চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দুধ, ভেজাল ও অন্ধের দুধ দর্শন

নিত্যনতুন ইস্যুর ভিড়ে দুধে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান পাবার ইস্যুটি কি হারিয়ে গেল? কিন্তু ইস্যুটিকে তো এত সহজে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না! কেননা এর সঙ্গে ব্যবসা, জনস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য ইত্যাদি অনেক কিছুই জড়িত।

হ্যাঁ, দুধ আমরা সবাই চিনি-জানি। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার মধ্য দিয়েই আমাদের জীবনের ‘খাই-খাই’ পর্ব শুরু হয়। বাংলা অভিধানে দুধের অর্থ সম্পর্কে বিশাল এক অনুচ্ছেদ রয়েছে। যেখানে বলা আছে: দুধ বি. ১ দুগ্ধ, পয়ঃ, স্তন্য; ২ দুধের মতো সাদা রস বা তরল পদার্থ (নারকেলের দুধ)। [সং. দুগ্ধ]। দুধকলা দিয়ে কালসাপ পোষা ক্রি. বি. মারাত্মক শত্রুকে চিনতে না পেরে সাদরে পালন করা। ̃ কুসুম্ভা বি. দুধে ঘোঁটা সিদ্ধির শরবত। দুধ ছেঁড়া, দুধ কাটা, দুধ ছানা হওয়া ক্রি. বি. টক জিনিসের সংস্পর্শে দুধ বিকৃত হওয়া।

বিজ্ঞাপন

দুধ তোলা ক্রি. বি. শিশুর পান-করা দুধ বমি করে দেওয়া। দাঁত, দুধে দাঁত বি. শিশুর প্রথম যে দাঁত গজায় এবং পরে ছ-সাত বছরে যা পড়ে যায়।ভাত বি. শুধু দুধসহযোগে ভাত যা মূলত শিশুর, বৃদ্ধের ও রোগীর খাদ্য।রাজ,  কমল বি. হেমন্তকালের ধানবিশেষ। দুধালো, দুধেল বিণ. দুধ দেয় এমন, দুগ্ধবতী (দুধেল গাই)। দুধে-আলতা রং বি. দুধে-আলতা মেশালে যে উজ্জ্বল গৌরবর্ণ হয়। দুধে-ভাতে থাকা ক্রি. বি. (আল.) সচ্ছল অবস্হায় বাস করা। দুধের ছেলে, দুধের বাচ্চা বি. নিতান্তই শিশু, দুগ্ধপোষ্য শিশু।

দুধের সাধ ঘোলে মেটানো ক্রি. বি. বাঞ্ছিত বস্তুর অভাবে অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট বস্তু দিয়ে কাজ চালানো।
শিশুর শরীর গঠন ও পুষ্টিসাধন এবং প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থ ও নিরোগ জীবন নিশ্চিতকরণে যে খাদ্য-উপাদানগুলোর ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দুধ। দুধকে বলা হয় সুপার ফুড বা সর্বগুণসম্পন্ন খাবার। এর মধ্যে রয়েছে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, প্রোটিন, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি-১২, নিয়াসিন ও রিবোফ্লোবিনের মতো পুষ্টি উপাদান৷ তাই বিশেষত শিশুদের শারীরিক-মানসিক বিকাশে দুধ একটি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য-উপাদান।

প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে সবচেয়ে ভালো খাবার ছিল সম্ভবত দুধ-ভাত। গরিব-দুঃখীরা দেবতার কাছে বর চাইতেন- এই দুধ-ভাত। ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর লিখেছিলেন, ‘‘প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে জোড় হাতে।/আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে॥/তথাস্তু বলিয়া দেবী দিলা বরদান।/দুধে ভাতে থাকিবেক তোমার সন্তান॥’’ দেবতার বরে গরিব পাটনীর সন্তানেরা কতদিন দুধে-ভাতে ছিল, জানি না। তবে সেটা বেশি দিন চলার কথা নয়। কালে কালে আমাদের অবস্থা পাল্টেছে।কোষ্ঠকাঠিন্য

আমাদের খাবারের বৈচিত্র্য বেড়েছে। ঠাঁট বেড়েছে। প্রাচুর্য বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে রোগ-শোক-দুঃখ-দারিদ্র্য। আমাদের রাজনীতির মধ্যে যেমন ‘পলিটিক্স’ ঢুকে গেছে, ঠিক তেমনি দুধে-ভাতেও উৎপাত শুরু হয়ে গেছে। আসলে ঠিক দুধে-ভাতে নয়, উৎপাত শুরু হয়েছে দুধে।

এমনিতেই দুধ আমাদের দেশে দুষ্প্রাপ্য এবং মূল্যবান জিনিসে পরিণত হয়েছে।এখন আবার এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভেজাল। আগে দুধে ভেজাল বলতে ছিল পানি মেশানো।এখন মেশানো হয় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান। এমনকি দেশে এখন দুধ ‘বানানো’ও হচ্ছে! সম্প্রতি পাবনার ভাঙ্গুড়ার সঞ্জয় ঘোষের ‘খাঁটি দুধে’র কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়।

এই অভিযান থেকে জানা যায়, নিম্নমানের সয়াবিন তেল, দুধ তৈরির চক পাউডার এবং সোডা ও কেমিক্যাল মিশিয়ে ‘খাঁটি দুধ’ তৈরি করা হতো এবং তা যেত মিল্ক ভিটার বিভিন্ন দুগ্ধ ব্যবস্থাপনা সমিতির কাছে। ভেজাল-শিল্পে আমাদের অগ্রগতি সত্যিই বিস্ময়কর!

গত বছরের মে মাসে দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ‘পাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশই নিরাপদ নয়’ মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদপত্রের সেসব প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনা হলে আদালত এ বিষয়ে একটি রিট আবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটিকে বাজারে পাওয়া যায় এমন সব ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত দুধের মান পরীক্ষাপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত।

সম্প্রতি আদালতে জমা দেয়া বিএসটিআই এর তথ্যবিবরণী থেকে জানা যায়, বাজারে থাকা ১৪টি ব্র্যান্ডের ১৮টি পাস্তুরিত/ইউএইচটি দুধ পরীক্ষা করে আশঙ্কাজনক কিছু পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টার ও ফার্মেসি অনুষদের গবেষকেরা জানিয়েছেন যে বাজারে প্রচলিত ৭টি পাস্তুরিত দুধে মানব-চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে, যা মানবদেহের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এ তথ্য প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে দেশব্যাপী সচেতন মানুষদের মধ্যে হৈ-চৈ শুরু হয়েছে। কেননা অ্যান্টিবায়োটিক রোগ প্রতিকারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হলেও মানুষের শরীরে এর ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব দেখা দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি দুধ নিয়ে আবারও হাইকোর্ট আবারও সোচ্চার হয়েছেন। সম্প্রতি হাইকোর্টের মন্তব্য: ‘‘কেউ বলছেন, দুধে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে।

আবার কেউ বলছেন, ক্ষতিকর উপাদান নেই। আবার ঢাবির শিক্ষক দুধ পরীক্ষার গবেষণা ফল প্রকাশের পর একজন সেক্রেটারি তাকে নিয়ে কথা বললেন। বাট, হোয়াই? দুধ নিয়ে কি কোনো রাজনীতি হচ্ছে? তাহলে আমাদের বলুন।’’ না, আদলতকে একথা কেউ বলবে না। কারণ দুধ নিয়ে আসলেও একটা রাজনীতি চলছে। কারণ সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোই দুধ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য করছেন।

এ বছরেরই ফেব্রুয়ারি মাসে সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির গবেষণায় বলা হয়েছিল, দুধে এন্টিবায়োটিক, কীটনাশক, সীসা এবং বিপদজনক সব অনুজীব রয়েছে। সেই গবেষণাপত্রটি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপনও করা হয়েছিল। কিন্তু তখন বিষয়টি নিয়ে কোনো হৈ চৈ হয়নি। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক গবেষণা করে যখন বললেন, ‘দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব আছে’ তখন সবাই এভাবে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন কেন?

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব তো পারলে ঘুষিই লাগিয়ে দিতেন। গবেষণাপত্রটি কোনো স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশের আগেই জনসমক্ষে জানানো ও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির ‘অপরাধে’ অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রকাশ্য হুমকিই দিয়ে ফেললেন! গবেষণার ফলাফল জার্নালে প্রকাশের আগে প্রচার করা যায় না এমন তথ্য ও যুক্তি তিনি কোথায় পেলেন?

একজন নামজাদা অধ্যাপক-গবেষকের চেয়ে একজন আমলা যখন গবেষণা বেশি বুঝতে শুরু করেন, তখন গবেষণা এবং আমলাতন্ত্র দুয়ের জন্যই বাঁশ! আমরা তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নিই যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই অধ্যাপকের গবেষণাপত্রটি ত্রুটিপূর্ণ, তাহলে সেই পরীক্ষাগুলো আবার করা হচ্ছে না কেন? যদি তার গবেষণার ফল মিথ্যা বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে তো আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া যায়। তা না করে যেভাবে ওই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রকাশ করা হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়!

হলুদ-দুধতবে দুধ নিয়ে এই পাল্টাপাল্টি বা রাজনীতির দ্রুত অবসান হওয়া উচিত। এর সঙ্গে শুধু জনস্বাস্থ্যই নয়, ব্যবসাও যুক্ত। দুধে ক্ষতিকর উপদান বা এন্টিবায়োটিক আছে-এমন তথ্য ভোক্তাদের আমদানিকৃত গুঁড়োদুধের উপর নির্ভরশীল করে তুলবে।

গবাদি পশুপালন, দুগ্ধখামারী এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষজন লোকসানে পড়বেন, এবং তাতে দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত শিল্প ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই দুধ নিয়ে খুব দ্রুতই একটি স্থির সিদ্ধান্তে আসা দরকার। দুধ আসলেই খাবার উপযোগী, নাকি ক্ষতিকর-এ নিয়ে টালবাহানা খুবই অস্বস্তিকর একটি বিষয়। এর অবসান ঘটা দরকার।

পুনশ্চ: এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আসলে দুধ খাওয়ার সামর্থ্য নেই। তারা দুধ কিংবা দুধ-ভাত না খেয়েও টিকে আছে, বেঁচে আছে। দুধে নানা ধরনের ক্ষতিকর উপাদানের কথা শুনে তারা আজ সবচেয়ে বেশি খুশি! দুধ আসলেই এক ‘ভয়ঙ্কর জিনিস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে একটি গল্প মনে পড়ছে। দুজন ভিক্ষুক একত্রে ভিক্ষা করতেন। তাদের একজন অন্ধ এবং অপরজন খোঁড়া। একদিন তারা ভিক্ষা করতে করতে একটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। সেখানে পায়েস রান্না করা হচ্ছে।

পায়েসের সুবাস টের পেয়ে অন্ধ লোকটি বলল, এটা কোন খাবারের গন্ধ হে, ভারি সুন্দর। খোড়া ব্যক্তিটি বলল, এটা হচ্ছে পায়েসের ঘ্রাণ। এই বাড়িতে পায়েস রান্না হচ্ছে। আচ্ছা আমরা এখানেই অপেক্ষা করি, যদি চেয়ে-চিন্তে একটু পায়েস খাওয়া যায়।

তখন অন্ধ লোকটি জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, পায়েস জিনিসটা কী? উত্তরে বলা হলো, এটা দুধ, চিনি ও চাল দিয়ে তৈরি সুস্বাদু খাবার। অন্ধ লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল, দুধ জিনিসটা কী? উত্তরে খোঁড়া লোকটি বললো, দুধ বকের মতো সাদা। অন্ধ ব্যক্তিটির আবারও প্রশ্ন: বক দেখতে কেমন?

এবার খোঁড়া লোকটি বকের আকৃতি বোঝানোর জন্য তার হাতকে বকের মাথার মতো বাঁকা করে অন্ধের সামনে ধরল। অন্ধ ব্যক্তিটি বাঁকা হাতটি স্পর্শ করে জানাল যে, এ রকম বাঁকা আর শক্ত দুধ আমার গলা দিয়ে যাবে না। সুতরাং এ জিনিস আমি খাব না!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View