চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেখা থেকে লেখা: কোরবান করতে গিয়ে নিজেই কোরবান

‘হোম সুইট হোম দেয়ার ইজ নো প্লেস লাইক হোম। ’ইংরেজ কবির এ বাক্যে হোম বলতে যে ঘরে আমরা থাকি তার কথা বলা হয়েছে। গ্রামের বাড়ির নয়। কিন্তু বাংলাদেশে ঈদের সময় স্টেশনগুলোতে বাড়িগামী মানুষের ক্রেজ দেখলে এই কবি হয়তো বলতেন হোম সুইট হোম দেয়ার ইজ নো প্লেস লাইক মাই ভিলেজ হোম।

গত দুদিন রিপোর্টিংয়ের দায়িত্ব ছিলো ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে। প্রতি বছর উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের ট্রেনগুলোর গড়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। প্রতি বছর নতুন নতুন মন্ত্রী এসে নতুন নতুন ব্যাখ্যা দেন। এবার মন্ত্রী সুজন নতুন সুবচন দিলেন। যমুনা সেতুতে রেলের ধীর গতি এবং নতুন দিনটি ট্রেন চালু হওয়ায় সিডিউলে এ সমস্যা। জানিয়ে রাখি, বর্তমান রেলমন্ত্রী পঞ্চগড়ের। বাংলাদেশের রেলমন্ত্রী হলেও মন্ত্রী হওয়ার পর তার সবচেয়ে বড় অর্জন নিজের এলাকার জন্য একজোড়া রেল চালু। তার ফল হলো পুরো উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের যাত্রীদের ঈদের সময়ে রেল যাত্রায় আরও একটু বেশি ভোগান্তি, আরেকটু বিলম্ব।

বিজ্ঞাপন

ঈদের সময় রেল সাংবাদিকতা: রিপোর্টিংয়ের চেয়ে উত্তেজনা বেশি
সাংবাদিকদের প্রায় সময় কারেন্ট উত্তেজনার মধ্যে থাকতে হয়। তাই রিপোর্টারদের উত্তেজনার মধ্যে থেকে নিজেকে নির্দিষ্ট পরিমান নির্লিপ্ত থাকতে হয় যাতে নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখা যায়। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের প্রায়ই রিপোর্টিং করতে এসে নিজেও একটি শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করার বিপ্লবী ভূমিকা জাগে। তখন রিপোর্টিং, তার প্রশ্ন করার ঢং, তথ্য সংগ্রহ সবকিছুতে সাংবাদিকতার চেয়ে একটি পক্ষীয় ভূমিকা চোখে পড়ে। একজন সাংবাদিককে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি যে বলেন সমস্যার সমাধান হয় না কেনো। কিন্তু বলেন তো আপনি, একটি টিকিটের জন্য কতজন প্রতিযোগী। এখানে টিকিট কালোবাজারী সেই তুলনায় অনেক কম নয় কি?
পাশে আরেকজন বললেন, আসলে ভিআইপিদের জন্য অনেক টিকিট লক করে রাখা হয়। সে কারণে মাত্র দু’ঘন্টার মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য টিকিট শেষ হয়ে যায়।

আচ্ছা জেসি, তুমি যেনো কবে যাবে। আজকে। আচ্ছা তুমি কিভাবে টিকিট পেয়েছো? কাষ্ট হাসি দিয়ে বললো, অই যে ভিআইপি কোটায়? এই দু’দিন লক্ষ্য করলাম, বেশিরভাগ সাংবাদিক জানলেনই না ৫৫ জোড়া ট্রেনের মধ্যে মাত্র উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের ৭ জোড়া ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় হয়েছে। বেশিরভাগ সাংবাদিক যদি তথ্য নেয়া ও সেটি বিশ্লেষণের চিন্তা বাদ দিয়ে ফেসবুকে ক্রলিং করতে থাকেন তবে এমন হওয়াটা অসম্ভব নয়।

মন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন, উত্তর দেয়ার রাজনৈতিক কৌশল: মন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন ছিলো গত তিন বছরে ৩ জন মন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছেন। তিনটি ঈদে তিনজন মন্ত্রী রেল স্টেশন পরিদর্শনে এসেছেন। এবার আপনি এলেন কিন্তু যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবনের মতো আপনার সময়ে কোন পরিবর্তন হলো না কেনো?তখন তিনি রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিলেন। আগস্ট একটি শোকের মাস, আমরা সবাই শোকগ্রস্ত। ব্লা ব্লা ব্লা। ‘আমি মন্ত্রীর ভাইপো’
জামালপুরগামী তিস্তা এক্সপ্রেসের ঙ বগি। একলোক দেখি জানালা দিয়ে ভেতরে একজনের সাথে বাতচিত করছেন। কারণ জানতে চাইলে টিকিট দেখিয়ে বললেন, ভাই আমার টিকিট আছে তবু এই লোক আমার সিটে বসে পড়েছেন এবং হুমকি দিয়ে বলছেন তিনি মন্ত্রীর ভাইপো। খুবই লক্ষ্যনীয় ভেতর থেকে তারা বারবার জানালার সার্সি নামিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। অভিযুক্তকে টিকিট দেখাতে বললে তিনি বললেন অন্য বগিতে তার টিকিটি অন্য লোকের কাছে আছে। মন্ত্রীর পরিচয় দেয়ার কথা বেমাুলম অস্বীকার করলেন। জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব এই লাইনের ট্রেনে কার সিটে কে বসে আল্লাহ মালুম।

আনন্দ যাত্রায় দেরীর বিরক্তিতে ছোট্ট মল্লিকা
মল্লিকা ক্লাস থ্রিতে পড়ে। মা বাবার সাথে রাজশাহীতে ঈদ করতে যাচ্ছে। আমার কাছে এসে খুব কনফিডেন্টের সাথে বলছে সে কিছু বলবে টেলিভিশনে। দ্বিতীয়বার যখন আসলো আমার তার হাসি মুখ ও কনফিডেন্টে ভালো লাগলো।

মল্লিকার সাথে আমার আলাপ
আমি: কেমন লাগছে এই যে অনেকক্ষণ বসে আছো?
মল্লিকা: অনেকক্ষণ বসে আছি তো খারাপ লাগছে।
আমি: কখন আসছো স্টেশনে?
মল্লিকা: রাত ৪ টায় এসেছি। আর খুব গরম লাগছে।
আমি: ঘুম পাচ্ছেনা এত সকালে এসেছো?
মল্লিকা: স্কুলে যেতে হয়তো । তাই প্রতিদিন অনেক সকালে উঠতে হয়। তাই ঘুম পাচ্ছে না।
ইন্টারভিউ শেষ। এবার অনানুষ্ঠানিক আলাপ। আমি কাজ করার ফাকে আমার হাতে থাকা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের করা রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন তাকে রাখতে দিলাম। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, রবীন্দ্রনাথকে চেনো? সে বললো চেনে, তিনি একজন কবি।

বিজ্ঞাপন

মল্লিকা ডাক্তার হয়ে শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে চায় আর জীবন চালাতে স্টুডেন্ট পড়াতে চায়। যখন সে আমাকে প্রথম অ্যাপ্রোচ করে তখন সে আইসক্রিম খাচ্ছিল। আমি দুষ্টুমি করে বললাম, আইসক্রিম দিলে ইন্টারভিউ করবো। রিপোর্টিং শেষ হওয়ার পর চলে আসবো দেখি হুট করে মল্লিকা আমার জন্য একটা আইসক্রিম নিয়ে এলো। এমন ভালোবাসা আমি ফেরাতে চাইনি।

কমলাপুর স্টেশনে দ্বিতীয় দিন প্রথম শ্রেণীর ওয়েটিং রুম। এখানে সাধারণত একটু অবস্থাপন্ন মানুষরা অপেক্ষা করেন। ট্রেনের জন্য বিরস বদনে নিরস হৃদয়ে শূন্য দৃষ্টিতে অবস্থান করা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অকর্মণ্য সময় নষ্ট করা ছাড়া নিরুপায় এরা সবাই। সাথে মাঝে মাঝে পাশের যাত্রীর সাথে সরকারের চন্ডিপেটা করা ছাড়া এদের আর কেন কাজ নেই। এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার। বলেই চললেন, আমরাতো পড়াশুনা করি, রেলের লোকজন বলে আর আপনারা ছাপান। তারা সব মিথ্যুক।

আচ্ছা আঙ্কেল আপনি তো অনেকদিন থেকে ট্রেনে চড়েন। এমন বিলম্ব আগে কি হতো?

তিনি বললেন, আরে না আগে তো লোকে ট্রেনেই চড়তো না। এখন তো এমন চড়ছে টিকিটও পাওয়া যাচ্ছে না।

তখন আমি বললাম, এক্সাক্টলি। যমুনা সেতুর পূর্ব পাশে একটি দুর্ঘটনার কারণে আজকে সিডিউল বিপর্যয়। উনি খুব একটা খুশি হলেন না। কিন্তু যখন সিডিউলে অদ্ভুতভাবে মন্ত্রীর এলাকার ট্রেনের মাত্র ১ ঘণ্টার বিলম্বের কথা টেলিভিশন লাইভে বললাম। সবাই যেনো তথ্যের চেয়ে মন্ত্রীর নাম জড়ানোয় বিকৃত আনন্দ পেলেন। ট্রেন-বাড়ি ফেরাব্রিটিশ যুগের ট্রেন, প্রভূ-ভৃত্যের ভূত
কমলাপুর স্টেশনে সাংবাদিকদের ইন্টারভিউ দেন স্টেশন ম্যানেজার। স্টেশন ম্যানেজার কথা বলবেন। হঠাৎ করে বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা স্টেশন ম্যানেজারকে ভরা সাংবাদিক কক্ষে উচ্চস্বরে জ্ঞান দেয়ার চেষ্টা চালালেন, ‘অই মিয়া কি সব বলো, আবোল তাবোল বলো। ঠিকমতো বলো। উল্টা-পাল্টা বলে আমাদের বিপদে ফেলো।’

উপস্থিত সবাই বুঝলাম। এই কর্মকর্তা যত না উপদেশ দিলেন তার চেয়ে বেশি উপদেশের ঢেঁকি।

পাদটীকা: আমাদের ডিজিটাল মাধ্যমে কর্মরত আসাদ। তার জব নেচারের কারণে প্রচুর ফেসবুকিং করতে হয় তাকে। সমসাময়িক ঘটনায় সবসময় উত্তেজিত থাকেন। কমলাপুর স্টেশন থেকে ফিরে ছাদে চা পানে গেলাম। তিনি বলছেন, তার কাছে তার এক বন্ধু ১শ শব্দের ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েছে গতরাতে। শুক্রবার দিবাগত রাতে উঠেও এখনো টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পার হতে পারেনি সে। পুরো বার্তার ৮০ শতাংশ সরকার, উন্নয়ন ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের চন্ডিপাঠ। আসাদ বললেন, মানুষ কুরবান করতে গিয়ে নিজেই যেনো এক একজন কুরবান হয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, তথাস্তু।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View