চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে কঠোর সরকার, প্রয়োজনে জেল-জরিমানা

যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, তাই যেন সত্যি হতে যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। দেশে সংক্রমণের পাশাপাশি মৃত্যুর হারও বাড়ছে। মাত্র দুইদিনে সংক্রমিত হয়েছে ৪ হাজার ৩৫১ জন এবং মারা গেছেন ৬০ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালে সংক্রমণের হার বাড়ছে, তবে দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি, জনসাধারণ মাস্ক না পড়লে প্রয়োজনে আইনিভাবে জেল-জরিমানা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

এরই মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। প্রথম দফার পর আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমে গেলেও দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় আবারও নতুন করে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বাড়ছে। সে হিসেবে বাংলাদেশে শীতকালে প্রথম ঢেউয়ের সংক্রমণ আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ঘরের বাইরে কোথাও বের হলে মাস্ক পরাসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই বার বার সতর্ক করলেও জনগণের মধ্যে খুব একটা সচেতনতা পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যু ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে।

প্রথম ঢেউয়ের সংক্রমণ শীতকালে আরও বাড়ছে
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ বলতে বুঝি যখন সংক্রমণের হার পাঁচ শতাংশের নীচে চলে আসে এবং একনাগাড়ে সেটি তিন সপ্তাহ থাকে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশে কখনোই করোনার প্রথম ঢেউ নিয়ন্ত্রিত হয়নি। দুদিন ধরে যে শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে সেটি প্রথম ঢেউ এরই অংশ। যা মাঝে একটু কমে গিয়েছিল, আমরা আশঙ্কা করেছিলাম শীতের সময় সেটা বাড়বে, যা কিনা এখন শুরু হয়েছে।তাই বলা যায় এটি প্রথম ঢেউয়ের সংক্রমণ বৃদ্ধি।’’

দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় জরুরিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘জনগণকে মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব মানাতে সরকারকে প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি জরিমানার দিকে যেতে হবে। পাশাপাশি সরকারের নৌবন্দর, স্থল বন্দর, বিমানবন্দরগুলোতেও নদরদারি বাড়ানো উচিত।’

ডা.লেলিন চৌধুরী

করোনার ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত মাস্ক পড়া ও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি জরুরি জানিয়ে ডা.লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘‘স্বাস্থ্যবিধি মানলে করোনা প্রতিরোধ করা যাবে তেমনি রোগ সংখ্যায় কমানো যাবে। সাধারণ মানুষকে মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্য বিধি মানতে উদ্বুদ্ধ করাতে হবে। এরজন্য সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে ব্যাপক প্রচার অভিযান করতে হবে। সেখানে ধর্মীয় নেতা থেকে শুরু করে সরকারী কর্মকর্তা, শিক্ষক, সমাজ বিজ্ঞানী, রাজনৈতিক কর্মী সবার অংশগ্রহণ থাকতে হবে।’’

একই সঙ্গে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। যারা মাস্ক পড়বে না তাদেরকে জরিমানা অথবা প্রতীকী টোকেন জেল দিতে হবে পাঁচ থেকে ১২ ঘণ্টার জন্য।

তিনি বলেন, ‘যে কোন মানুষকে নতুন একটা অভ্যাসে অভ্যস্ত করতে হলে একদিকে যেমন উদ্বুদ্ধ করতে হয়, তেমনি আরেকদিকে বাধ্য করতে হয় কিংবা জরিমানা করতে হয়। পুরস্কার ও জরিমানার মাধ্যমেই মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন হয়।’

এছাড়াও করোনার টেস্ট বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে র‌্যাপিড টেস্ট যেগুলো আছে সেগুলো প্রাপ্ততা নিশ্চিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, ‘‘কক্সবাজারসহ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে, যাদের অধিকাংশই মাস্ক পরছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচার কেউ মানে না। এমনকি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও মানুষের উপচে পড়া ভিড়। স্বাস্থ্যবিধি মানে না।

এমন অবস্থার মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। তাই সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতে হবে। এক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগসহ যা যা করার তা-ই করা প্রয়োজন।’’

দেশে খুব দ্রুত আইসিইউয়ের সঙ্কট দেখা দিবে
স্বাচিব মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, ‘বর্তমানে হাসপাতালে যেসব কোভিড রোগী যাচ্ছে তাদের অক্সিজেন ও আইসিইউ প্রয়োজন হচ্ছে। সে প্রেক্ষাপটে দেশে খুব তাড়াতাড়ি আইসিইউয়ের সঙ্কট দেখা দিবে। এরজন্য সরকারী হাসপাতালের যেসব আইসিইউ আছে সেগুলোর সঙ্গে বেসরকারী হাসপাতালগুলোর আইসিইউগুলোও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা উচিত।’

ডা. এম এ আজিজ

তিনি বললেন, ‘‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও শীতকালে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন এবং মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন। এ মুহূর্তে সারা দেশের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করা উচিত। এছাড়াও আইসিইউ, অক্সিজেন সাপ্লাই, হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা মজুত রাখা উচিত। কোভিড রোগীদের জন্য যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে কোম্পানি গুলোকে সেগুলোর উৎপাদন আরও বৃদ্ধি করাতে বলতে হবে।’’

সার্বিকভাবে চিকিৎসকদের আরও প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে মানসম্মত পিপিই ও মাস্ক মজুত করার তাগিদ দেন তিনি।

জনসাধারণের মধ্যে বিনা মূল্যে মাস্ক সরবরাহ
জনসাধারণের মধ্যে বিনা মূল্যে মাস্ক সরবরাহ করার পরামর্শ দিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর।

তিনি বলেন, ‘‘শুধু মাস্ক পরলেই নিরাপদ থাকা যাবে। বর্তমানে যে প্রস্তুতি আছে, তাতে দিনে ৩০ হাজার মানুষকে পরীক্ষা করা যাবে। কিন্তু মানুষ পরীক্ষা করাতে আসে না।’’

ডা. এ এস এম আলমগীর

করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে ৫৫ বছরের বেশি বয়স্কদের হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।

দেশে গত ৮ মার্চ প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। ১৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগীর মৃত্যু হয়। ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত করোনায় মোট মৃত্যু হয়েছে ৬ হাজার ২৫৪ জনের। এদের মধ্যে পুরুষ ৪ হাজার ৮১৩ জন ও এক হাজার ৪৪১ জন নারী।সুস্থ হয়েছেন ৩ লাখ ৫২ হাজার ৮৯৫ জন।চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭৭ হাজার ৫৩৫ জন।

এখন পর্যন্ত দেশে আক্রান্ত রোগী সংখ্যা ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৬৮৪ জন। কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনে রয়েছেন যথাক্রমে ৫ লাখ ৬৭ হাজার ২৭১ জন ও ৮৮ হাজার ৭৪৫ জন।