চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেশের অধিকাংশ সিনেমা হলই আর খুলবে না!

করোনাভাইরাসের কারণে ১৮ মার্চ থেকে সারা দেশজুড়ে চালু থাকা নিয়মিত এমন প্রায় ৮০টির মতো সিনেমাহল বন্ধ হয়ে আছে। আড়াই মাস অতিক্রম করলেও করোনা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি বরং দিনে দিনে অবনতি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কেউ বলতে পারছেন না, সিনেমা হলের ভবিষ্যত কী?

করোনার কারণে সব সেক্টরই মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে। তবে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে আছে দেশের চলচ্চিত্র ও সিনেমা হল। চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েকমাস পরও সবকিছু যদি স্বাভাবিক হয় তারপরেও চলচ্চিত্রাঙ্গন স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে কয়েকবছর!

আশঙ্কা প্রকাশ করে তারা বলছেন, যদি সিনেমাহল বাঁচাতে সরকার প্রণোদনা না দেন তাহলে দেশের অধিকাংশ সিনেমাহলই হয়তো ভবিষ্যতে আর খুলবে না!

সিনেমা হলে নাজুক পরিবেশ, মান সম্মত কন্টেন্টের অভাব, সময় উপযোগী সিনেমা নির্মাণে অক্ষমতা, স্যাটেলাইট ও অনলাইন প্লাটফর্মের আধিক্য- এরকম আরো অসংখ্য কারণে হলবিমুখ দর্শক। করোনার আগে স্বাভাবিক অবস্থাতেও চলচ্চিত্রে খুব একটা জৌলুস ছিলো না। বরং মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে এসেছে করোনাভাইরাস।

প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা মিঁয়া আলাউদ্দিন বলেন, সিনেমা ব্যবসা হতো শুধু ঈদের সময়। পাশাপাশি শাকিব খানের সিনেমা এলে সবাই একটু স্বস্তি পেত। কিছু কিছু বন্ধ সিনেমাহলও খুলতো। ১৮ মার্চ থেকে করোনার কারণে সিনেমাহল ও সিনেমা অঙ্গনে যে ক্ষতি চলমান তা পুষিয়ে নেয়া অত্যন্ত কঠিন হবে। আগেও সরকারের কাছে আমরা প্রণোদনা চেয়ে আশ্বাস ছাড়া কিছু পাইনি। সিনেমাহল টিকিয়ে রাখতে যদি সরকার প্রণোদনা না দেন তাহলে বন্ধ থাকা অধিকাংশ সিনেমাহল পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও আর খুলবে না।

সিনেমায় করোনার ক্ষতি সীমাহীন বলে মনে করেন অভিনেতা মিশা সওদাগর। তার মতে, সরকার নজর না দিলে এফডিসি মিউজিয়ামে পরিণত হতে পারে! আগামী প্রজন্মের কাছে ‘এফডিসিতে একসময় শুটিং করতেন’-এই গল্প শোনাতে হবে।

শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা বলেন, সরকারকে ১০০ সিনেমা হল রেনোভেশন করতে হবে। এই ১০০ হল থেকে আগামী ৩ বছর কোনো কর নেয়া যাবেনা। এখানে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। এছাড়া নতুন নতুন মার্কেট হলে সেখানে মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ করতে হবে। সিঙ্গেল স্ক্রিনকেও সম্মান দিতে হবে। কারণ মাল্টিপ্লেক্সে ৩০০ টাকা দিয়ে আমজনতা সিনেমা দেখবে না। তাদের জন্য টিকেট মূল্য ১০০ টাকার মধ্যে রাখতে হবে। এসব পদক্ষেপ না নিলে করোনার পর সিনেমা ও সিনেমা হল শেষ হয়ে যাবে।

চলচ্চিত্রের বুকিং এজেন্টেদের নিয়ন্ত্রণে থাকে একাধিক সিনেমা হল। সারোয়ার ভুঁইয়া দিপু হলেন বুকিং এজেন্ট সমিতির সভাপতি। তার নিয়ন্ত্রণে চাঁদপুর সদর, মতলব, ফেণী ও জয়দেবপুরে চারটি সিনেমা হল রয়েছে।

তিনি বলেন, আগামীতে করোনা পরিস্থিতি ঠিক হলেও এই চারটি হলের কোনোটিই আর চালু হবেনা। এর পাশপাশি টিকাটুলির বিখ্যাত ‘অভিসার সিনেমা’ হলও আর খুলবে না। মধুমিতা, বলাকা ছাড়া ঢাকার বাইরের অধিকাংশ সিনেমা হল খোলার সম্ভাবনা নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের জনপ্রিয় এক চিত্রনায়ক বলেন, করোনায় সিনেমার যে ক্ষতি হল তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অধিকাংশই এখন না বুঝলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে টের পাবে সিনেমায় কতটা ধ্বংস হয়েছে। তার মতে, সিনেমায় যারা মাঝেমধ্যে লগ্নি করতো তারা অন্য পেশার মানুষ। তারাও করোনার কারণে তাদের ব্যবসায় লোকসান গুনছে। এছাড়া কাজ না পেয়ে সিনেমা সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগ মানুষই পেশা পরিবর্তন করবে।

অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক কবে হবে কোনো ঠিক নেই। যখন হবে যদি কাজ হয় তাহলে দু চারজন ছাড়া কারও হাতে কাজ থাকবে না। কারণ সিনেমায় লগ্নি হবে খুব সীমিত। তাও অল্প বাজেটে সিনেমা হবে। ধুকে ধুকে একটু আধটু চললেও করোনা এসে সিনেমা অঙ্গন একেবারে শেষ করে দিল।

তিনি বলেন, সরকার যদি চায় তাহলে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে আবার নতুন করে সিনেমা শুরু হতে পারবে। এছাড়া নিয়মিত সিনেমায় লগ্নি করছে এমন প্রোডাকশন হাউজকে সরকারিভাবে বছরে কয়েকটা সিনেমায় প্রণোদনা দিতে হবে। নইলে আর সম্ভব না।

আনন্দ ছন্দ সিনেমা হলের ম্যানেজার শামসুদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, সারাবছর টিকেট থেকে সরকারকে রাজস্ব দিয়েছে সিনেমা হল। এখন সিনেমার দুর্দিনে আমরা সরকারি প্রণোদনা চাই। নইলে এই শিল্প ধ্বংস হবে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় কর্মচারিদের বেতন, বিদ্যুৎ, পানিসহ আনুষাঙ্গিক অনেক বকেয়া। সরকার প্রণোদনা না দিলে মালিকদের এই ক্ষতি কাটানো অসম্ভব। বাধ্য হয়ে অনেকে হল বন্ধ থাকবে।

শেয়ার করুন: