চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেশের তথ্যপ্রযুক্তিখাতে ২০১৭’র অর্জন ও ২০১৮’র চ্যালেঞ্জ

২০০৮ সালের ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়ে পথ চলার দ্বিতীয় মেয়াদপূর্ণ করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার। অন্যদিকে দেশও পা রাখতে যাচ্ছে নতুন বছরে। এই কয়েক বছরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিখাতে নেয়া সরকারের কয়েকটি পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেছে।

বিজ্ঞাপন

বিদায়ী বছরে দেশের আইসিটির ঝুলিতে যোগ হয়েছে বেশ কয়েকটি অর্জন। তেমনি সাইবার নিরাপত্তার মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার বছর হয়ে আসছে ২০১৮। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিখাতের অর্জন ও আগামীর লক্ষ্যগুলো চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে তুলে ধরেছে সরকারের আইসিটি বিভাগ।

আইসিটি বিভাগের দেয়া তথ্যানুযায়ী ২০১৭ সালের অর্জনগুলো
ঢাকার বাইরে দেশের প্রথম সরকারি সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের কার্যক্রম শুরু। গত ১০ তারিখে যশোরের শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এই পার্কে ইতোমধ্যে ৪১টি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

হার্ডওয়্যার সংযোজন বা উৎপাদনে ব্যবহৃত ৯৪ ধরণের কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। আগে ১০% থেকে ২৫% পর্যন্ত আমদানি শুল্ক দিতে হতো।

আইটি-আইটিইএস খাতে রপ্তানীর ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা প্রদান।

গুগল মার্চেন্ট একাউন্ট চালু। ফলে অ্যাপ ও গেইম ডেভেলপাররা দারুণভাবে উপকৃত হবে।

৯০০টি নতুন শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন কার্যক্রম প্রায় শেষ। এ নিয়ে সর্বমোট ২৯০১টি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হবে।

আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস ৯৯৯ উদ্বোধন হয়েছে। পরীক্ষামূলক সময়ে ৩৬ লক্ষ কল রিসিভ করা হয়েছে।

লার্নিং এন্ড আর্নিং এর আওতায় প্রায় ৩৯ হাজার জনের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন। প্রশিক্ষণার্থীগণ এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লক্ষ মার্কিন ডলার আয় করেছে।

প্রথমবারের মত ন্যাশনাল আইসিটি ডে উদযাপন। গত ২৭ নভেম্বর মন্ত্রিসভা এই দিবস পালন অনুমোদন করে।

ইনফো সরকার-৩ এর কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে।আগামী জুনের মধ্যে ২৬০০ ইউনিয়নকে অপটিক্যাল ফ্ডাবিার ক্যাবলের আওতায় আনা হবে।

এপিকটা অ্যাওয়ার্ড আয়োজন ও এপিআইএস এর স্টিয়ারিং কমিটির সভা হোস্ট করে আইসিটি ডিভিশন।

১ জানুয়ারি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীনদের জন্য প্রতিবছরই জব ফেয়ার আয়োজন করা হয়ে থাকে। গত বছর চাকরি পেয়েছিলেন ২০০ জন। এছাড়াও হাইটেক পার্কের উদ্যোগে যশোরে এবং এলআইসিটি’র উদ্যোগে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও ঢাকায় জব ফেয়ার আয়োজন করা হয়।

পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে
বেশকিছু প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়েছে- ১২ আইটি, ৭ আইটি, ডিজিটাল মিডিয়ায় বাংলা সমৃদ্ধকরণ, রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধু সিলিকন সিটি স্থাপন, শী পাওয়ার, আইডিয়া ইত্যাদি।

যাত্রা শুরু করবে দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক মানের তথ্যভাণ্ডার

বিজ্ঞাপন

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি প্রাঙ্গণে গড়ে তোলা হচ্ছে দেশের প্রথম টিয়ার ফোর মানের ডেটা সেন্টার। ডাউন টাইম শূন্যের কোঠায় রেখে দেশে একটি সমন্বিত, উন্নত ও বিশ্বমানের ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান সহজতর করা, সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডেটা-নথি সংরক্ষণ ও সুরক্ষিত রাখা এবং সরকারি সেবা সহজলভ্য ও দ্রুততর করতে এই ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে সরকারের সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সকল সরকারি কার্যালয়ের আইসিটি কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত থাকবে।


ডেটা সেন্টারের জন্য আন্তর্জাতিক মানের দ্বিতল ভবন তৈরীর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সার্ভার, স্টোরেজ, নেটওয়ার্ক, পাওয়ার সিস্টেম, কুলিং সিস্টেম, ফায়ার সিস্টেম ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি স্থাপনও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৬৫% এবং বাস্তব অগ্রগতি ৮০% অর্জিত হয়েছে। ফোর টিয়ার মানের ডেটা সেন্টারের সার্টিফিকেট প্রদানকারী যুক্তরাষ্ট্রের Uptime Institute বিগত ১৫ জুন এই ডেটা সেন্টারের ডিজাইন অনুমোদন করেছে।

বিশালাকার এই ডেটা সেন্টারে থাকছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ৬০৪টি র্যা ক, ৯ এমভিএ লোডের রিডান্ডেন্ট লাইনসহ সমৃদ্ধ ২৪ ঘণ্টার নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যু সংযোগের ব্যবস্থা, উচ্চ গতিসম্পন্ন ৪০ জিবিপিএস রিডান্ডেন্ট ডেটা কানেকটিভিটি-ইন্টারনেট সংযোগ।

২০১৫-১৮ মেয়াদে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আগামী ২০১৮ সালের মার্চের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ডেটা সেন্টারে সরকারি ডেটার পাশাপাশি সীমিত আকারে বেসরকারি ডেটাও হোস্ট করার সুযোগ থাকছে। আর ডেটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে Uptime Institute । টিয়ার ফোর মানের সার্টিফিকেশন দেয়ার আগে Uptime Institute সকল ধরণের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে থাকে।

২০১৮’র চ্যালেঞ্জ সাইবার নিরাপত্তা:
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি অভিশাপ সাইবার হামলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পর বাংলাদেশের কাছেও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ব্যাংকগুলোর জন্য ২০১৬ সালের ঘটনা একটি বড় ধাক্কা ছিলো। সেই বড় ধাক্কা বুঝে উঠতে উঠতেই চলে যাচ্ছে ২০১৭ সাল। তাই বাংলাদেশের জন্য ২০১৮ সালকে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জের বছর হিসেবে দেখছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তামজিদ রহমান।

তামজিদ রহমান

ইজেনারেশনের এই সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: রবোটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, মেশিন লার্নিং, আইওটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ডাটা সায়েন্স, নিউরো ল্যাঙ্গুয়েজ টেকনোলজির মত অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে বাংলাদেশেও কাজ হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বের অধিকাংশ বড় আকারের তথ্য চুরির ঘটনা দেখলে দেখা যায় সেসব তথ্য হ্যাক হয়েছে ডাটা সেন্টার থেকেই।

এছাড়াও ডাটা সেন্টারের সকল হার্ডওয়্যার, টুলস এবং নেটওয়ার্ক সিস্টেম সিকিউর রাখাটাও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আবার রবোটিক্স এর ক্ষেত্রে বলতে গেলে বাংলাদেশে এ প্রযুক্তিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে রাসবেরি পাই যার প্রতিটি ভার্শনই ভালনারেবল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এতদিন আমাদের শুধু কম্পিউটার এবং মোবাইলের সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখতে হত কিন্তু আইওটি ডিভাইসগুলো আসার পর থেকে গাড়ি, টিভি, প্রিন্টার এমনকি ওয়াশিং মেশিনের সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি সমানভাবে গুরুত্ব পায়। এই ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পর পর ডিভাইসগুলোর ফার্মওয়্যার আপডেট দেওয়া ব্যবহারকারীদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। আইওটি সার্ভিসগুলোর ব্যবহারকারীদের সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন করে তোলাটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

আপাতত ব্যাংকিংখাতের নিরাপত্তায় বাংলাদেশে সাইবার সিকিউরিটি খাতে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি অনুযায়ী সকল ব্যাংককে ভালনারেবিলিটি এসেস্মেন্ট, পেনেট্রেশন টেস্টিং, আইটি অডিট, পিসিআই-ডিএসএস কমপ্ল্যান্স অবশ্যই করতে হবে।

ব্যাংক নিরাপত্তার এই বিষয়গুলো আরেকটু স্পষ্ট করতে তামজিদ বলেন: প্রতিটি ব্যাংককে তাদের নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে ইন্টারনাল অ্যাপলিকেশন, ডিভাইস, বুথ, ইন্টারনাল হার্ডওয়্যার অর্থাৎ ফুল সিস্টেমটির নিরাপত্তা দুর্বলতাগুলো শনাক্ত করিয়ে সেগুলোর সমাধান করাতে হবে এবং তাদের ব্যাংকিং সিস্টেম হ্যাকেবল কিনা সেটিও পরীক্ষা করাতে হবে। পাশাপাশি তাদের সফটওয়্যার, রাউটার, সার্ভার, এন্টিভাইরাস এগুলো আপডেটেড কিনা এবং কোনটি পরিবর্তনের দরকার আছে কিনা সেগুলোও চেকআপ করাতে হবে।

আর পিসিআই-ডিএসএস হল যেসব ব্যাংকের কার্ড আছে তাদেরকে আন্তর্জাতিক একটি কার্ডিং সিকিউরিটি পলিসি মেইন্টেইন করতে হয়। সেই পলিসির প্রতিটি পয়েন্ট ব্যাংকে মানা হচ্ছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা এবং যারা পলিসি ভঙ্গ করছে তাদের সাবধান করে দেয়া।

সব মিলিয়ে ২০১৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ স্লোগান বাস্তবায়নে পরিকল্পনাগুলোকে যতোটা সম্ভব বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনাকে মনে রেখে সাইবার ঝুঁকির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার বছর হবে ২০১৮।

Bellow Post-Green View