চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘দুঃসংবাদ মানে প্রিন্টিং মিসটেক’

সাধারণত টিভি নাটকে আর চোখ আটকায় না। ভাঁড়ামো, মিথ্যাচার আর এক রকমের ঔদ্ধত্যের চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে নাটকের প্রধান চরিত্র। কোনো কোনো নাটকের সকল পাত্র-পাত্রিই একই চর্চা করতে থাকেন। বাস্তবে ওই অভিনেতাদের অভিনয় পেশার মহত্ব বলে কিছু আর থাকে না। অবশ্য তাদের কোনো দায় নেই। নাট্যকার পরিচালক প্রযোজকদের মর্জি রক্ষা করতে গিয়ে তাদের যেকোনো পানিতে নামতে হয়। নায়ককে মনে হয় কৌতুক অভিনেতা। ভিলেনকে মনে হয় বাস্তবেই একজন ফটকাবাজ। কখনো কখনো নায়কের স্বভাব, কথা বলার ধরন ও জীবনাচারকে মাথায় রেখেই নাটক লেখা হয়। সেগুলোর মধ্যে যথেষ্টই অনাদর্শ, অপসংস্কৃতি, বিকৃতি ইত্যাদির প্রাধান্য থাকে। এসবের আবার এক শ্রেণির দর্শক দাঁড়িয়ে গেছে। তারা সংখ্যায় বিপুল। তাই পরিচালকদের এই ধরনের কাজেই পেশাদারিত্ব তৈরি হয়েছে। প্রযোজকদের টেস্টও এদিকেই ধাবিত হয়েছে। এভাবেই কালো জলে প্লাবিত হয়েছে নাটকের মতো শক্তিশালী সাহিত্য সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র। এখন প্রশ্ন হলো উপদ্রুত এলাকা বলতে কোন সীমানাকে ধরবো আমরা? সবই কি শেষ হয়ে গেছে নাকি আশার আলোও আছে?

ব্যক্তিমাত্রেই সীমাবদ্ধতার আধার। এই বিবেচনায় আমি একেবারেই সীমাবদ্ধ একজন। জানাশোনা নেই। এ সময়ে যেসব প্রতিভা গড়ে উঠছেন বা উঠেছেন তাদের সবাইকে আমি চিনি না। ঈদসহ বিভিন্ন উপলক্ষে যেসব নাটক টিভিতে প্রচারিত হয় সেগুলো দেখেই ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে কখনো খিস্তি করি। কখনো কারো কারো অভিনয় দেখে ভালো লেগে যায়। সস্তা সংলাপের, সহজ ভঙ্গিমার ছোটো ছোটো ক্লীপস ফেসবুক ভিডিওতে দেখি। উপভোগ করিনা তা বলা যাবে না। অনেক সময় সুস্বাদু খাবার চরম ক্ষতিকর জেনেও তো খাই।

বিজ্ঞাপন

নভেম্বরের দ্বিতীয় শুক্রবার। সারাদিন বাসায়। কোনো চাপ নেই। নামাজ পড়ে এসে অনমনা টিভি ছেড়ে মোবাইলে মনোযোগ রেখেছি। প্রথমে সংলাপ পরে একটি মজার দৃশ্যে টিভিতে চোখ আটকে গেল। পার্কের ভেতর এক প্রবীণ এক ব্যক্তি হাতে একটি সংবাদপত্র নিয়ে সভ্যতা পাল্টে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে গেলেন। তার মুখের হাসি যেন নিশ্চিত করছিল এই নৈরাজ্যের দিন আর থাকবে না।

অনেকটা অচেনা এক দৃশ্য। টেলিভিশন নাটকে সময় বদলের বার্তা! ভুল দেখছি না তো! সংলাপগুলো নাটকীয়তাহীন বক্তব্য ধর্মী। মনে হচ্ছে বইয়ের কথা। এখানে ইমপ্রোভাইজ করে কেউ কিছু বলছে বলে মনে হয় না।

বর্তমান সময়ে আফরান নিশোর অভিনয় আমার ভালো লাগে। তার অনেক নাটকের ক্লীপস আমি দেখেছি ফেসবুক ভিডিওতে। অধিকাংশই হাসির খোরাক। হঠাৎ চোখ আটকে যাওয়া এনটিভির টেলিফিল্মে নিশোকে দেখলাম অন্যরকম। কন্ঠস্বর আলাদা। অভিনয় আলাদা। প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপটও আলাদা। আলো আঁধারময় এক সংবাদপত্র অফিসের কর্মধ্যক্ষ হিসেবে তার কাল্পনিক সাংবাদিক সহকর্মীদের সঙ্গে অদ্ভুত সংলাপ বিনিময় করছেন। একবার রিপোর্টারের চেয়ারে বসে সম্পাদকের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন, আরেকবার সম্পাদকের চেয়ারে বসে স্বপ্রতীভ চেতনার তীক্ষ্ণ ছুরিতে কাটছেন সমাজের দুর্বলতাগুলো।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান সময়ের নাটক, সংলাপ ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ফারাক এত বেশি যে আমার কাছে একটু এলোমেলো লাগছিল। মনে হচ্ছিল এইসব অভিনেতা অভিনেত্রীর মুখ দিয়ে এমন সব সংলাপ সই হচ্ছে না। কিন্তু ঘটনার পরম্পরা, সংলাপের শক্তি আর অন্তরের ভেতর লুকোনো এক গভীর আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে প্রতিটি মুহূর্ত মনোযোগ কেঁড়ে নিচ্ছিল।

কয়েকজন মাত্র চরিত্র। সারাজীবন মুক্তির নেশায় পার করে দেয়া অশিতীপর বৃদ্ধ সিরাজুল হক, নতুন সভ্যতার স্বপ্নচারী বিপ্লবী সম্পাদক আফরান নিশো, তার সঙ্গে সামিল হওয়া টলমলে পথ চলা এই সময়ের শিক্ষিত তরুণী তিশা আর কৈশোরের শেষ প্রান্তে দাঁড়ানো অচেনা মুখের একজন। আরো দুয়েকটি গৌণ চরিত্র আছে। যা হোক। আমাদের আজকের জীবন বাস্তবতার আমরা যেভাবে কথা বলি। যে কথার জন্য যেভাবে মুখাভঙ্গি করি, আলোচ্য টেলিফিল্মের সংলাপের সঙ্গে তার ফারাক রয়েছে। এমন কিছু সংলাপ সেখানে রয়েছে যেগুলো আমাদের প্রচলিত স্বপ্নের দৃষ্টির সঙ্গে মেলাতে হলে অভিনেতা অভিনেত্রীদের আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণ আরো গভীর উপলব্ধির প্রয়োজন হয়তো ছিল। পরিচালক তৃপ্ত কি না আমি জানি না।

টেলিফিল্মটির নাম ‘দি প্রেস’। পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। গুগল করে দেখলাম অনিমেষ আইচের মতোই চারুকলা ব্যাকগ্রাউণ্ডের একজন। একটু পাল্টা ধারার কাজই তার অস্থিমজ্জায়। প্রচলিত শৈলীকে বুঝে-শুনে ভাংচুর করে নতুন ভাষা নির্মাণের অভিযানে আছেন তিনি। নাটক, টেলিছবি আর বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল এবার চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। তাঁর অন্য পরিচয়গুলো হলো, তিনি নাট্যকার, শিল্পনির্দেশক, গীতিকবি, সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং সংগীতশিল্পী। তাঁর প্রথম ছবি ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’। এই ছবিতেও বহু ব্যতিক্রমের অন্বেষণে নেমেছেন তিনি। যা হোক ছবিটির মুক্তি করোনাক্রান্তির কবলে পড়ে পিছিয়ে গেছে। ছবিটি দেখে তারপর গল্প করা যাবে।

দি প্রেসেই আলোচনা সীমিত রাখা যাক। ভাবতে পারেন, এই অদ্ভুত রাজনীতির সময়ে, বাস্তব কিংবা স্বপ্নের দৌড়ে পরাজিত এক প্রবীন সাহসে বুক বেঁধে বলছে, ‘কার্ল মার্কস জয়লাভ করছে’। তাও এই সাহস তার আসছে একটি কাগুজে সংবাদপত্র থেকে, যখন সংবাদপত্র সকল বন্ধাত্বের সঙ্গে মিশে বাণিজ্যের গান গায়। তাও সেই সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রকাশক এক বিপ্লবী তরুণ। হতে পারে সে ক্ষুদিরাম কিংবা চারু মজুমদারের মতো। হতে পারে কমরেড মনি সিংহের মতো। কিন্তু না এই কমরেড অন্যরকম। সে আসলে একসঙ্গে ঘরের মধ্যে নিহত এক সাংবাদিক দম্পতির একমাত্র সন্তান। কেন জানি দর্শক হিসেবে আমি ‘সাগর-রুনীকেই ভেবে নিলাম। আর ভেবে নিলাম ওই নায়ক সাগর-রুনীর উত্তরসূরি ‘মেঘ’। নাটকে ওই সম্পাদকের নামটি কি ছিল মনে নেই। তবে প্রবীণ ভদ্রলোকের সামনে বিনীতা (তিশা) তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন ‘কার্ল মার্কস’ হিসেবে। আর সেই তরুণ আপ্ত বাক্যের মতো আমাদের দেশের কয়েকটি ক্ষতচিহ্ন আর সমাজের মানুষের ভোঁতা হতে যাওয়া অনুভূতির গায়ে সূঁচ ঢুকিয়ে দিল। মনে করিয়ে দিল বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের কথা। তখন অনেকেই দাঁড়িয়ে এই হত্যাকাণ্ডের ছবি তুলেছে। সমাজের মানুষের এই অদ্ভুত অনুভূতি যে সত্যিকারের ধসের নমুনা তা মনে করিয়ে দেয়। তার বিপরীতে একজন রিক্সাঅলা যে বিশ্বজিৎকে বাঁচানোর জন্য ব্রতী হয়, সেটিই হতে ওঠে ওই সম্পাদকের খবর। সম্পাদক বলতে চান, দুঃসংবাদ মানে প্রিন্টিং মিস্টেক। নেতিবাচক খবরগুলো আমাদের চেতনাকে গ্রাস করছে। সংবাদমাধ্যম নেতি খবরগুলোকেই মানুষের খাদ্য হিসেবে দেখছে। এর বিপরীতে একটি কাল্পনিক ইতিবাচক সংবাদপত্র প্রকাশের প্রয়াস সম্পাদকের। সম্পাদক দেখতে পান, বাঙালি সভ্যতার পরিবর্তনের সময় এসে গেছে। জনগণের বিজয় যেন আসন্ন।

রাজনৈতিক চেতনার বুনোনো ঠাসা ওই টেলিফিল্ম। বারবারই মনে হয় বক্তব্যই এখানে মুখ্য। দর্শক হিসেবে নাটকে তরল ও অর্থহীন সারশূন্য বাক্যালাপ আর প্রেমের নামে এক ধরণের দরকষাকষির কিংবা বাজে সুরসুরি খুঁজতে গিয়ে খুব খাপছাড়া লাগে ব্যাপারগুলো। মনে হয় মাঝে দীর্ঘ ব্যবধান ঘটে গেছে। বহু আগে থেকেই একটু একটু করে রাজনৈতিক সচেতনতা আর জীবনের প্রকৃত সুরগুলো যদি নাটক টেলিফিল্মে আনা যেত, তাহলে নাটক নির্মানে আমরা বহুদুরেই থাকতাম। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল সত্যি এক অন্য স্বাদের সঙ্গে নতুন মশাল জ্বাললেন। আমি মনে মনে খুব চাই এই ভাষায়, এই স্বরে, এই চেতনার ধারায় নির্মিত হতে থাক আমাদের নাটক সিনেমা। আবার মানুষ সিনেমা নাটক দেখে প্রেম করতে শিখুক। নায়ক হতে শিখুক। মুক্তির কথা ভাবতে শিখুক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)