চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দিনাজপুরে অপরিকল্পিত অটো-রাইস মিলের প্রভাবে বিপর্যস্ত পরিবেশ

দিনাজপুরে যত্রতত্র গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত অটোরাইস মিল ও চাতালের কড়ালগ্রাস থেকে রক্ষা পেতে এবার আন্দোলনে নেমেছে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।

এসব অটোরাইস মিল ও চাতালের বিষাক্ত ধোঁয়া, বর্জ্য, ধুলো-ময়লা, তুষ-ছাই উড়ে জনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘটছে পরিবেশের বিপর্যয়। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে গাছ-পালা, পুকুর, ডোবা, নালা। বিষাক্ত ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে রাস্তা দিয়ে মানুষের চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়েছে। চোখের রোগ, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকার মানুষ।

বিজ্ঞাপন

এর প্রতিবাদে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী বিক্ষোভ-মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলনও করছেন। কিন্তু কোন প্রতিকার নেই তাতে। বরং নতুন নতুন আরো চাতাল মিল গড়ে উঠছে। তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী।

বিজ্ঞাপন

দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় প্রায় দুই হাজার চাল কল রয়েছে। এর মধ্যে অটোরাইস মিল ও হট ফ্লু মিল প্রায় দুই’শটি। এছাড়া বাকিগুলো মেজর মিল ও হাসকিং মিল। দিনাজপুর সদর, বীরগঞ্জ ও বোচাগঞ্জ উপজেলায় সব চেয়ে বেশী চাল কল রয়েছে। এসব অধিকাংশ চাল কল অপরিকল্পিত। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব চাল কল পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনছে। জলাশয় ও নদীতে কালো পানি ও ছাই গিয়ে দূষণের ফলে মাছ মরে যাচ্ছে। কালো ধোয়া ও ছাই জমে ফল আসছে না গাছে। এমনি অভিযোগ সদর উপজেলার মাঝিপাড়া ও আউলিয়াপুর এলাকাবাসীর।

এলাকার গৃহবধূ জান্নাতুন বেগম জানালেন, রান্না-বান্না করার সময়ও হাড়ি-পালিতে ছাই-ধুলো পড়ে। খাওয়ার সময়ও ভাত বাড়া বাসনে পড়ে ছাই-ধুলো।

মোবাররক হোসেনের অভিযোগ, তার পুকুরের মাছ নষ্ট হয়ে গেছে। গাছগুলো মরে যাচ্ছে। যেগুলো আছে তাতে ফল ধরছে না আগের মতো।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা গেছে,অটোরাইস মিলগুলোতে নির্দিষ্ট পরিমাণ উঁচু চিমনী থাকার কথা থাকলেও বেশিরভাগ মিলেই চিমনী নেই। চিমনী না থাকায় মিলের ছাই ময়লা উড়ে আশপাশের বাড়িঘর যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি পথচারীদের চোখে-মুখে পড়ে চোখ নষ্ট হচ্ছে। সেই সাথে ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা।

উদ্ভিদবিদ মো.মোসাদ্দেক হোসেন জানালেন, ক্রমাগত বিষাক্ত ছাই ও কালো ধোঁয়া বাতাসে উড়তে থাকলে বাতাস ও জমিতে ক্ষারের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। আর বাতাসের ক্ষেত্রে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। উদ্ভিদের চরম ক্ষতি হয়। ফুল ও ফল উৎপাদন বাঁধাগ্রস্থ হয়। জমির পুষ্টি উৎপাদন হ্রাস পায় এবং এক সময়ে মাছ-পশু পাখি মারা যায়। এটি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।

দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কে.বি.এম কলেজের অধ্যক্ষ মো.জিয়াউল হুদার অভিযোগ, অপরিকল্পিত অটোরাইস মিল ও চাতাল গড়ে ওঠায় তার কলেজসহ বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ক্লাস নেয়া থেকে শুরু করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে।

দিনাজপুর চাল কল মালিক গ্রুপের সভাপতি মোসাদ্দেক হুসাইন বলেন, অটো-রাইস মিলের পাশাপাশি ধান সিদ্ধ-শুকানোসহ নানা প্রক্রিয়ার জন্য বয়লার, চাতালও রয়েছে ৩ সহস্রাধিক। সেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হয়। এখানকার উৎপাদিত চালের ব্যাপক চাহিদা থাকায় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাইরেও রপ্তানি করা হয়। তাই দেশের উন্নয়নের জন্য শিল্পায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

দিনাজপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক মো. মিজানুর রহমান জানান, বেশকিছু চাল কলের বর্জ্য, বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, তুষ ও ছাই পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছে বলে তার কাছে অভিযোগ রয়েছে। তাই ওইসব চাল কল বন্ধের জন্য তিনি তার উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত হস্তক্ষেপ নেবেন, এমনটাই প্রত্যাশা পরিবেশবিদ ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের।