায়িত্বে আছেন সেই ‘দলছুট’-এর প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের মাকালকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সঞ্জীব। শরীরে জমিদার বংশের রক্ত থাকার পরও সঞ্জীব চৌধুরী পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। প্রতিটি লড়াই সংগ্রামে তার সক্রিয় অবস্থান ছিল।

কবি, সাংবাদিক, গীতিকার, সুরকার, গায়ক এবং সংগঠক হিসেবে খ্যাতি ছিল মেধাবী মানুষ সঞ্জীব চৌধুরীর।

গানে গানে তিনি যেভাবে প্রতিবাদের ভাষা রপ্ত করেছিলেন তা বাংলা সংগীতে বিরল! শাসকদের চোখ রাঙানিতে যখন কম্পিত গোটা বাংলা, প্রতিটি সাধারণ মানুষের পদক্ষেপ যেখানে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করা হচ্ছে সেখানে তিনি ঠিকই শোষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ তোলেন তার গানের মধ্য দিয়ে।

অবরুদ্ধ সময়েও তার গান থামে না। চারদিকে যখন বেয়নেট আর জলপাই রঙের ওড়াওড়ি তখনও তিনি বুক চিতিয়ে বলেন, ‘ওরা বলে, ঐ গাড়িতে করে আমাদের জন্য খাদ্য আর পানীয় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন বন্ধুগণ, আমি জানি ঐ গাড়িতে আমাদের জন্য কোন খাদ্য ছিল না, আমাদের জন্য কোন পানীয় ছিল না। ৩০০ লাশ…। ৩০০ টি লাশ ঠাণ্ডা, হিম! যাদের খুন করে ফেলা হবে। আমি বলতে চেয়েছিলাম সেই সত্য কথা। আর তখনই আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্ধত রাইফেল। আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্ধত বেয়োনেট। ওরা বলে খামোশ…। তবুও বন্ধুগণ, আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই, আমার অন্তরের কথা বলতে চাই…’

পুরোদস্তুর রাজনীতি সচেতন মানুষ ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। বাম ঘরানার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা ছিল তার। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আরও গভীরভাবে ছাত্র ইউনিয়নের জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে উঠেন। দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। সাংস্কৃতিক ইউনিয়নের সম্পাদক ছিলেন। মূলত তার লড়াই সংগ্রাম আর প্রতিবাদের যে মূর্তি ছিল তা তার শিক্ষাজীবন থেকেই গড়ে উঠে।

ঢাবিতে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে আশির দশকে সাংবাদিকতা শুরু করেন সঞ্জীব চৌধুরী। আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ ও যায়যায়দিনসহ বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করেছেন। সর্বশেষ কাজ করেছিলেন যায়যায়দিনের ফিচার এডিটর হিসেবে। তার হাত ধরেই মূলত দৈনিক পত্রিকায় ফিচার বিভাগের যাত্রা শুরু। এসময় তার সহকারী ছিলেন নব্বই দশকের শক্তিমান কবি কামরুজ্জামান কামু। সঞ্জীব চৌধুরী ব্যান্ড ‘দলছুট’ গঠন করলে সেসময় তার জন্য একাধিক জনপ্রিয় গান লিখেন কবি ও নির্মাতা কামরুজ্জামান কামু।

সঞ্জীব চৌধুরীর জন্য কামুর লেখা গানগুলোর মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এরমধ্যে তোমার বাড়ির রঙের মেলায়, হাতের উপর হাতের পরশ রবে না, তোমার ভাঁজ খোল আনন্দ দেখাও এবং রিক্সা কেন আস্তে চলে না উল্লেখযোগ্য।

সঞ্জীব চৌধুরীর শারীরিক উপস্থিতি নেই। কিন্তু তার সৃষ্টি সদা চলমান। সদা প্রাসঙ্গিক। যার সৃষ্টিশীলতার গাড়ি যেন চলছেই। জন্ম কিংবা মৃত্যুদিনে তাঁকে এই প্রজন্মের স্মরণই বলে দেয় সে কথা!

Bellow Post-Green View