চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দুর্নীতির খেরোখাতা: ভূমি প্রশাসনের ওপর একটি সমীক্ষা

বর্তমান বিশ্বের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুর্নীতি সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করা সমস্যা। দুর্নীতি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক এমনকি ব্যক্তি-মানুষের বেঁচে থাকাকেও বিপন্ন করে তুলছে। কেউই এর নেতিবাচক প্রভাবের বাইরে নয়, এমনকি যে দুর্নীতির দ্বারা লাভবান সেও প্রকারান্তরে এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেহেতু দুর্নীতির কারণে তার পরিপার্শ্বের সামাজিক সংহতি আক্রান্ত হয় এবং সে নিজে ঐ সমাজের বাইরে নয়। রাষ্ট্রীয় শাসন প্রক্রিয়া বা সরকার ব্যবস্থা যখন আলোচ্য প্রসঙ্গ, তখন রাজনৈতিক দুর্নীতি বা দুর্বৃত্তায়ন সবচেয়ে বড় ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র পরিচালনার গুণগত মান, যেমন- সুশাসন রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা ও স্বচ্ছতার সমানুপাতিক। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং তার অনুশীলন, জনসাধারণের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়ানুগ ক্ষমতার প্রয়োগ, প্রচলিত ও প্রবর্তিত আইনকানুন এবং সেগুলোর প্রয়োগ ও প্রতিপালন, এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রযন্ত্রের চালিকাশক্তি সরকারের কার্যক্রম বাস্তবায়নকারী মূল সংস্থা তথা জনপ্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর নির্ভর করে।

“দুর্নীতি সুশাসনে প্রধান বাধা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশের ভূমি প্রশাসন” শীর্ষক এক পিএইচডি গবেষণা প্রবন্ধে (এই লেখকের) ভূমি-প্রশাসনে দুর্নীতির ব্যাপ্তি এবং তার কারণ, এবং কীভাবে তা বাংলাদেশের সুশাসনকে বাধাগ্রস্ত করছে সেটা স্পষ্ট করেছে। ভূমি-প্রশাসনের, বিশেষকরে মিউটেশনের (নাম খারিজের) মাধ্যমে জমির রেকর্ড হালনাগাদ এর বিষয়টিকে ভিত্তি করে এই গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। ভূমি-প্রশাসনের রেকর্ড আপডেট, রেকর্ড সংরক্ষণ, ভূমি জরিপ, ভূমি উন্নয়ন কর আদায় ও ব্যবস্থাপনা, খাসজমি ব্যবস্থাপনা, অর্পিত সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও ভূমি রেজিস্ট্রেশনের ন্যায় ৭টি উপক্ষেত্রের মধ্যে সুশীল সমাজ এই মিউটেশনকে দুর্নীতির শীর্ষ খাত বলে মত প্রকাশ করেছেন, যেখানে ভূমি হস্তান্তর ২য় স্থানে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় দেখা গেছে, মিউটেশনের কাজে একজন মানুষকে ২-৩ বারের বদলে গড়ে ৪৮ বার সরকারি দপ্তরে যাতায়াত করতে হয়ে থাকে। ৫০ টাকা রাজস্বের বদলে গড়ে ১,৮১০ টাকা ঘুষ হিসাবে প্রদান করতে হয়ে থাকে। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ঘুষের ৮৮% টাকা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের পকেটে চলে যাচ্ছে। বাকি টাকা গ্রাম্য টাউট-বাটপার ও সহযোগিতা প্রদানে পারদর্শী প্রতিবেশী যারা ভূমি অফিসের আশপাশে ঘোরাফেরা করে তাদের জীবিকায়নে যুক্ত হচ্ছে। সম্প্রতি অবশ্য ভূমি সংক্রান্ত এসমস্ত কিছু ক্ষেত্রে অনলাইন সেবা চালু হয়েছে এবং অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছে। তবুও এ বাস্তবতা সকলেরই জানা যে, এখনও দেওয়ানী ও ফৌজদারী অধিকাংশ মামলা মোকদ্দমার পেছনে ভূমি বিরোধ এবং সে বিরোধের অন্তরালে বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতি সর্ব সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে।

গবেষণা লব্ধ তথ্যে সংশ্লিষ্ট উত্তরদাতাদের বরাতে জানা গেছে, ভূমি প্রশাসনে দুর্নীতির মূল কারণগুলো হচ্ছে- এ খাতে সম্পৃক্ত কর্মচারীদের কর্মবৈশিষ্টই দুর্নীতি প্রবণ, অর্থাৎ এ খাতে দুর্নীতি যেন তাদের পেশাগত ঐতিহ্য; এবং এ অপরাধ কর্মটি ঐতিহ্যে উপনীত হতে পেরেছে এ কারণে যে, দুর্নীতিবাজ কর্মচারীরা দুর্নীতি করেও রীতিমত পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে এই খাতে দুর্নীতি সরকারি সেবার অন্যান্য খাতকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে, অর্থাৎ অন্যদেরকেও দুর্নীতিতে উৎসাহিত করছে। সেই সাথে ভূমি সংক্রান্ত আইনবিধানের সহজতা ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে, এবং সেগুলো সম্পর্কে সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের মধ্যে অজ্ঞতা রয়েছে। আবার, যে-সময়ে গবেষণাকর্মটি সম্পন্ন হয়েছে (২০১১ সালে) তখন সরকারি কর্মচারীদের বেতনভাতা তুলনামূলক কম ছিল বিধায় সেটাও তাদের দুর্নীতির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। অথচ পরবর্তীতে তাদের বেতনভাতা ৭৫-১২৩ ভাগ বৃদ্ধি করা হলেও যে জনসেবা সংক্রান্ত দুর্নীতিতে খুব একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে- তেমন দাবির নিদর্শন বা উদাহরণ কমই আছে।

বিজ্ঞাপন

কারণ, দুর্নীতি হচ্ছে জলীয় বাষ্পের মতো যা যেকোন উপায়ে তার নির্গমনের পথ খোঁজে। সমাজবিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে নানামুখী প্রয়াস পাচ্ছেন, রাষ্ট্রের পরিচালকবৃন্দ দুর্নীতি দমনে নানান কৌশল কাজে লাগাচ্ছেন, কিন্তু এ বিষয়ে তাদের সমস্ত সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলাফল দুর্নীতি দমনে প্রত্যাশিত অবস্থান অর্জন করতে পারছে না। অবশ্য, দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা সাথে নিয়ে খোলামেলা (উন্মুক্ত) কৌশলই বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে বলে প্রমাণ মিলেছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেমন- নির্বাচন কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে তাই সম্ভবপর স্বাধীনতা প্রদানের মাধ্যমে তাদের সত্যনিষ্ট সক্রিয়তা সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

এক্ষেত্রে সুশাসনের চর্চা উভয় লক্ষ্যই অর্জন করতে পারে। যেমন- ধারাবাহিক নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্র শাসনের বৈধ কর্তৃপক্ষ গঠন পূর্বক গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিশ্চিত করে। এবং গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ঘটলে অবৈধ অগণতান্ত্রিক ক্ষমতা বদলের প্রবণতা রহিত হবার মাধ্যমে তা দুর্নীতি প্রশমনে প্রভাব রাখে। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নকর্মে জনগণের সম্পৃক্ততা বিশেষকরে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে তা বিদ্যমান বৈষম্য, বঞ্চনা এবং দুর্নীতি হ্রাস করে। তৃতীয়ত, এক্সেস টু ইনফরমেশন বা তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা হলে, এবং সঠিক তথ্য তুলে ধরতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দেয়া হলে তাতে সমাজের সাধারণ ও পশ্চাদপদ মানুষের ক্ষমতায়ন ঘটে, ফলে দুর্নীতির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। চতুর্থত, আইনের শাসন অর্থাৎ বিচার বিভাগসহ অন্যান্য সরকারি সেবাখাতে আইন ও বিধিবিধানের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমেও দুর্নীতি দমন সম্ভব হবে, কারণ অপরাধ জনিত শাস্তির নিশ্চয়তা দুর্নীতির দৃশ্যপট থেকে দুর্নীতিবাজদেরকে সরে যেতে বাধ্য করবে।

দুর্নীতি আসলে সুশাসনের ব্যর্থতার ফল, একইভাবে দুর্নীতির কারণেও সুশাসনের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আর সে সুশাসনের প্রধান চালিকাশক্তি জনপ্রশাসনের ছোট থেকে সর্বোচ্চ আমলাবর্গসহ সবাই। সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হতে পারে- (১) দুর্বল জনপ্রশাসনের কারণে দুর্নীতির সুযোগ বহাল থেকে যাচ্ছে, এবং তাই (২) দক্ষ জনপ্রশাসনই দুর্নীতি প্রতিরোধ করে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে। এ উভয় মন্তব্যকে একত্রে বিবেচনা করলে দাঁড়ায়, দক্ষ জনপ্রশাসন দুর্নীতি দমন করতে পারে এবং দুর্নীতি দমনের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে। আর সরকারের পক্ষে এই দ্বৈত লক্ষ্য পূরণে সবচেয়ে সহজ ও সহায়ক উপায় হচ্ছে একটি সুদক্ষ জনপ্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। অবশ্য প্রসঙ্গের প্রয়োজনে এখানে বলে রাখা ভালো যে, জনপ্রশাসন কেবল সংস্থাপন মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত জনসেবায় নিয়োজিত কর্মীবৃন্দ নয়, জনপ্রশাসন বলতে দেশি, বিদেশি, সরকারি, বেসরকারি, সুশীল সমাজসহ যারাই যে মুহূর্তে যতটুকুই হোক জনসেবার সাথে জড়িত তিনি বা সেই গোষ্ঠী ততটুকু সময়ের জন্য জনপ্রশাসনের অংশ। অর্থাৎ সরকারের নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন পরিষদ বিভাগের সদস্যবৃন্দসহ প্রতিরক্ষা বা অন্যকোন সংস্থা বা গোষ্ঠী দেশ ও জনগণের যেকোন সেবার সাথে যুক্ত ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট সকলকে বুঝায়। একজন আইন প্রণেতা তথা মাননীয় সংসদ সদস্য যখন উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বসে জনগণের সেবা ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত হন তখন তিনি জনপ্রশাসনের অংশ। কোন জরুরী প্রয়োজনে, যেমন দুর্যোগ মোকাবেলায় কোনো বিশেষায়িত বাহিনীকে নিয়োজিত করলে তারাও তখন জনপ্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর, সকলের সমন্বিত উদ্যোগেই দুর্নীতি দমনে প্রয়াস পেতে হয়; সর্বব্যাপী দুর্নীতি দমন একক কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়।

এর মানে, একটি উন্মুক্ত রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাই দুর্নীতি দমনে সক্ষমতা রাখে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দুদকের হাসপাতাল পরিদর্শন, চট্টগ্রাম কাস্টমস অনুসন্ধান, দুদকের নিজ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার, সরকারি ক্ষমতা চর্চায় রত এবং সরকারি ক্ষমতা বহির্ভুত যেকোন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির ক্ষেত্রে দুদক কর্তৃপক্ষের দৃঢ় ঘোষণার মতো পদক্ষেপ তারই বহিঃপ্রকাশ। আমরা আশা করবো বর্তমান সরকার-প্রধান অবশ্যই সমধিক জনসম্পৃক্ততা অর্থাৎ যেখানে যতটা সম্ভব সকল ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে, জনপ্রশাসনকে সুদক্ষ করে তোলার অংশ হিসেবে আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অত্যাবশ্যক ব্যবহারের বিষয়টি অতীব গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেবেন এবং তদানুযায়ী টেকসই দুর্নীতি হ্রাসের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রচেষ্ট হবেন। দেশের সর্ব স্তরের সকল মানুষ একটি দুর্নীতি ও দারিদ্রমুক্ত টেকসই উন্নত বাংলাদেশের পানে তাকিয়ে আছেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

 

Bellow Post-Green View