চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেশে কি আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দূরভিসন্ধি চলছে?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নতুন মহাপরিচালক নিযুক্ত হলো৷ এরপর বেশকিছু কর্মকর্তার রদবদলের প্রজ্ঞাপনে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লেখা হলো ঢাকা বিমানবন্দর৷ মন্ত্রী কন্যা ঐশি খান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট প্রাপ্তির অভিযোগ করলো৷ উল্লেখ্য সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানের কন্যার করোনার হার্ডকপির রিপোর্ট হলো একরকম আর অনলাইন রিপোর্ট হল আরেক রকম৷ ভুল করোনা সার্টিফিকেটের জন্য লন্ডন যেতে পারলোনা সাবেক নৌ-পরিবহন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য শাজাহান খানের মেয়ে ঐশী খান। এ নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগও করেছেন ঐশি খান। সাবেক এই মন্ত্রী কন্যা বলেন, করোনাভাইরাসের কোনো লক্ষণ তার মধ্যে ছিলো না। রিপোর্ট নেগেটিভ হওয়ায় পরিবারের সকল সদস্যের সঙ্গে স্বাভাবিক চলাফেরা করেছি। আমার পিতা সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাতবারের নির্বাচিত এমপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খানের সঙ্গে একই গাড়িতে বাসা থেকে বিমানবন্দরে যাতায়াত করেছি, যার ফলে আমার পিতাও করোনা ঝুঁকির মধ্যে থাকবে বলে আমিসহ পরিবার দুশ্চিন্তায় আছি।

ঐশী খানের অভিযোগ সত্যি হলে কেন একটি রাজনৈতিক নেতার পরিবারকে এমন ঝুঁকিতে ফেলে দেয়া হলো? এই ভুয়া সার্টিফিকেটের দায় কি রাজনৈতিক দলের না সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী তথা আমলাদের৷ দেশে ১৭ হাজার ২৪৪ টি বেসরকারী হাসপাতাল রয়েছে ৷ তার মাঝে মাত্র ৫ হাজার হাসপাতালের লাইসেন্স আছে ৷ ১২ হাজার ২৪৪ টি হাসপাতালের কোন লাইসেন্সই নেই ৷ বিনা লাইসেন্সে স্বাস্থ্যসেবার নামে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মের নামে অপকর্ম চালানোর দায়ও কি আমলাদের নয়? জিকে শামীম, সাহেদ করিম, শারমিন জাহান গ্রেপ্তার হয় দুর্নাম হয় দলের৷ কিন্তু তারা অপকর্মগুলো করেছে কাদের সইয়ে? কোন মন্ত্রী এমপি,রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ এলে এর তদন্ত কমিটি হয় আমলাদের নিয়ে ৷ কিন্তু আমলাদের বেলায় রাজনৈতিক নেতা নয় আমলাদের নিয়েই কমিটি গঠিত হয়৷

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

করোনা মহামারিতে জেলায় জেলায় মনিটরিংয়ের দায়িত্বও দেয়া হয় আমলাদেরকে । অথচ তারা জনপ্রতিনিধি বা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত কেউ নয়। রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তিত হলেও আমলাদের পদ যায় না। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই আমলাতন্ত্রে সরকার পরিচালনার ধারাবাহিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হয়। অনেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলছেন,রাজনৈতিক দল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ক্রমশ আমলা নির্ভরতার দিকে যাচ্ছেন৷ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ রাজনীতিবিদদের হাতেই ছিল৷ কিন্তু এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই৷ গত ২০-২৫ ধরে রাজনীতিবিদরা নিজেরাই নির্ভরশীল হয়ে উঠছেন আমলাতন্ত্রের ওপরে৷ অথচ কথা ছিল আমলারাই নির্ভরশীল হবে রাজনীতিবিদদের উপর৷ কিন্তু হচ্ছে উল্টোটা৷ আমলাদের কোন রাজনৈতিক আদর্শিক সত্তা নেই৷ যারাই ক্ষমতায় যায় তাদেরই তোষণ করে তারা৷ বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে তারা হয় জিয়া প্রেমিক আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে হয় মুজিব প্রেমিক৷ বিএনপি আমলে কতিপয় আমলা বিএনপির চেয়েও বড় ‘জিয়ার সৈনিক হয়ে উঠেছিল। অতঃপর ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তারাই হয়ে ওঠে মুজিব প্রেমিক৷ অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা এমন সুবিধাবাদী আমলাদের উপরই নির্ভরশীল হয়ে উঠছে৷ জিকে শামীম, সাহেদ করিম, শারমিন গ্রেপ্তার হয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করে দলকে৷ কিন্তু আমলারাই এদেরকে দিয়ে দুর্নীতি করিয়েছে৷ বেসরকারী হাসপাতালের লাইসেন্স কে দিয়েছে? কে নবায়ন ও তাদের মনিটরিং করেনি৷ এ দায়িত্ব নিশ্চয়ই দলের নয়? সাহেদ করিম ও শারমিনের সাথে যেসব কর্মকর্তা কর্মচারী জড়িত তারা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে? বিএসএমএমইউ মামলা করল সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী ও আওয়ামী লীগের উপকমিটির সদস্য শারমিনের নামে৷ অথচ শারমিনকে দিয়ে এই দুর্নীতগুলো করিয়েছে বিএসএমএমইউর এক শ্রেনীর কর্মকর্তারাই৷ কিন্তু তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে৷ তবে কি রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে সুকৌশলে আমলাতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার সূক্ষ্ম কোন দূরভিসন্ধি চলছে?

বিজ্ঞাপন

মেডিকেলে ভর্তির প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয় প্রেসের মেশিনম্যানের খালাতো ভাই জসীম৷ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে থাকা ছাপাখানা থেকেই মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠলো৷ এক্ষেত্রে মূল অপরাধী খালাতো ভাই না মেশিনম্যান৷ স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ভাইয়ের ৯ কোটি টাকা পাচার আটকে দিলো দুদক৷ এখানে কি মূল অপরাধী ভাই না স্বাস্থ্যকর্মকর্তা৷ অটোমোবাইল কোম্পানি, অথচ দায়িত্ব পেলো করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) সরবরাহের। সেই কোম্পানির ঠিকানায় অবশ্য কোনো কার্যালয়ের অস্তিত্ব নেই। চুক্তি অনুযায়ী ৪৫ দিনের মধ্যেই সরবরাহ করার কথা ছিল পিপিই-মাস্ক-গ্লাভস। ৮৪ দিন পর্যন্ত একটি পণ্যও সরবরাহ করেনি জাদিদ অটোমোবাইলস নামে সেই কোম্পানি। অথচ ঠিকই ৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে কোম্পানিটি। এসব বিষয়ে জাদিদের মালিক যেমন কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি, তেমনি প্রকল্প কর্মকর্তাদের কাছেও মেলেনি এ সংক্রান্ত প্রশ্নের কোন উত্তর৷ এখানে মূল অপরাধী কি জাদিদের মালিক না প্রকল্প কর্মকর্তা?

বালিশ কাণ্ড, ঢেউটিন কাণ্ড, পর্দা কান্ড সবক্ষেত্রেই জড়িত আমলারা৷ তাদের পারিবারিকীকরণে, পরিচিতিতে, বন্ধুত্বে, আর্থিক সম্পর্কেই ঘটছে দুর্নীতি৷ বাংলাদেশের রাজনীতি হয়ে উঠছে আমলা নির্ভর৷ মন্ত্রীরা হয়ে উঠছে আমলা নির্ভর৷ আর সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে সরকার ও দলকে বিতর্কিত করছে এসব কর্ম৷ এসব কি তবে খুবই সূক্ষ্ম চাতুরী ও পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হচ্ছে? তবে কি এভাবেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে কমছে রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ?বাড়ছে প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের প্রভাব?এমন আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের রাজনীতি কিন্তু সুফল নয় কুফলই দেবে রাজনৈতিক দল, দেশ ও মানুষকে৷ বিষয়টা কিন্তু খুবই ভয়ের৷

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)