চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দুই সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের যা বললেন হাইকোর্ট

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশেনের দুই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আদালতের ডায়াসে পেয়ে রাজধানীর সার্বিক পরিবেশে নিয়ে বিস্তারিত বললেন হাইকোর্ট।

রাজধানীর ‘ধুলাবালি প্রবণ’ এলাকাগুলোতে দিনে দুইবার পানি ছিটাতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কী ব্যবস্থা নিয়েছে সে বিষয়ে জানতে গত ৫ মে ঢাকা সিটি করপোরেশনের দুই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে তলব করেছিলেন হাইকোর্ট।

বিজ্ঞাপন

সেই তলবে হাজির হলে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে রাজধানীর রাস্তাঘাট, ফুটপাত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, ধুলাবালি, উন্নয়নকাজ, মশা নিধনসহ সার্বিক পরিবেশ নিয়ে বলেন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

শুরুতেই আদালত আসছে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা করে মশা নিধনের বিষয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশেনের দুই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সতর্ক করেন।

এসময় আদালত বলেন, ‘এখনই পদক্ষেপ না নিলে আসছে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব আর বাড়তে পারে।’

এরপর ‘ধুলাবালি প্রবণ’ এলাকায় পানি ছিটানোর বিষয়ে আইনজীবী নুরুন্নাহার নূপুর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করলে আদালত জানতে চান: এর মধ্যে কখন, কোথায় পানি ছিটানো হয়েছে তার ডিটেইলস আছে? ছবি দেখে তো কিছু বোঝা যায় না।

এসময় আইনজীবী বলেন: সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে কে কখন কোথায় পানি ছিটিয়েছে। ৫ মে থেকে ১২ মে পর্যন্ত নিয়মিত পানি ছিটানো হয়েছে। তখন আদালত জানতে চান, কয়টা থেকে কয়টা পর্যন্ত পানি ছিটানো হয়েছে?

বিজ্ঞাপন

উত্তরে আইনজীবী নূপুর বলেন: আমাদের পানি দিতে হয় খুব সকালে। সূর্য ওঠার আগেই পানি দেওয়া শেষ করতে হয়।

একপর্যায়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানকে ডায়েসে ডেকে আদালত বলেন: ‘আমাদের কাছে মনে হচ্ছে’ প্রোপারলি পানি ছিটানো হচ্ছে না। তাই কাজটা প্রোপারলি হচ্ছে কিনা সেটা আপনাদেরই মনিটর করতে হবে। কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী দিনে দুইবার কোথায়, কোন জায়গায় পানি ছিটাতে হবে সেটা আপনাদের দেখতে হবে। এবং এ বিষয়ে ডিটেইলস আপনাদের দিতে হবে। মনে রাখবেন, আপনার-আমার সকলেরই বেতন-ভাতা, বাড়ি-গাড়ি, সুযোগ-সুবিধা সবই হয় জনগণের টাকায়। দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন না করলে আপনাদের জবাবদিহি করতে হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ না এবং জনগণ সেটা মানবে না।’

এরপর আদালত বলেন: প্রায় সময়ই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে। ওভারব্রিজ এমনভাবে করেছেন যে, ওভারব্রিজের কারণে ফুটপাত বন্ধ হয়ে গেছে। এ বিষয়গুলো খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু বাইরের দেশে এগুলো নিয়ে মামলা হয়, অবহেলার জন্য আমলাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়। আপনাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বললে উন্নয়নের বাজেটই কিন্তু থাকবে না।’

আদালত আরো বলেন: ‘আপনাদের ম্যানহোল থাকে না। একটু বৃষ্টি হলেই ঢাকা শহরে অনেক জায়গায় পানি হাঁটুর উপরে চলে যায়। আপনারা এসবের ব্যবস্থা না করতে পারেন, এগুলো সবই কিন্তু পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত। জলাবদ্ধতা থেকে আরম্ভ করে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ছিটানো সবই। আপনারা এদেশের সন্তান, আপনারা এখন যারা চাকরিতে আছেন তারা সবাই কিন্তু বাংলাদেশ হওয়ার পরে চাকরিজীবী হয়েছেন। কেউ পাকিস্তানের অফিসার না, বাংলাদেশর অফিসার। আমাদের মনে হচ্ছে আপনাদের অনেক নেগলিজেন্সি (অবহেলা) আছে। কিছুদিন আগে দেখলাম ফুটপাতের মধ্যে দুই-তিন ফিট পর পর ব্যারিয়ার করেছেন মোটরসাইকেলের জন্য। মোটরসাইকেলের জন্য ব্যারিয়ার করেছেন ভাল কথা, কিন্তু এতে পথচারিও তো আহত হচ্ছে।’

এসময় আদালত আরো বলেন: আপনারা কিন্তু মানুষের কাছ থেকে ট্যাক্স কম নেন না। প্রচুর পরিমাণ ট্যাক্স নেন। ট্যাক্স নিচ্ছেন ঠিকই, বিনিময়ে কিন্তু আপনারা কিছু দিচ্ছেন না। আপনাদের মায়া থাকা উচিৎ। ভবিষ্যত প্রজন্ম মানে আপনার প্রজন্ম। তাদের জন্য ঢাকা শহরটাকে বসবাস উপযোগী রাখা। এরজন্য যদি এক্সট্রা পরিশ্রমও করতে হয় তা করে যেকোনভাবে এই বিষয়গুলো এনশিওর করুন।

‘‘আপনাদের ডাকার উদ্দেশ্য এটাই। আপনাদের অনেক কাজ থাকার পরও ডাকতে বাধ্য হয়েছি। কারণ আমাদের মনে হয়েছে আপনাদের অবহেলা আছে। একটু সতর্ক হলেই সমাধান করা যায়। দেশটা আপনারও যেমন, আমারও তেমন। সবারই দেশ, সবারই নগরী। নগরীটাকে বসবাসের উপযোগী রাখেন। এ জন্য যা করা দরকার সেটা করেন এবং আমাদের সহযোগিতা লাগলে বলেন।’’

এরপর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাইকে ডায়েসে ডেকে আদালত বলেন: আপনি তো শুনছেনই কী বলা হয়েছে, বেসিক্যালি এর বাইরে বেশি কিছু বলার নাই। মশার বিষয়টি দেখবেন। আর আপনারা তো বিদেশে যান ঘন ঘন। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর তো সমুদ্রের মধ্যে দ্বীপ। তারা কত ডিসিপ্লিন এবং রাস্তাঘাট কত পরিষ্কার। আমাদের রাজধানীতেও বিদেশিরা আসে, দেখে। যতটুকু দায়িত্ব আছে, বাজেট আছে তাদিয়েই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার। সাবেক মেয়র আনিসুল হক অনেক ভালো উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আশা করি বর্তমান মেয়র সেগুলো এগিয়ে নিবেন।

এর আগে ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে গণমাধ্যমে ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে একটি রিট আবেদন করা হয়। সেই রিটের শুনানি নিয়ে ২৮ জানুয়ারি আদালত রুলসহ আদেশ দেয়। সেই রুলের শুনানিতেই আজ আদালত এসব কথা বলেন।

Bellow Post-Green View