চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দুঃখ উড়াই এক তুড়িতে

জীবনের সব মুহূর্তে সংগীত হয়তো দোল দেয় না, বা এটা সম্ভব ও নয়। কিন্তু জেমস, এমন একজন বাউলের নাম যার কণ্ঠ যাপিত জীবনে দুঃখ, বেদনা, প্রেম কিংবা নিঃসঙ্গতার কিনারে থাকা মানুষটিকেও দোল দিবে! সর্বাবস্থায়। উন্মাদনা সৃষ্টি করবে। আমি ভাগ্যবান যে এমন এক হৃদয়গ্রাহি নগর বাউলের সমকালে জন্মেছি। তারুণ্যকে উপভোগ করেছি সুরে তালে।

আমার শৈশবের প্রথম প্রেম, ভালোবাসার নাম জেমস। গুরু জেমস। সেই প্রথম দেখা থেকেই তার প্রতি আমুগ্ধ ভক্তি। যা এখনও চলমান। হয়তো আমৃত্যু সেই মুগ্ধতা বজায় থাকবে। শেষ বার তাকে মঞ্চে দেখেছি চলতি বছরেই। ২৭ জানুয়ারি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। প্রথমবার দেখে তারপ্রতি যে প্রেম অনুভূত হয়েছিলো, সেদিন দেখেও বুঝলাম- গুরুর প্রতি ভালোবাসা একটুও খাদ পড়েনি!

বিজ্ঞাপন

প্রথম দেখা থেকে শেষ দেখা। মাঝখানে কতো বছর গত হয়েছে! নিজেরও বয়স বেড়েছে, ব্যক্তিত্বের বদল হয়েছে! স্কুল কিংবা কলেজ পড়ুয়া তো নই এখনও, অথচ গুরুকে দেখার পর পাগলামি ভর করে সেই আগের মতোই! সেদিনও গুরুর কণ্ঠের সাথে হাজারও দর্শকের মধ্যে থেকেও গলা মিলিয়েছি, চিৎকার করেছি। না, ব্যক্তিত্ব বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। গুরু সামনে থাকলে এখনও আগের মতোই ঘোরের মধ্যে কেটে যায় সময়। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো যেন তিনি এক বিস্ময়কর ম্যাজিশিয়ান!

করোনাকালে পুরোপুরি লকডাউনে আটকা পড়ে গেলাম। অফিস বন্ধ। বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ঘরে বন্দি থেকে কিছুই যখন ভালো লাগছিলো না। সব একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছিলো। তখনও নগন্য এক শিষ্যকে উদ্ধারে ‘মান্নান মিয়ার তিতাস মলম’ নিয়ে এগিয়ে গেলেন গুরু। শুনতে থাকলাম তার পুরনো দিনের গানগুলো। শৈশব কৈশোর কিংবা তারুণ্যে যে গানগুলো শুনে দোল খেতাম! ‘জেল থেকে বলছি’র মতো গান টনিকের মতো কাজ করতে লাগলো বন্দী জীবনে! লেইস ফিতা লেইসের কথা শুনতেই বিগত দিনের প্রেমিকার চুলের ঘ্রাণ ভেসে বেড়াতে লাগলো যেন! জেমসের ‘কবিতা’ শুনতে শুনতে হারিয়ে যাওয়া প্রেমকে পদ্ম পাতার জলের সাথে মিলিয়ে ভেবে নিলাম, জীবন এমনি!

আরেক কোণে যাপিত জীবনের সমস্ত দুঃখ বেদনা মিলেমিশে তৈরী হতে থাকে মস্ত ভাগাড়। কিন্তু সঙ্গ নিঃসঙ্গতার মোড়ে মোড়ে বেজে উঠে গুরুর গান। যে গানের ঘোরে দুঃখ উড়াই এক তুড়িতে। আসলে তার গান জীবনের এক গভীর ও গোপন শক্তি। বেঁচে থাকার অন্যরকম প্রেরণা।

জীবনের সমস্ত বাঁকবদল নিয়ে গেয়ে উঠা চির তরুণের ৫৬তম জন্মদিন শুক্রবার। ঘর পালিয়ে আজিজ বোর্ডিং থেকে নাইট ক্লাবে গিটার বাজিয়ে এলোমেলো ছন্নছাড়া জীবন কাটিয়ে আজকে কোটি তারুণ্যের ভালোবাসার গুরু। এক জীবনে এতো খ্যাতি ও ভালোবাসা পেয়েও মানুষটা কেমন নির্লিপ্ত কাটিয়ে দিচ্ছেন একটা জীবন। অবাক লাগে। অথচ গম্ভীর, কম কথা বলা মানুষটা হঠাৎ করে হেসে উঠলে সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ে কোটি তরুণ-তরুণীর মুখে।

বাংলা রক গানের জাদুকর, নগরে বাস করা এক বাউল বেঁচে থাকুক আরো অনেক অনেক বছর। ভালোবাসা ছড়িয়ে দিক পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে বসবাস করা বাঙালির হৃদয়ে। তার জন্য ভালোবাসা অবিরাম। একই সঙ্গে এই কামনা করি- দ্রুতই পৃথিবীর রোগ মুক্তি ঘটুক। স্বাভাবিক হোক মানুষের জীবন। কোনো মফস্বলে সুবিশাল মাঠে তার জন্য অপেক্ষায় থাকুক হাজারও তারুণ্য। খুব চাই, আগের মতোই গিটার হাতে হুড়মুড় করে মঞ্চে উঠে পড়ুক নগর বাউল। বলে উঠুক ‘কেমন আছে দুষ্টু ছেলের দল?’ তারুণের চিৎকারে ধ্বনিত হোক আকাশ বাতাস। এইভাবে দেখতে চাই তাকে। সব ভুলে স্কুল কলেজ পড়ুয়া তরুণের মতো আমিও তার কণ্ঠে গলা মেলাতে চাই। সেই সুন্দর স্বাভাবিক পৃথিবীর প্রতীক্ষায়।