চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন

নবনযিুক্ত প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেছেন, দুর্নীতি দূর করে বিচার বিভাগকে আরও গতিশীল করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন বিচার বিভাগে দুর্নীতি আছে এবং বিচারিক কাজকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে দুর্নীতিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে মোকাবেলা করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি ব্যতিক্রম এবং ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার, এখন দেখার বিষয় দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা গ্রহণ করে একটি গতিশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার বিভাগকে দাঁড় করাতে পারেন। তবে সকলেই আশাবাদী, কেননা সমস্যাকে দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালেই চিহ্নিত করে দুর্নীতিবাজদের সর্তক করে দিয়েছেন।

গবেষকদের মূল কাজ হচ্ছে সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা, সমস্যা যদি সহজইে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় তাহলে পরবর্তী ধাপে তথ্য সংগ্রহ, নমুনায়ন, বিশ্লেষণ, ফলাফল লেখা ও কৌশল অবলম্বন করে শেষ করা সম্ভব হয়। কাজেই বলা যায়, বিচার বিভাগের সমস্যা যেহেতু জনসন্মুখে প্রকাশ করেছেন তাহলে এটি দূর করার কালাকানুনও তিনি প্রয়োগ করতে পারবেন বলেই সাধারণ জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। এখন দেখা যাক, বাস্তবিক ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর ভূমিকা তিনি রাখতে পারেন।

আলোচ্য প্রসঙ্গটি টেনে আনার কারণ হচ্ছে দায়িত্বশীলরা কখনোই তাদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করতে চান না, যে কোন মূল্যে তাদের অধ:স্তনের দুর্নীতির বিষয়েও অস্বীকার করার নজির সর্বত্র। আবার এটাও শোনা যায়, অধঃস্তনের দুর্নীতির ভাগের একটি অংশ দায়িত্বশীলরা পেয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতির প্র্যাকটিস থাকাতে প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই জনগণের আস্থার জায়গায় আসতে পারছে না। জনগণ হয়তো মুখ ফুটে কিছু বলছে না, তারা প্রস্তুতি নিয়ে (অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে কাজ হবে এমন একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে)।

দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে কর্ম সম্পাদন করছে একরকম বাধ্য হয়েই। প্রত্যেকেই একটা সুসময়ের জন্যই অপেক্ষা করছে, একটা বিস্ফোরন ঘটবে এ প্রত্যাশায়। কিন্তু তার জন্য একটা প্রতিবাদী কণ্ঠ দরকার, প্রত্যেক সমাজ থেকে একটা প্রতিবাদী গ্রুপ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত। বহু সমাজে দেখা গেছে সামান্য দু তিন জন মানুষের প্রচেষ্টায় সমাজের অনেক অন্যায় অপকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। প্রশাসনের অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি রয়েছেন যারা দুর্নীতির সঙ্গে আপোস করেন না, তারাও এ ধরনের কাজে হস্তক্ষেপ করে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে চান না, তার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যায় কর্মটি আর সম্পাদিত হতে পারে না। আবার এমনও দেখা যায়, প্রশাসনের অনেকের সাথে লিঁয়াজো করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা নিয়োগ প্রদান করে বিশাল অংকের টাকা আত্নসাৎ করছে। তবে এ কাজটি তারা অত্যন্ত গোপনে করছে, কর্ম সম্পাদনের প্রাক্কালে তারা কোন ধরনের প্রমাণ রাখছে না। ফলে অপরাধটি প্রমাণের ক্ষেত্রে বাধা বিপত্তির সন্মুখীন হতে হয় এবং তারা পারও পেয়ে যাচ্ছে।

যদিও এর ফলে প্রতিবাদিদের সামান্য সময়ের জন্য হামলা, হুমকির স্বীকার হতে হয়েছে কিন্তু ফলশ্রুতিতে সত্যের জয় হয়েছে। এ রকম সাহসী নাগরিকদের গ্রুপ তৈরি হওয়া উচিত প্রত্যেক সমাজে, প্রতিবাদের সামনে কোন অন্যায় অবিচারের ঠাঁই হতে পারে না। আর এ প্রতিবাদটা প্রথমে কাউকে না কাউকে তো শুরু করতেই হবে, না হলে দুর্নীতি সমাজের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়বে। কাজইে ভয় বিপত্তিকে সামলিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সুস্থ সমাজ গঠনের স্বার্থে সকল নাগরিককে কাজ করে যেতে হবে।

বিজ্ঞাপন

দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতার জায়গায় আরো কঠোর হতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের, বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি এমপওিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষককে অভিভাবকদের নিকট জবাবদিহিতার চর্চায় নিয়ে আসা জরুরী। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চালু করা সম্ভব হলে দুর্নীতির মাত্রা বহুলাংশে কমে আসবে।*

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে দুর্নীতি প্রত্যয়টি একটি স্বাভাবিক ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রতিষ্ঠান প্রধান যখন নিজের পদমর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যক্তিক লাভের প্রত্যাশায় অবৈধ উপায়ে নিয়োগ প্রদান করে থাকে তখনই সেটা দুর্নীতির পর্যায়ে উপনীত হয়। আর এ ধরনের দুর্নীতির চিত্র সারা দেশে অহরহই দেখা যায়, কিন্তু কেউই প্রতিবাদ করার সাহস তো দূরের কথা উল্টো অনিয়মকেই নিয়ম হিসেবে মেনে নিয়েছে। অর্থাৎ ঘুষ ছাড়া চাকুরি হবে না এটা মেনে নিয়েই অনেকেই সামনের দিকে এগোয়, বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণির চাকুরির ক্ষেত্রে এ অনিয়মের চিত্রই বেশি চোখে পড়ে। বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঘুষ ছাড়া কিছুই হবে না। দায়িত্বশীলরাও অবিবেচকের মতো বলে বেড়ায় টাকা ছাড়া কিছু হয় না এবং নিয়োগ প্রদানের বিষয়টি একটি জটিল ঘটনা এবং এখানে বিভিন্ন জায়গায় টাকা প্রদান করে নিয়োগ সম্পন্ন করতে হয়। তাই চাকুরি প্রার্থীদের নিকট হতে ঘুষ গ্রহণ তাদের দৃষ্টিতে অনিয়ম নয়।

এ ধরনের হীন চরিত্রের লোক ভদ্রতার মুখোশ পরে সমাজকে কলুষিত করছে, কলুষিত করছে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বাংলাদেশে বহু প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের নেপথ্যে কারিগর হিসেবে এ ধরনের হিংস্র ও জঘন্য শ্রেণির মানুষদের চরিত্র উন্মোচন করা অবশ্য কর্তব্য। এরা নিয়ম মতো প্রতিষ্ঠানে আসেন না, প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়মমতো না আসলে বাকিদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। আবার এ শ্রেণিটি সামাজিকভাবে ঘৃণ্য ক্যাডার শ্রেণি দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের কাজগুলো নিবিড়ভাবে করে থাকে। এ ধরনের ঘৃণ্য শ্রেণির কারণে বহু প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। বহু উদাহরণ রয়েছে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ইত্যাদি সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সভাপতির যোগসাজশে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে দৃশ্যমান ত্রুটি থাকে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত তারা সকলেই ঘুষ লেনদেনের ভাগ পেয়ে থাকে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যারা দায়িত্বশীল অবস্থায় থাকেন তারাও অকপটে স্বীকার করেন সারাদেশে প্রায় একই চিত্র। বিশেষ করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় অখ্যাত পত্রিকায় যাতে আম পাবলকি সার্কুলার না দেখতে পায়; পূর্ব থেকে তাদের বাছাইকৃত প্রার্থীরা শুধু আবদেন করে এবং নিয়োগের বৈধতার জন্য বাছাইকৃত প্রার্থীদের সাথে কয়েকজন পরীক্ষার্থী রাখে নিজেদের মধ্য থেকে। এভাবে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাগজ কলমে বৈধতা দেখানোর চেষ্টা করে থাকে। প্রকৃতঅর্থে বিষয়টি সামরিক জান্তার প্রশাসকের ন্যায়, সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক যেভাবে চাইবেন পুরো প্রক্রিয়াটি সেভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, এভাবে নিয়োগ প্রদানে অযোগ্য প্রার্থীরা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করছে এবং এঁরাই আগামী ২০-২৫ বছর প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করবে। এ ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বকীয়তা হারাচ্ছে, যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী না থাকায় গ্রামের স্কুলগুলো মূলত অকেজো হয়ে পড়ছে। বাধ্য হয়েই গ্রামের মানুষ শহরে পাড়ি জমাচ্ছে সন্তানদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে। ফলে গ্রামীণ সমাজে মানসম্মত শিক্ষার অভাবে মেধার বিকাশ হচ্ছে না, গ্রাম্য পর্যায়ে নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। যার কারণে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে গ্রামে, নৈরাজ্য পরিস্থিতি মেনে নিয়েই গ্রামে থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষদের। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ জরুরী এবং সম্মিলিতভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সময়ও এসেছে না হলে বাংলাদেশের অদম্য অগ্রযাত্রা বাধার মুখে পড়বে এবং ভিন্নদিকে দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে পারলে বাংলাদেশে উন্নয়ন অগ্রযাত্রার হার ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বমুখী হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন