চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দুই মেয়র পেরেছে, দুই মেয়রই পারবে

এই কদিন আগেও যে ঢাকা শহরে সৌন্দর্যের চরম ঘাটতি ছিল দুই মেয়রের প্রাণান্তকর চেষ্টায় সেই ঢাকা শহরে আস্তে আস্তে কিছুটা হলেও নতুন সৌন্দর্যের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তাঘাটে যত্রতত্র ময়লা, আবর্জনার স্তুপ কমে আসছে। এবারের পবিত্র ঈদ উল আজহা ঘিরে হাজার হাজার পশু কোরবানি হলেও নগরীতে সেই আগের মতো ময়লার ছড়াছড়ি বা উৎকট গন্ধ নেই।

শুধু এই নয়, নগরীর কাঁচা বাজারগুলোর চারপাশ যে নিত্য দুর্গন্ধময় হয়ে থাকতো সেটাও কমে এসেছে। পাড়া-মহল্লার নোংরা পার্কগুলোর বেশিরভাগই সংস্কার করা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষগুলো এখন পার্কে এসে কিছুটা হলেও স্বস্তির সাথে শ্বাস-নিশ্বাস নিতে পারছে। আবার দুই মেয়র অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে অবৈধ-বেআইনি এবং মহাবিরক্তিকর বাসস্ট্যান্ডগুলোর বড় অংশই উৎখাত করতে সক্ষম হয়েছেন।

তেজগাঁও ট্র্যাকস্ট্যান্ড সরিয়ে ফেলার মতো বৈপ্লাবিক সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছেন উত্তরের মেয়র। নগরীর উত্তরে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসহ আরো ছোটখাটো বাসস্ট্যান্ডগুলো তুলে দিয়ে মানুষের চলাচলের পথকে সুগম করা হয়েছে। বিগত দিনগুলোতে দেশের দুরদূরান্ত থেকে এসে যে মহাগ্যাঞ্জ্যামপূর্ণ গাবতলীর মুখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো সেটাও বেশ নিরসন হয়েছে মেয়রের কল্যাণেই। যে যত কথাই বলুক বলতেই হবে আগে এ কাজগুলো একেবারেই হয়নি, এখন হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এসব ভালো উদ্যোগ ও কাজের সুফলও পাচ্ছে।

এবারের ঈদ-উল আজহায় কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছে দুই সিটি কর্পোরেশন। দুই মেয়র আনিসুল হক এবং সাঈদ খোকন প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ৩৬ ঘণ্টা কম সময়ের মধ্যে সমস্ত বর্জ্য অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। দু একটি জায়গার কথা বাদ দিলে মনেই হচ্ছে না যেনো ঢাকা শহরে কয়েকদিন আগে শত শত গরু কোরবানি হয়েছে। অথচ কয়েক বছর আগের কথা ভাবুন কোরবানির পশুর বর্জ্যে নগরবাসীর চলাচলই দায় হয়ে পড়তো। বাড়ির সামনে এবং রাস্তায় যত্রতত্র গরুর দেহের নাড়িভুরি আর গোবর পড়ে একাকার হয়ে থাকতো। দিনের পর দিন পার হলেও তা অপসারণ করতে দেখা যেতো না। উৎকট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তো সর্বত্র। নিঃসন্দেহে বিগত দিনের যে কোনো বছরের তুলনায় এবার সবচেয়ে দক্ষতার সাথে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ করতে দেখা গেছে দুই মেয়রকে।

দুই মেয়র অবশ্য ঈদের আগেই অঙ্গীকার করেছিল চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তারা বর্জ্য অপসারণ করবেন। সেই অঙ্গীকার তারা সঠিকভাবেই পালন করতে সক্ষম হয়েছেন। সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই অনেক প্রচুর করেছেন। আসলে উদ্যোগ এবং অঙ্গিকার থাকলে অনেক ভালো কাজই দ্রুততার সাথে করা সম্ভব। এবার একটু মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের কথা বলি। আনিসুল হক মেয়র হওয়ার আগে আমরা দেখেছি প্রতিদিন এই স্ট্যান্ডে অসহনীয় যানজট লেগেই থাকতো। অফিসগামী মানুষগুলোর নানাভাবে নাস্তানাবুদ হতে হতো। বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের কষ্টের সীমা ছিল না। এইতো বেশ কয়েকমাস আগে উত্তরের মেয়র আনিসুল হক এক নির্দেশেই বাসস্ট্যান্ডটি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। সত্যিই এখন আর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে ভয়াবহ যানজট বলে কিছু নেই। একইভাবে মোহাম্মদপুর টাউনহল সংলগ্ন কাঁচাবাজারের চারপাশে যে ময়লার স্তুপ জমে থাকতো সেটাও এখন নেই।

বিশেষ করে এই বাজারের পূর্বদিকের মুরগি বেচাকেনার কোণাটা দীর্ঘদিন ধরে এক ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল। দুগর্ন্ধে হাঁটাচলাও করা যেত না। গ্রীনহেরাল্ড, সেন্ট যোসেফ, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন নাক চেপে স্কুলে যেতে হতো। মেয়র আনিসুল হক আসার পর এই দুর্ভোগ থেকে মোহাম্মদপুরের মানুষগুলো নিস্কৃতি পেয়েছে। মোহাম্মদপুরের মূল রাস্তার উপর যে ময়লা ফেলার কন্টেইনার থাকতো সেগুলোও অপসারণ করা হয়েছে। এরকম নগরীর অনেক জায়গাতেই কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হয়েছে। বলা যায়-এসবই দৃশ্যমান উদ্যোগ ও কাজ থেকে সরাসরি মোহাম্মদপুরবাসীসহ অন্যান্যরা কিছুটা হলেও সুফল পেতে সক্ষম হয়েছে। শুধ মোহাম্মদপুরবাসী বলে কথা নয়, প্রায় সব ওয়ার্ড ও থানা এলাকাতেই দৃশ্যমান উন্নতি চলমান রয়েছে।

তবে এই সময়ে দুই মেয়রের বোধ হয় সবচেয়ে আরও বড় সাফল্য নগরীকে অবৈধ বিলবোর্ড মুক্ত করার কঠিন শপথ নেওয়া এবং তা কার্যকর করা। এতদিন যা কেউ করতে সক্ষম হননি, দুই মেয়র সেটা করতে সক্ষম হয়েছেন। আর এ কারণেই শহরকে এখন খানিকটা মুক্ত মনে হয়। বিলবোর্ডগুলো নামিয়ে ফেলার কারণে নগরীর নানা যন্ত্রণাবিদগ্ধ মানুষগুলো ক্রমশই নতুন এক ঢাকা শহরকে দেখতে পাচ্ছে। বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড আর ব্যানারগুলো নামিয়ে ফেলার কারণে নগরে আলো-বাতাসের দেখা এখন ভালোই পাওয়া যাচ্ছে। ক’দিন আগেও পুরো ঢাকা শহরই ছিল নানান জাতের বিলবোর্ডে ছাওয়া। রাস্তা, ফুটপাথ আর ছোট বড় সব বিল্ডিং-এর ছাদ জুড়ে ছিল বিলবোর্ড আর বিলবোর্ড। অবৈধ বিলবোর্ড ঘিরে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যও হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনে এক শ্রেণীর কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানার ক্ষমতাসীন দলের লোকজনেরাই ছিল অবৈধ সব বিলবোর্ডের বড় উপকারভোগী।

বিজ্ঞাপন

প্রতি মাসে বিলবোর্ডের উৎস থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা উল্লিখিতদের পকেটে যেত বলে কথিত রয়েছে। নিয়ম কানুন মানার কোনো বালাই ছিল না। আর তাই বিলবোর্ড দুষণে দুষিত হয়েছিল পুরো ঢাকা শহর। অবৈধ বিলবোর্ডের কারণে ঢাকা শহরের আকাশ পর্যন্ত ঢেকে গিয়েছিল। বিলবোর্ডের কারণে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। রাস্তার পাশের বড় বড় বিল্ডিং এবং খোদ রাস্তাতে বিলবোর্ড স্থাপনা করা হয়েছিল। কিন্তু বিলবোর্ডের সেই রাজত্বকে দুই মেয়র ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে নগরীর আকাশ এখন ভীষণ মুক্ত ও ঝলমলে। বাতাসের চলাচলও যেন বৃদ্ধি পেয়েছে। নগরীর গাছগুলো এখন বেশ ভালো অক্সিজেন সরবরাহ করতে পেরেছে। পরিবেশবিদরা অবৈধ বিলবোর্ডগুলো সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল অনেক অগে থেকেই। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের ঘুষখোর ও মুনাফাখোর কর্মকর্তাদের কারণে কোনোভাবেই এই বৃত্ত ভাঙা সম্ভব হচ্ছিলো।

বেশ আগে থেকেই রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে যে যেমন পেরেছে সেভাবেই এই খাত ব্যবহার করে টাকা লুটে নিয়েছে। কিন্তু বর্তমান  দুই মেয়র মাথা নত করেনি। মাথা উঁচু করার সাহস দেখিয়েছে। দুই মেয়র সাহস দেখিয়ে নেপথ্যের কোনো সিন্ডিকেটের কাছে মাথা নত করেনি বলেই বিলবোর্ডগুলো অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। সকল ধরনের অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণ দুই মেয়রের অন্যতম কৃতিত্ব বললে ভুল হবে না।

বলতে দ্বিধা নেই এতদিন ধরে ঢাকা শহর যে ভীষণ জঞ্জালময় হিসেবে চিহ্নিত ছিল তা থেকে বের হয়ে আসছে। পুরনো ফোয়ারাগুলো সংস্কার করা হচ্ছে। নতুন নতুন ল্যান্ডস্কেপিং-এর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এটা সত্য যে, সুন্দর সুন্দর ল্যান্ডস্কেপিং করে ঢাকা শহরের চেহারাটাই বদলে দেওয়া সম্ভব। ঢাকা শহরে যে বিস্তর রাস্তাঘাট রয়েছে, যে আইল্যান্ড রয়েছে সেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে প্রাণের প্রাচুর্য তৈরি করা অসম্ভব কিছুই নয়। শুধু প্রয়োজন সু-উদ্যোগ আর একইসাথে উদ্যাগী মানুষগুলোকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সঠিকভাবে সহায়তা দেওয়া ও প্রণোদিত করা। সায়েন্সল্যাবরেটরিতে ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার রাফেয়া আবেদীন-এর করা ‘অর্ঘ’ নামে যে ল্যান্ডস্কেপিং রয়েছে তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে সক্ষম হয়েছে যে-এ ধরনের উদ্যোগ নগরের মানুষের মনে প্রাকৃতিক পরিবেশের স্বাদ দিতে সক্ষম।

ঢাকার রুক্ষ পথে চলতে চলতে যখন সবুজ গাছ, লাউ-এর জাংলা, পাখির কলকাকলি, নীল প্রজাপতি, জলরাশি, হাঁসের সাঁতার কাটা চোখে পড়ে তখন কার না ভাল লাগে। শহরের সৌন্দর্য রক্ষায় নাগরিকদেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু এই শহরের মানুষগুলো অদ্ভুত এক চরিত্রের মোড়কে বন্দী। নিজে ভাল পরিচ্ছন্ন সৌন্দর্যময় শহর চান। কিন্তু নিজে কখনই কোনো দায়িত্ব পালন করবেন না। সবকিছুই রাষ্ট্র, সরকারকে করতে হবে। এটি একেবারেই ভুল ধারণা। যার বা যাদের শহর তাদেরকেই সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে এবং দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সাথে কিছু কিছু মানুষকে প্রতিবাদীও হতে হবে। যত্রতত্র পোষ্টার লাগানো, গাছে ছোটবড় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া, বাসাবাড়ির দেওয়ালগুলোতে যা-তা লেখা- এ থেকে বের হয়ে আসতেই হবে।

আমরা শহরটাকে যেভাবে সবাই মিলে নোংরা, জঞ্জালময় করছে এটি আমাদের মরিচা পড়া, ভোতা দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন। এই অচলায়তন ভাঙ্গতেই হবে। নগর জীবনে এখন সুন্দর চিন্তার দৈন্যটা প্রকট। সবাই শুধু নিজে ভাল থাকবো, ভালো খাবো এই আকাঙ্খায় বিত্ত ও বৈভবের পেছনে ছুটছে। কেউ সমষ্টিগত দায়িত্ব পালনে স্বচেষ্ট নই। কিন্তু একটি ছোট্ট সুন্দর সার্বজনীন উদ্যোগ যে সবার জীবনে চমৎকার প্রভাব ফেলতে পারে এটি নিয়ে কারো মাথা নেই। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, সমষ্টিকে নিয়ে নয়। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা আমাদের নগরজীবনকে বিষময় করে ফেলছে। এই বৃত্ত থেকে বের হতেই হবে।

সবশেষে বলবো খুব কম সময়ের মধ্যে দুই মেয়র অনেকগুলো ভাল কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রভাবশালী, লুটেরাদের কাছে মাথা নত করেন নি। প্রমাণ করেছেন তারা ভাল কাজ করতে সক্ষম। আশা করি আগামীতেও তারা আরও অনেক ভাল কাজ করার কৃতিত্ব দেখাবেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন