চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দুই শিশুর বিষয়টা ভালভাবে শেষ হলে দেশের ভাবমূর্তি বাড়বে: হাইকোর্ট

দুই কন্যা শিশুকে নিয়ে জাপানি মা ও বাংলাদেশি বাবার বিরোধের বিষয়টা ভালভাবে শেষ হলে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি বাড়বে বলে মন্তব্য করেছন হাইকোর্ট।

আলোচিত দুই শিশুর বিষয়ে আদেশের ধারাবাহিকতায়  বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এই মন্তব্য করেন।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

এসময় আদালতে এরিকোর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। আর ইমরান শরীফের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ ও ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান।

আজকের শুনানিতে ইমরান শরীফের আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ বলেন, যে সিদ্ধান্তই আদালত দিক না কেন শিশুদের সাথে আলোচনা করে যেন আদালত তা দেয়। যদি এটা না করা হয় তাহলে অত্যন্ত অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

তখন আদালত বলেন, ‘পরিস্থিতি তো মা-বাবা আপনারাই সৃষ্টি করেছেন। আর ভিকটিম হচ্ছে বাচ্চারা।’

এসময় আইনজীবী রোকনউদ্দিন মাহমুদকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলেন, ‘আপনি তো দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিক, আবার আইনজীবী সমিতির (বারের) জ্যেষ্ঠ সদস্য। আপনি একটা উদ্যোগ নেন। অপর পক্ষের সাথে বসে দেখেন। আশা করব যে, একটা ভাল সমাধান বের করবেন। এখানে যদি দুজনই (নাকানো এরিকো ও শরীফ ইমরান) আমাদের নাগরিক হতেন আমরা একরকম চিন্তা করতে পারতাম। যেহেতু এখানে একজন বিদেশি নাগরিক আবার আরেকজন বাংলাদেশি ও আমেরিকার বংশদ্ভূত নাগরিক আছেন সে কারণে সব পক্ষ মিলে যদি একটা সৌহার্দপূর্ণ সমাধান করতে পারেন সেটা আমাদের সবার জন্যই ভাল হয়।’

এর জবাবে ব্যারিস্টার রোকনোদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘আমি আশা করছি একটা সমাধান আমরা বের করতে পারব। অপর পক্ষের আইনজীবী শিশিরি মনিরকে বলেন আমার সাথে কথা বলতে। তখন আদালত এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘আমি সবসময়ই প্রস্তুত আলোচনায় বসার জন্য। যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায় বসতে প্রস্তুত আছি।’

বিজ্ঞাপন

এসময় আদালত বলেন, ‘আমরা চাই বাইরের কোনো নাগরিক যেন মনে না করে আমরা খুব ইয়ে। তাই এই বিষয়টা ভালভাবে শেষ হলে আমাদের দেশের ভাবমূর্তিটা বাড়বে।’ তখন ব্যারিস্টার রোকনোদ্দিন মাহমুদ তখন বিচারকের কথায় সমর্থন জানিয়ে বলেন, আমি আপনার সাথে সম্পূর্ণ একমত। এরপর আদালত বলেন, বিষয়টার সুন্দর সুরাহা করতে পারলে সেটা শুধু আপনাদের জন্যই না বাচ্চাদের জন্যও ভাল হবে, আমাদের দেশেরও। কারণ, এখানে যেহেতু নানাভাবে দেশ-বিদেশ জড়িত হয়ে গেছে। তাই সুন্দর একটা সমাধান সবার জন্যই ভাল।’

একপর্যায়ে আদালত তার আদেশে বলেন, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত দুই কন্যা শিশুর সাথে থাকবে জাপানি মা নাকানো এরিকো। আবার শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত গুলশানের ভাড়া বাসায় দুই কন্যা শিশুর সাথে থাকবেন বাবা ইমরান শরীফ। এভাবে আগামি ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কন্যাদের পাশে থাকবেন বাবা মা।

এর আগে দুই মেয়েকে নিজের জিম্মায় পেতে ঢাকায় এসে গত ১৯ আগস্ট জাপানি নারীর করা রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। আদালত তার আদেশে দুই মেয়েসহ তাদের বাবা ও ফুফুকে আগামী ৩১ আগস্ট হাইকোর্টে হাজির হতে নির্দেশ দেন। ওই দুই মেয়েকে নিয়ে বাবা আগামী ৩০ দিন বিদেশ যেতে পারবেন না বলে নিষেধাজ্ঞা দেন হাইকোর্ট। এরপর দুই মেয়েকে বাবার হেফাজত থেকে সিআইডি উদ্ধার করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখে।

এ বিষয়টি গত ২৩ আগস্ট মেয়েদের বাবার পক্ষের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে আনেন।

দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্ট ৩১ আগস্ট পর্যন্ত শিশুদের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারেই রাখার নির্দেশ দেন। সেসময়ে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মা ও বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বাবা শিশুদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেন আদালত।

সে অনুযায়ী বা-মা শিশুদের সাথে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে সময় দেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের আইনজীবী আদালতে এসে জানান শিশুদের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। তখন আদালত উভয় পক্ষকে বলেন কোথায় থাকলে ভালো হয় সে বিষয়ে সমঝোতা করে সিদ্ধান্ত জানাতে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী গত ৩১ আগস্ট দুই মেয়েসহ তাদের মা-বাবা এবং ফুফু হাইকোর্ট কক্ষে উপস্থিত হন। এক পর্যায়ে আইনজীবীসহ দুই মেয়ে এবং তাদের মা-বাবা ও ফুফুকে খাস কামরায় ডেকে সবার বক্তব্য শুনেন হাইকোর্ট। এরপর দুই পক্ষের প্রস্তাবের ভিত্তিতে হাইকোর্ট আদেশ দেন যে, ইমরান শরীফের গুলশানের ভাড়া বাসায় দুই শিশুকে নিয়ে বাবা- মা আপাতত ১৫ দিন একসাথে থাকতে পারবেন। সেই সাথে ঢাকার সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালককে এদের পারিবারিক পরিবেশের বিষয়টি দেখভাল করেতে নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দুই শিশু ও তাদের মা-বাবার যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়।

তবে এই আদেশ মোডিফিকেশন চেয়ে এরিকোর করা আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার রাত (৯, ১১, ১৩ ও ১৫ তারিখ) দুই কন্যা শিশুকে নিয়ে জাপানি মা গুলশানের বাসায় থাকবেন বলে আদেশ দেন। আর ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যের বাকি সময়টা বাবা-মা দুজনেই শিশুদের সাথে থাকতে পারবেন বলে ওইদিন আদেশ দেয়া হয়। এছাড়া বাবা- মা দুজনই তাদের শিশুদের নিয়ে বাইরে যেতে এবং কেনাকাটা ও ঘুরাফেরা করতে পারবেন বলে আদেশে বলা হয়। আর ওই ফ্লাটের ভেতরে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরা অপসারণ করে বাসার বাইরে তা স্থাপন করতে বলেন হাইকোর্ট। এছাড়া বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে দুই শিশুর মা-বাবাকে নিয়ে প্রচারিত ‘অবমাননাকর ভিডিও’ অপসারণে বিটিআরসিকে নির্দেশ দিয়ে ওইসব ভিডিও যারা তৈরি ও প্রচার করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে সিআইডি’র সাইবার পুলিশ সেন্টারকে ওইদিন নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট।

বিজ্ঞাপন