চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দামী জ্বালানি নিরাপত্তার পথে বাংলাদেশ

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জ্বালানি নিরাপত্তার কথা ভেবেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর সে কারণেই ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ তেল কোম্পানি ‘শেল পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেড’ এর নিকট থেকে নামমাত্র ৪.৫ মিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিং মূল্যে ৫টি গ্যাসক্ষেত্র কিনে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেন তিনি। গ্যাসক্ষেত্রগুলো হলো তিতাস, হবিগঞ্জ, রশিদপুর, কৈলাশটিলা ও বাখরাবাদ। এই গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট মজুদ ছিল ২০.৭৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। তখনকার হিসেবে উত্তলোনযোগ্য মজুদ ছিল ১৫.৪২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানের হিসেবে যার মূল্য প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। ৪৪ বছর ধরে গ্যাস সরবরাহ করার পরও এই ৫টি গ্যাস ক্ষেত্রে প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে। যার মূল্য প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ওপরে। আরো অনেক বিষয়ের মতো এক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর সদুরপ্রসারী চিন্তাকে সম্মান জানিয়ে ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর দিনটিকে ‘জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস’ হিসেবে উৎযাপন করা হয়।

এই জ্বালানি নিরাপত্তা আসলে কি? আন্তর্জাতিক জ্বালানি এজেন্সির মতে, সহনীয় দামে যে কোন অবস্থায় দেশের জ্বালানি চাহিদা নিশ্চিত করতে পারাই জ্বালানি নিরাপত্তা। অর্থাৎ বর্তমান বাস্তবতায় দেশে তেল গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুদ থাকতে হবে। সেই মজুদ কতটা? যেমন সাধারণত যে কোন দেশে ২ মাসের তেলের মজুদ থাকলে তাকে নিরাপদ অবস্থা বলা হয়। কিন্তু আমেরিকার টেক্সাস ও আলাস্কায় এই তেলের বিশাল ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও দেশটি তেলের জন্য মেক্সিকো, কানাডা, ভেনিজুয়েলা এবং অন্যান্য ওপেক দেশের ওপর নির্ভর করে। তার কারণ কি? তা জানার আগে একটু পেছনে ফেরা যাক।

বিজ্ঞাপন

আরব দেশ বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বলা হয় তেলের অফুরন্ত ভাণ্ডার। বিশ্বের তেল চাহিদার অর্ধেকেরও বেশী তারা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু ১৯৭৩ সালে হঠাৎ করেই আরব দেশগুলো জ্বালানি তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলাফলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি আড়াই মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ১২-১৪ ডলারে উন্নীত হয়। যা ছিল উন্নত দেশগুলোর জন্য এক বড় শিক্ষা। তখন থেকেই তারা বিকল্প জ্বালানির অনুসন্ধান শুরু করে। আর সে সময় থেকেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে জ্বালানির চাহিদা অনুযায়ী এর ব্যবহার বিদ্যমান গতিতে চললে ২০৫০ সাল নাগাদ তেল, ২০৬০ নাগাদ গ্যাস এবং ২০৮৮ সাল নাগাদ কয়লার মজুদ শেষ হয়ে আসবে। ফলে মানুষকে বাধ্য হয়েই জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস খোঁজার কাজটি হতে হবে আরও ত্বরান্বিত। কারণ, সরকারের জরিপ অনুযায়ী, নতুন মজুদ না পাওয়া গেলে ২০৩০ সালের পর দেশে আর গ্যাস থাকবে না। দেশে কয়লাখনির গভীরতা বেশি হওয়ায় খনি থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা তোলার বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা বেশ কঠিন একটি বিষয়। আর তেমন কোনও তেলের মজুদ নেই দেশে। এখনো তেলের চাহিদা মেটাতে আমদানিই প্রধান ভরসা। যদিও দেশে উত্তোলন করা গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া কনডেনসেট থেকে কেরোসিন, ডিজেলসহ বেশ কিছু পেট্রোলিয়াম পণ্য তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন-বিপিসির হিসেবেই দেশে এখন প্রতি বছর ৬০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এরমধ্যে ১৫ লাখ টন দেশে পরিশোধন করার ক্ষমতা রয়েছে। বাকি পরিশোধিত জ্বালানি তেল কিনে আনে বিপিসি। অর্থাৎ বছরে ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। এতে প্রতি লিটারে অন্তত ৬ টাকা করে অতিরিক্ত ব্যয় হয়।

ফাইল ছবি

জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি’র পূরণে যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা, তার অন্যতম হলো সবার জন্য টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। কিন্তু সমস্যা হলো টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হলো সবার জন্য সহজলভ্য করে তোলা। সেদিকে থেকে ততটা ভাল অবস্থানে নেই সরকার। জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চারটি উপাদান আছে; জ্বালানি সহজলভ্যতা, জ্বালানির সার্মথ্যতা, জ্বালানির উপযোগিতা ও জ্বালানির নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম। আমরা তার কোনটিই সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে নিতে পারিনি। আবার বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট কমিয়ে আনতে খুব সম্ভবত ২০১২ সালে জাতিসংঘ ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টেকসই জ্বালানি দশক ঘোষণা করেছে। এই সময়ে তিনটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার কথা বলা হয়েছে; এক আধুনিক জ্বালানির সহজলভ্যতা সুনিশ্চিত করা, দুই জ্বালানি দক্ষতায় উন্নতির হার ২০১৪ সালের তুলনায় দ্বিগুণ করা আর তিন নম্বর হচ্ছে জ্বালানির মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্বিগুণ করা। আমরা এই তিনটি বিষয়ে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে পারিনি। কারণ আমাদের প্রয়োজনীর বিদ্যুতের চাহিদা যে কোনভাবে মেটানোর ওপর আমরা জোর দিয়েছি। তাই আজ আপনি বিদ্যুৎখাতে টেকসই না হলেও অনেক দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের সাথে তাল মিলিয়ে গ্যাস বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে ততটো অগ্রগতি নেই।

এখন দামি জ্বালানি হিসেবে পরিচিত তরল গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা হচ্ছে। এখন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যোগ হলেও ধীরে ধীরে তা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল নাগাদ চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট করার চিন্তা আছে সরকারের। পেট্রোবাংলার হিসেব মতে এখন আমরা যে গ্যাস ব্যবহার করি তার দাম প্রতি ঘনমিটার পাঁচ টাকার মতো। আর এলএনজির দাম প্রতি ঘনমিটারে ৩৩ টাকার মতো। দেশীয় গ্যাস এবং আমদানি করা এলএনজি মিক্স করে পাইপ লাইনে দেয়া হবে। পেট্রোবাংলার হিসেব অনুযায়ী তখন প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম হবে ১৩ টাকা। আর জাতীয় গ্রীডে এলএনজির যোগান যত বাড়ানো হবে ততই বাড়বে গ্যাসের দামও। প্রতিবছর বাংলাদেশে যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে খরচ হবে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো।

এতো গেল টাকার হিসেব কিন্তু যেসব দেশ থেকে এলএনজি আমদানি করা হয় তারা কোন কারণে বিক্রি করা বন্ধ করলে বা তাদের মজুদ ফুরিয়ে গেলে তখন আমদানি করাও আর সম্ভব হবে না। আর সেজন্যই জার্মানির মতো উন্নত দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে নিজেদের স¤পূর্ণ চাহিদা মেটানোর ঘোষণা দিয়েছে। এখন ইউরোপ থেকে শুরু করে চীন পর্যন্ত বেশীরভাগ উন্নত দেশই প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। তার সাথে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে সৌরশক্তি থেকে, বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও কমে আসছে।

বিজ্ঞাপন

এক্ষেত্রে বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সরকারের বেশ ভাল অগ্রগতি আছে। সৌর-বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম এরিমধ্যে শুরু হয়েছে, বিশেষ করে চরাঞ্চলে। ২০১৮ সালে দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ উইন্ড ম্যাপিং-এর কাজ শেষ হয়েছে। এর ফল বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, বায়ুশক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। দেশের নয়টি স্থানে ২৪ থেকে ৪৩ মাসের বায়ুপ্রবাহের তথ্য সংগ্রহের পর, তা পর্যবেক্ষণ করে আমেরিকার ন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি ল্যাবরেটরি (এনআরইএল) এই সম্ভাবনার কথা জানায়। তাদের হিসেবে বাংলাদেশের নয়টি এলাকার বাতাসের গড় গতিবেগ ৫ থেকে ৬ মিটার/সেকেন্ড। বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য যাকে আদর্শ বলছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি। সাধারণত কোথাও বাতাসের প্রবাহ ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৫ মিটার/সেকেন্ড হলেই বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম বেশি পড়ে। কিন্তু ৫ থেকে ৬ মিটার/সেকেন্ড বাতাসের গতিবেগ হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে বলেও মনে করে এনআরইএল। আর বর্তমানে যে আধুনিক প্রযুক্তি এসেছে; তাতে একটি টারবাইন দিয়ে ৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এখন সরকারের উচিত একটি প্রকল্প হাতে নিয়ে এই কাজ যত দ্রুত সম্ভব শুরু করা।

আবার শিল্পের প্রসারের ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে গ্যাসের ব্যবহার। তা যেমন বানিজ্যেকভাবে তেমনি আবসিকেু সবাই গ্যাসই পেতে চান। ফলে বাড়তি গ্যাসের চাহিদা পূরণ করতে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে দৈনিক গড়ে গ্যাস উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। জ্বালানি মন্ত্রণালয় মনে করছে তারা ২০২১ সালের মধ্যে আরে ২০টি নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান করতে পারবে। সরকারের এসব পরিকল্পনা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে সমস্যা হলো পরিকল্পনা অনুযায়ী আর বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। আবার আগের অভিজ্ঞতা বলে বিদেশি কোম্পানিগুলো অনেক গ্যাস ক্ষেত্রকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করার পর দেখা গেছে বাপেক্স সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলন করতে পারছে। বাপেক্স অনেক পুরাতন গ্যাস ক্ষেত্রে গ্যাসের স্তর আবিষ্কার করেছে যেমন, ফেঞ্চুগঞ্জ-৪ কৈলাসটিলা-৪ ও ৭ সালদা নদী-৩ সহ বেশ কয়েকটি, এগুলো পরিত্যক্ত গ্যাস ক্ষেত্র ছিল।

আবার সমুদ্রে থাকা গভীর অগভীর মিলিয়ে ২৬টি ব্লক থেকে গ্যাস আহরণের জন্য সরকার দরপত্র আহ্বান করেছে। কিন্তু তাতে তেমন সারা মিলছেনা। বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো চায় নতুন পিএসসি বা চুক্তিপত্রে সমুদ্র থেকে পাওয়া গ্যাস তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির শর্তে রাখতে। কিন্তু দেশের অনেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ৫০ বছরের জ্বালানি থাকতে হবে। সেজন্য দরকার প্রায় ১১০ টিসিএফ গ্যাস (যদি শতকরা ৬ ভাগ প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়)। সেখানে পেট্রোবাংলার হিসেবে বাংলাদেশে বর্তমানে অবশিষ্ট মজুদের পরিমাণ ১১ টিসিএফ’র মতো। দেশে থাকা কয়লাকে যদি এই হিসাবের আওতায় আনা হয়, তাহলেও হবে ৩৫-৪০ টিসিএফ। এই হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে, আরো প্রয়োজন ৬০-৭০ টিসিএফ গ্যাস। বর্তমানে যে গ্যাস মজুদ আছে তা থেকে প্রায় ১০ গুণ গ্যাসের প্রয়োজন হবে ৫০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। যা মেটাতে অনেকেই বড় আশা নিয়ে অনেকে তাকিয়ে আছেন বঙ্গোপসাগরের দিকে। কারণ অন্য আরো সম্পদ বাদ দিয়ে শুধু গ্যাসের কথা চিন্তা করলেও দেখা যায়, বাংলাদেশের সমুদ্র সীমার পাশেই প্রতিবেশী ভারত কৃষ্ণা গোধাবেরি বেসিনে ১০০ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কারের কথা জানিয়েছে দেশটির সংস্থা ওএনজিসি। এ ছাড়া মিয়ানমারের সাগর ভাগেও পাওয়া গেছে বড় ধরনের গ্যাসের ভাণ্ডার। এ কারণে মনে করা হয় বাংলাদেশের অধিকৃত সমুদ্র সীমায়ও বড় ধরনের গ্যাসের মজুদ থাকতে পারে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি ওএনজিসির সাথে দুটি অগভীর ব্লকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে চুক্তি হয়েছে। তবে গতি ততটা আশাব্যঞ্ছক নয়। আর অষ্ট্রেলিয়ার কোম্পানি সন্তোষের সাথে গভীর ব্লক ১১ ও দক্ষিণ কোরিয়ার পোস্কো-দাইয়ুর সাথে গভীর ব্লক ১২ এর জন্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। তবে তাদেরও দ্বি-মাত্রিক সাইসমিক জরিপ ছাড়া তেমন কোন অগ্রগতি নেই।

বর্তমান সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপে বিদ্যুৎ ঘাটতি অনেকটা কমেছে। এখন আর লোডশেডিং আগের মতো নেই। তবে এই লোডশেডিং কমাতে রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করতে হয়েছিল। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত। তারা বিদ্যুৎ উপাদানের সব উপকরণ সরকারের কাছ থেকে নিয়ে থাকে কিন্তু উৎপাদিত বিদ্যুৎ বেশি দামে সরকারী প্রতিষ্ঠান পিডিবির কাছে বিক্রি করে। এই কেন্দ্রগুলো যদি পিডিবির মালিকানায় থাকতো তাহলে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার টাকাটা সাশ্রয় হতো। আবার সেই কুইকরেন্টাল প্লান্ট ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা থাকলেও কয়লাভিত্তিক বড় প্লান্টগুলো সময় মতো আনতে না পারায় সেগুলো এখনো চালু রাখতে হয়েছে। বরং গেল বছরু চুক্তি হয়েছে নতুন কুইকরেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য।বিদ্যুতের দাম-হাইকোর্ট

২০১৬ সালে বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় পরিবর্তন আনে সরকার। সেখানে ২০৩০ ছাড়িয়ে ভিশন- ২০৪১’র উল্লেখ করে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা সাজানো হয়। সেই হিসেবে ২০৩০ সালে ৪০ হাজার ও ২০৪১ সালে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এই সময়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩৫ শতাংশ কয়লা, ৩৫ শতাংশ গ্যাস ও আমদানি করা এলএনজি, ১৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আমদানিকৃত বিদ্যুৎ, ১০ শতাংশ পারমানবিক এবং ৫ শতাংশ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে একটি বিষয় জেনে রাখা ভাল, এই পরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে স্থানীয়ভাবে অর্থাৎ দেশের অভ্যন্তর থেকে প্রতি বছর ১১ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলনের কথা বলা হয়েছ। জেনে রাখা ভাল, বর্তমানে প্রতিবছর কয়লা উত্তোলনের পরিমান শূন্য দশমিক সাত মিলিয়ন টন আর এখনো কয়লা নীতিই চূড়ান্ত করতে পারেনি সরকার। এই সময়ে এই খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা। আর ২০০৯ থেকে ১০ বছরে দেশী বিদেশী মিলিয়ে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা।

বিদ্যুৎবাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের আরেকটি পথ হতে পারে জলবিদ্যুৎ। যদিও বাংলাদেশের একার পক্ষে এই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল জলরাশিকে কাজে লাগাতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে বিপুল পরিমাণ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভবত। ভারতে বিভিন্ন প্রদেশে অন্তত এক লাখ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আরও দেড় লাখ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। বর্তমান সরকার এক্ষেত্রেও অবশ্য দূরদর্শিতার প্রমাণ দিয়েছে। এরই মধ্যে সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু চুক্তিও স্বাক্ষর করা হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টির সাথে দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়ও জড়িত, বিশেষ করে ভারতের। আবার কার্যক্রম শুরু হবার পরও বিদ্যুৎ উৎপাদন করে দেশে আনতে ৮ থেকে ১০ বছর সময় প্রয়োজন, ভাবতে হবে সে কথাও।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View