চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘দেখে নিও, এটাই আমার শেষ অনুষ্ঠান’

মনে প্রাণে নিজেকে প্লেব্যাক শিল্পীই মনে করতেন সদ্য প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর। তাঁর মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণে তাঁর সহশিল্পীরাও এমনটাই বলছেন। চলচ্চিত্রের গানেই স্বস্তি ছিলো তাঁর। এমনকি মঞ্চে ডাকলেও খুব একটা যেতেন না! আর টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে?

এটা তাঁর দর্শক ভক্ত অনুরাগীরাই ভালো জানেন। শিল্পী জীবনে টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে তাঁকে খুব একটা দেখা যায়নি। রেকর্ডেড কিংবা হাল সময়ের লাইভ অনুষ্ঠানেও তাঁকে পাওয়া ছিলো বিরল ঘটনা! অথচ অসুস্থ হয়ে গেল বছর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যাওয়ার মাস দুয়েক আগে তিনি শেষ বারের মতো অংশ নিয়েছিলেন চ্যানেল আইয়ের একটি ঈদ অনুষ্ঠানে।

বিজ্ঞাপন

চ্যানেল আইয়ের স্টুডিওতে

বিজ্ঞাপন

তাঁকে সম্মান জানিয়ে নির্মিত বিশেষ সেই অনুষ্ঠানের নাম ছিলো ‘কত রঙ্গ জানো রে মানুষ’। যেখানে শুধু গান করেননি তিনি, কথা বলেছেন ক্যারিয়ারের বিভিন্ন বাঁক বদলের। অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনায় ছিলেন নন্দিত অভিনেত্রী আফসানা মিমি, আর প্রযোজক ছিলেন অনন্যা রুমা।

এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ আট বছর পর কোনো টেলেভিশনে স্বশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন এই কণ্ঠশিল্পী। চ্যানেল আই অনলাইনকে এমনটাই জানান অনন্যা রুমা।

কী করে তবে টেলিভিশনে তাঁকে উপস্থিত হতে রাজি করিয়েছিলেন?

অনুষ্ঠানটির প্রযোজক জানান, ‘আমরা প্রায় তিন মাস তাঁকে বুঝিয়ে এই অনুষ্ঠানটিতে নিয়ে এসেছিলাম। মূলত মৃত্যুর ক’দিন আগে হাসপাতালের কেবিনে কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোরকে অপ্রকাশিত কিছু গানের দায়িত্ব দিয়ে যান সৈয়দ শামসুল হক। আর গানগুলোয় সুর করার কথা বলে যান আলম খানকে। দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে আলম খান ও এন্ড্রু কিশোর তার অপ্রকাশিত গানগুলো শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেন। এই গানগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘ফুলের গন্ধের মতো থেকে যাব তোমার রুমালে…রূপের গন্ধের মতো তোমাদের শান্ত সন্ধ্যাকালে…থেকে যাব তোমার রুমালে’। যে গানটি ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর একটি ছবিতে ব্যবহারে কথা। কিন্তু তখনও যেহেতু কোনো ছবিতে গানটি ব্যবহার হয়নি এবং গানটির রেকর্ডও শেষ, তাই উনাকে টেলিভিশন প্রোগ্রামে অপ্রকাশিত গানসহ একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে তাঁকে আনতে রাজি করাতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন সাগর ভাই (ফরিদুর রেজা সাগর), আজম বাবুসহ অনেকে। সবাই মিলে যখন উনাকে অনুষ্ঠানে গাইতে রাজি করালাম, তখন উনি জানালেন ‘অনুষ্ঠানে কোনো কথা বলবেন না, শুধু গান করবেন’। বললেন, ‘আমি গানের মানুষ, শুধু গানই করবো।’ আবার তাকে কনভিন্স করতে শুরু করলাম। বললাম যে, এটাতো ঈদের প্রোগ্রাম, মানুষ গানের পাশাপাশি আপনার কথাও শুনতে চাইবে! কথা না বললে কীভাবে হয়! তো এরকম ধাপে ধাপে উনাকে রাজি করিয়ে অনুষ্ঠানটি করি। বলছিলেন অনন্যা রুমা।

চ্যানেল আইয়ের স্টুডিওতে

‘জীবনের গল্প’ বলে যাওয়া গণমানুষের এই শিল্পীর শেষ অনুষ্ঠানটির প্রযোজক আরো বলেন, ২০১৯ সালের রোজার মধ্যে অনুষ্ঠানটি রেকর্ড করি। কারণ অনুষ্ঠানটি রোজার ঈদের দিন বিকেলের জন্য আমরা নির্মাণ করছিলাম। আমরা যখন এডিট করতে বসি, দেখি ৫৫ থেকে ৬০ মিনিটের অনুষ্ঠান। প্রোগ্রাম থেকে আমাদেরকে বলা হলেয়েছে, ঈদের দিন বিকেলের প্রোগ্রাম মাত্র ২৫ মিনিট! তিনটা গান রাখতে, আর আনকাট প্রোগ্রামটা যেন ঈদের চতুর্থ দিন যায়। ওইভাবেই আমরা অনুষ্ঠান প্রস্তুত করলাম। এন্ড্রু দাকেও বুঝিয়ে বললাম বিষয়টা।

সেই অনুষ্ঠান দেখে পরে আমাকে ফোন করলেন এন্ড্রু দা। কথার ফাঁকে একবার বলে উঠলেন, ‘এটাই আমার জীবনের শেষ অনুষ্ঠান হবে।’ আমি বললাম, ‘এমন কেন বলছেন দাদা!’ তিনি আবার উত্তর দিলেন, ‘আমিতো এমনিতেই টেলিভিশনে গান করি না, আর ফিল্মে তো এখন গানই হয় না। দেখে নিও, এটাই আমার শেষ অনুষ্ঠান।’

সত্যি সত্যি চ্যানেল আইয়ে গেল বছর রোজার ঈদে প্রচারিত এন্ড্রু কিশোরের গান-কথার একক অনুষ্ঠানটি তাঁর শেষ অনুষ্ঠান হয়ে গেলো! কারণ ওই অনুষ্ঠান করার কিছুদিন পর থেকেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপর সেপ্টেম্বরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর চলে যান। অনন্যা রুমা বলেন, দাদার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর থেকেই একটা কথাই মাথায় ঘুরছে- ‘দেখে নিও, এটাই আমার শেষ অনুষ্ঠান!’