চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেশে গত তিন বছরে ১২ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানি

প্লাস্টিক বর্জ্যের অবৈধ বাণিজ্য এবং আন্তঃসীমান্ত পরিবহণ রোধে এসডোর আহ্বান

দেশে গত তিন বছরে প্রায় ১২ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানি হয়েছে বলে এক গবেষণা রিপোর্টে প্রকাশ করেছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) ।

আমদানি নীতি অনুযায়ী বর্জ্য আমদানি নিষিদ্ধ হওয়ার পরও বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণে বর্জ্যের আন্তঃসীমান্ত পরিবহণ এবং অবৈধ আমদানি ঘটেই চলছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

আজ বৃহস্পতিবার এসডো আয়োজিত ‘বিষাক্ত প্লাস্টিক বর্জ্যঃ বাংলাদেশে এর ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি’ শীর্ষক গবেষণার রিপোর্টে এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

রিপোর্টে দেখা যায়, গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য হতে বাংলাদেশে প্রায় বারো লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানি হয়েছে। মালয়েশিয়ান সরকার বাংলাদেশসহ মোট ১৩টি দেশ হতে আমদানিকৃত পুনঃব্যবহারযোগ্য নয় এমন প্লাস্টিক বর্জ্যের ১৫০ টি কনটেইনার সম্বলিত চালান ফেরত পাঠিয়েছে।

এসডোর চেয়ারপারসন সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ সকলকে প্লাস্টিক বাণিজ্যের ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলো, যেমন- কিভাবে এটি বঙ্গপোসাগরের বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে এবং কিভাবে তা বাংলাদেশে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এসবের গভীরতা অনুধাবনের আহ্বান জানান।

তিনি সরকারের কাছে প্লাস্টিক বর্জ্যের এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান।

প্লাস্টিক তৈরিতে কিছু বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহৃত হয় যা সময়ের সাথে সাথে পরিবেশে এসে মিশে। এই ক্ষতিকর রায়ায়নিকগুলো পরিবেশ দূষণ (মাটি, পানি, বায়ু ও জলবায়ু পরিবর্তন)- এর পাশাপাশি খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে মানব দেহে প্রবেশ করে। এর ফলে স্নায়বিক সমস্যা, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা, হৃদরোগ, রেনাল, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসসহ আরও অনেক মারাত্মক স্বাস্থ ঝুঁকি তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

এছাড়াও বাস্তুসংস্থানের প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহের উপরও প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব লক্ষণীয়, যার মধ্যে- পানি দূষণ, মাটির উর্বরতা হ্রাস, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ভেক্টর বাহিত রোগের সংক্রমণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পৌরসভার সংগৃহিত বর্জ্যের প্রায় ১২% প্লাস্টিকই পোড়ানো হয়, যা বাতাসে ডাইঅক্সিন, ফুর্যাতন্স, পারদ এবং পলিক্লোরিনেটেড বাইফেনাইলের মতো বিষাক্ত গ্যাস নির্গত করে।

পলি ভিনাইল ক্লোরাইড (পি ভি সি) পোড়ালে তা বিষাক্ত হ্যালোজেন গ্যাস নির্গত করে বাতাসকে দূষিত করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

এসডোর রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এই বর্জ্য সংগ্রহ এবং ব্যবস্থাপনার পৃথক কোনো ব্যবস্থা না থাকার কারণে প্লাস্টিক বর্জ্য অন্য সকল বর্জ্যের সাথেই মিশ্রিত অবস্থায় থেকে যায়। পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্যমতে সংগৃহিত প্লাস্টিক বর্জ্যের কেবল ৭০ শতাংশ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়। যার ফলে প্রায় ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য পদ্মা, মেঘনা এবং যমুনা নদীর মাধ্যমে বঙ্গপোসাগরে গিয়ে জমা হয় এবং এর ফলে এই জলপথ বিশ্বে ২য় সর্বোচ্চ প্লাস্টিক দ্বারা দূষিত জলপথ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, প্লাস্টিক পণ্যে ৪ হাজারেরও বেশি রাসায়নিক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫০ টি রাসায়নিকই পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য বিষাক্ত ও ক্ষতিকর। তিনি এই সমস্যা মোকাবেলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার উপর জোর দেন এবং সকল প্রকার বর্জ্য সমস্যা সমাধানে বর্জ্য মুক্ত কমিউনিটি গঠনের পদক্ষেপকেই চূড়ান্ত সমাধান বলে অভিহিত করেন।

এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের আন্তঃসীমান্ত কার্যক্রম বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের সুলভ বিকল্পগুলোর প্রচার চালাতে এবং একই সাথে বাসেল ব্যান এমেন্ডমেন্ট আইন, ইউএনইএ রেজোলিউশন আইন ও বাংলাদেশ আমদানি নীতি (২০১৫-২০১৮) বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

সময়ের সাথে সাথে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের দেশ ও পরিবেশের উপর প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব অনুধাবন করে এ থেকে মুক্তি পাওয়ার বেশ কিছু উদ্ভাবনী পন্থা অবলম্বন করছে।

সমাধান হিসেবে তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তাদের এই বর্জ্য রপ্তানী করছে। এর আগে চীন সর্বাধিক পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য গ্রহণ করছিল, কিন্তু ২০১৮ সালে চীনা সরকার প্লাস্টিকসহ ৩২ প্রকারের বর্জ্য আমদানি নিষিদ্ধ করে।

এর ফলে উন্নত দেশগুলো সস্তা শ্রম এবং সীমিত পরিবেশ নীতির কারণে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান এবং বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পাঠাচ্ছে।