চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দাইমাদের গল্প

আমাদের দুই ভাইয়ের পর পরিবারের সবাই আশা করেছিলেন যে, এইবার অন্ততপক্ষে মেয়ে সন্তান হবে। নির্দিষ্ট দিনে মায়ের ব্যথা উঠলো। এর আগের দুইবার মানে আমাদের দুই ভাইয়ের জন্মের সময় মা ‘নায়ওর’ গিয়েছিলো। কিন্তু এইবার দাদি আর যেতে দেয়নি কোনো এক কারণে। তাই নানি চলে এসেছেন। সাথে করে নিয়ে এসেছেন একগাদা খাবার। এর মধ্যে একটা খাবার ছিলো রসুনের কোয়া দিয়ে মুড়ি ভাজা। মুড়িটাকে আবার নতুন করে ভাজা হয়েছে খোসাসমেত রসুনের কোয়া দিয়ে। মুড়িগুলো এতে করে আধাপোড়া হয়ে গেছে আর রসুনের কোয়াগুলোও সিদ্ধ হয়ে গেছে। আমরা দুই ভাই সেই মুড়ি ভাজা বেতের তৈরি ছোট পাত্রে নিয়ে ঘুরে ঘুরে খেয়ে বেড়াই৷ বেতের এই পাত্রটাকে আমাদের এলাকায় বলে টুড়ি। আর মুড়িকে বলে হুড়ুম।

যাহোক, নানি এসে মায়ের যত্ন নিতে শুরু করলেন। কারণ পরিবারে আর কেউ নেই যত্ন নেয়ার। ব্যথা শুরু হওয়ার পর দাদি তাড়াতাড়ি আব্বাকে পাঠালেন পাশের পাড়ার দাইমাকে ডাকতে। দাইমা আসলে কোন পেশা ছিলো না তখন। কিছু মহিলা মানুষের সন্তান প্রসবের সময় পাশে থেকে সাহস দিতো এবং করণীয় কি হবে তা বাতলে দিতো। আমার ঠিক মনেপড়ে না উনাদের কোন প্রশিক্ষণ ছিলো কি না।

বিজ্ঞাপন

দাইমা আসার পর সবাই কেমন জানি নির্ভার হয়ে যেতো। এরপর সবকিছুই চলতো দাইমার বলে দেয়া নিয়মে। এরপর একসময় সবার মুখ আলো করে দাইমার হাত ধরে আগমন ঘটতো এক নতুন শিশুর। শিশু ভূমিষ্ঠ হবার পর দাইমার প্রথম কাজ হচ্ছে ঘরের বাইরে এসে জানিয়ে দেয়া সন্তান ছেলে হয়েছে না মেয়ে। এবারও উনি ঘরের বাইরে এসে আমার আব্বার নাম ধরে বললেন, “ও আশরাফ আযান দাও। তুমি আবার ছেলে সন্তানের বাপ হইছো।” আব্বা নেহায়েত অনিচ্ছা নিয়ে বাড়ির বাইরে খোলার মাঝে দাঁড়িয়ে আযান দিতে শুরু করলেনঃ আল্লাহু আকবার। অন্যদিকে মেজো চাচাকে বললেন, ও মুশা (মোশাররফ) তাড়াতাড়ি একটা বাঁশের চল্টা তুলে দাও, ছেলের নাড়ি কাটতে হবে। মেজো চাচা ঘরের বাঁশের খুটির গায়ে দায়ের আলতো কোপে বাঁশের বাইরের ত্বকটা তুলে আনলেন। তারপর সেটাকে একটু সাইজ করে ছুরির আকৃতি দিয়ে দাইমার হাতে দিলেন। দাইমা আবার ঘরের ভিতরে চলে গেলেন।

বিজ্ঞাপন

এটাই ছিলো দাইমার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। সেই শিশু বয়সে আমরা ভাবতাম দাইমার কত ক্ষমতা। উনি চাইলেই পৃথিবীতে আরেকটা নতুন শিশু আনতে পারেন। গ্রামের এই সকল দাইমাদের কোন সরকারি স্বীকৃতি ছিলো না। কিন্তু ছিলো অনেক সম্মান। যে পরিবারে বাচ্চা হতো তারা উনাকে অনেক সম্মান করতেন। শুরুতে উনাকে শাড়িসহ বেশকিছু উপঢৌকন দিতেন। আর অবস্থাসম্পন্নরা প্রতিবছরই উনাকে কিছু না কিছু উপহার দিতেন। বিশেষ করে ঈদের সময়টাতে৷ এছাড়াও ছেলে মেয়ে বড় হয়ে গেলে তাদের সুন্নতে খৎনা বা বিয়ের সময়ও উনাকে দাওয়াত দিতেন।

এরপর দাইমা শব্দের সাথে দেখা হলো কুষ্টিয়ার বাণী সিনেমা হলে মায়ের আঁচল ধরে সিনেমা দেখতে যেয়ে। মা, পূর্ব পাশের বাড়ির খালা, তারপরের বাড়ির কাকিমা সবাই মিলে একসাথে সিনেমা দেখতে যেতো সেসময়। আর আমরা ছোটরা যেতাম ফাউ হিসেবে। তখন বাংলা সিনেমার অন্যতম সুপারহিট সিনেমা “রূপবান” চলছে। এই সিনেমাটা আসলে একটা গীতিনাট্য আলেখ্য। কথায় কথায় পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে গান গেয়ে উঠতো সিনেমার চরিত্রগুলো তাই সিনেমাটা দেখতে ছিলো খুবই উপভোগ্য। সেখানে একটা গানের কথায় ছিলো, শোন শোন দাইমা গো…। তার মানে দাইমা আসলে আবহমানকাল ধরেই বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অবশ্য এই সিনেমার দাইমায়ের দায়িত্ব ছিলো রহিম বাদশাকে দেখাশোনা করা এবং সেবা সুশ্রুষা করা। তবে এই সিনেমার একটা দৃশ্য এখনও আমার চোখে ভাসে। গাছের উপর থেকে গড়াতে গড়াতে একটা বাঘ নেমে আসে। আমি সেটা দেখে এমন এক চিৎকার দিয়েছিলাম যে সারা হল পিনপতন নীরব হয়ে গিয়েছিলো।

এরপর একসময় দাইমা’র সাথে সরাসরি দেখা হলো। আমাদের এক প্রতিবেশী সন্তান সম্ভবা। যেকোনো সময় উনার ব্যথা উঠতে পারে। মা উনাকে বলে রেখেছেন যত রাত্রেই ব্যথা উঠুক মাকে যেন ডাক দেয়। মাঝ রাত্রের পর উনার ব্যথা উঠলো। চাচা এসে শংকিত স্বরে মাকে ডাক দিলেন, ও ইয়াকুবের মা ওঠো, লাভলির মায়ের ব্যথা উঠেছে। মা তাড়াতাড়ি উঠে আমাকে ডাক দিলেন। বাইরে এসে চাচাকে বললেন, আপনি তাড়াতাড়ি ইয়াকুবকে নিয়ে আল্লেকের মা কে ডাকতে যান। আমি লাভলির মায়ের কাছে যাচ্ছি। আমি আর চাচা রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করলাম। আল্লেকদের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে দেখা যায়। আমাদের বাড়িগুলোর পিছনে শুরু হয়েছে অবারিত সবুজের ক্ষেত। আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটা সোজা গিয়ে নব্বই ডিগ্রি বাঁক নিয়ে ফকির পাড়ার দিকে গেছে। আমাদের বাসা থেকে তাই ফকির পাড়ার রাস্তার এপাশের বাড়িগুলো দেখা যায়। দিনের বেলায় আমরা ক্ষেতের মধ্যে দিয়েই আসা যাওয়া করি। শুরুতেই ডব্লিউদের আক্ষের ক্ষেত। এরপর জাহিদ নানাদের ধানের ক্ষেত আর তারপর আবার উনাদের কলার ক্ষেত। এভাবেই চলে গেছে। আমি আর চাচা তাড়াতাড়ি পা বাড়িয়ে হেটে গেলাম। মিনিট দশেকের মধ্যে আল্লেকদের বাড়ি পৌঁছে চাচা শুধু একটা ডাক দিলেন, ও আল্লেকের মা। আল্লেকের মা সাথে সাথে উত্তর নিলেন, কিডা আলম নাকি? গ্রামের এই বিষয়টা আমাকে সবসময় টানে। সবাই সবাইকে চিনে এমনকি সবার কণ্ঠস্বর পর্যন্ত মুখস্থ। তাই চাচার কণ্ঠস্বরেই উনাকে চিনে ফেলেছেন আল্লেকের মা। আর উনার তড়িৎ উত্তর শুনে মনে হলো উনি যেন জেগেই ছিলেন। আসলে যারা দাইমার কাজ করেন তাঁদের বিশ্রাম নেয়ার উপায় নেই। কখন উনাদের ডাক পড়বে তা কেউ বলতে পারেন না। উনাকে সাথে নিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি চলে আসলাম। উনি এসেই মাকে বললেন, আমি এদিকটায় দেখছি তুমি যেয়ে এক মালসা আগুন নিয়ে আসো। উনারা অশিক্ষিত হলেও ঠিকই জানতেন কিভাবে জীবাণুনাশ করতে হয়। তাই কোনো কাজ শুরু করার আগে হাত ধুয়ে সেই হাত আগুনের তাপে শুকিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতে ভুলতেন না।

এরপর দাইমার সাথে আবার দেখা হলো নিজের প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার সময়। গিন্নীর শরীরে বরাবরই রক্ত স্বল্পতা ছিলো। তাঁকে অনেক বলেও সেটা দুর করা সম্ভব হয়নি। কারণ তিনি ঠিকঠাক খাওয়া দাওয়া করেন না। সারাক্ষণ রোগীর পিছনে দৌঁড়ান। তাই ঠিক সময়ে খাবার খেয়াল থাকে না। উনার নিজের মেডিক্যাল কলেজের এক প্রফেসর বসতেন ধানমণ্ডির একটা প্রাইভেট ক্লিনিকে। সেখানেই নিয়মিত চেক আপ চলতে লাগলো। উনি আগে থেকেই আমার গিন্নীকে বলে রেখেছিলেন, যে তোমার যেহেতু রক্তস্বল্পতা আছে তাই আমরা হয়তো সিজারে যাবো পরিস্থিতি বুঝে।

নির্দিষ্ট তারিখের প্রায় দশদিন আগে একটা চেক আপ ছিলো। ডাক্তার বলেছিলেন যেন সব রকমের প্রস্তুতি নিয়ে আসা হয়। আমরাও সেই মোতাবেক গেলাম। উনি সব দেখে সিদ্ধান্ত দিলেন, এখনই সিজার করে ফেলা ভালো। অবশেষে সিরিয়াল পড়লো বিকেলে। গিন্নীকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো অপারেশনের জন্য তৈরি করতে। আমি বাইরে অপেক্ষমাণ। পরবর্তীতে শ্বশুর এসে আমার সাথে যোগ দিলেন। আমরা দুজন অপেক্ষা করতে শুরু করলাম। সময় যেন থেমে গেছে। এভাবে অনেক সময় পার হয়ে যাওয়ার পর একসময় অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে একজন মহিলা বের হয়ে আসলেন। উনার হাসিমাখা মুখটা এখনোও আমার চোখে ভাসে। উনি বাইরে এসে আমার গিন্নীর নাম ধরে বললেন, উনার কে কে এসেছেন? আমি আর শ্বশুর একসাথে এগিয়ে গেলাম। উনি হাতের পুটলিটা একটু ফাঁকা করে একটা নবজাতকের মুখ দেখিয়ে বললেন, মেয়ে বাবু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সেই মুহূর্তে অনুভূতি প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। আমি ঠিক কি করবো ভাবছিলাম। ততক্ষণে উনি আমার সদ্যোজাত মেয়েকে নিয়ে আবার অন্য একটা কক্ষের ভেতরে চলে গেলেন। সৌজন্যতা হলো, এই সময় দাইমার হাতে বখশিশ স্বরুপ কিছু দিতে হয়। কিন্তু আমি সেটা করতে পারিনি। অবশেষে যখন আমার গিন্নীকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হলো, আমি হাসপাতালের কাউন্টারে যেয়ে উনার খোঁজ করেছিলাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কাউন্টারে বসা ভদ্রলোকের প্রথম প্রশ্ন ছিলো, “কেন খুঁজতেছেন? কোন অভিযোগ করবেন?” আমি বললাম না, উনি আমার মেয়ের দাইমা তাই উনাকে ধন্যবাদ দিবো। শুনে উনি রেজিস্ট্রার চেজ করে বললেন, উনি এখন ডিউটিতে নেই। আমি মন খারাপ করে চলে আসলাম। তবে পরিকল্পনা আছে ভবিষ্যতে কোন একদিন উনাকে ঠিকই খুঁজে বের করবো আর আমার মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো তার দাইমায়ের।

শহরে এইসব দাইমায়েদের একটা গালভরা নাম আছে “নার্স” যার বাংলা করলে দাড়ায় “সেবিকা” কিন্তু আমার মনে হয় শুধুমাত্র এই একটা শব্দ দিয়ে উনাদের কাজের মূল্যায়ন সম্ভব না৷ উনারা একজন মানুষের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত সাথে থাকেন। একজন মানুষ জন্ম নেয়ার পর প্রথম যে ব্যক্তি নতুন শিশুর আগমন পৃথিবীর মানুষকে জানান তারা হচ্ছেন নার্স। অবশ্য যে সকল নার্স এই কাজটা করেন তাঁদেরকে বলে মিডওয়াইফ। যেটা আমাদের গ্রামের ভাষায় দাইমা। এছাড়াও যখনই কোন মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, তাঁদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করেন একজন নার্স। এমনকি যখন জমে মানুষে টানাটানি শুরু হয়, তখন রোগীর শিয়রে সার্বক্ষণিক জেগে থেকে পাহারা দেন একজন নার্স। সময় করে ঔষধ পথ্য খাওয়ানো, রোগীর আনুষঙ্গিক কাজ সবকিছুতেই হাত লাগান একজন নার্স। রোগীর সুবিধা অসুবিধার কথা সময়ে সময়ে ডাক্তারকে জানিয়ে সেই মোতাবেক ব্যবস্থাপত্র এনে রোগীর দেখভাল করাও তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অনেক সংক্রমণশীল রোগের রোগীর কাছ থেকে তার আত্মীয়স্বজন দুরে সরে গেলেও নিরলস সেবা দিয়ে যান একজন নার্স।

বাংলাদেশের মানুষ কেন জানি স্বাস্থ্যসেবার সাথে জড়িত মানুষদের ভালো চোখে দেখেন না। একেবারে ডাক্তার থেকে শুরু করে নার্স কাউকেই তারা নূন্যতম সম্মান দেখতে কুণ্ঠাবোধ করে। ডাক্তারদের তাও একটা সামাজিক মর্যাদা আছে। কিন্তু একজন নার্সের সামান্য সামাজিক মর্যাদাও একসময় ছিলো না। আমার মনে আছে হুমায়ূন আহমেদের কোনো একটা নাটকে দেখানো হয়েছিলো, একজন মেয়ের বিয়ে ঠিক করা হয়েছে। মেয়ে সবদিক দিয়েই ভালো কিন্তু যখন পাত্রপক্ষ জানতে পারলো এই মেয়ে পেশায় নার্স, তখন বিয়েটা ভেঙে দিলো। সময়ের সাথে সাথে এখন হয়তোবা সেই ধ্যান ধারণাতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু একজন নার্স এখনও সমাজে অপাঙতেয়। পরিবার সমাজ উনাদেরকে দুরদুর করলেও উনারা উনাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। করোনার এই সময়ে সারাদেশের ডাক্তারদের সাথে নার্সেরা একটা বিশাল যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে মানুষকে করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা করতে। কিন্তু তাঁদের নেই নূন্যতম সুরক্ষা। পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) এর প্রসঙ্গ সামনে চলে এসেছে এখন। এখন সারাদেশ জানে যে বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার এবং নার্সেরা কোন প্রকার পিপিই ছাড়াই এতোদিন সেবা দিয়ে এসেছেন।

এইবার একটু অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যাক। আমাদের ছেলেটা ভূমিষ্ঠ হয় ক্যাম্বেলটাউন সরকারি হাসপাতালে। জন্মের পর একজন মিডওয়াইফ এসে রায়ানকে আমাদের কোলে তুলে দিলেন। তাহিয়া আর একজন বাবু পেয়ে মহাখুশি। তখন সেই দাইমা আমাদের বললনে, আমি কি তোমাদের ছবি তুলে দেবো? উত্তরে আমি বললামঃ তাহলে তো খুবই ভালো হয়। এরপর উনি পটাপট আমাদের কিছু ছবি তুলে দিলেন। এরপর আমার গিন্নী এবং রায়ানকে কেবিনে পাঠানোর পর উনারা নিয়মিত এসে খোঁজ নিতেন। রায়ানকে গোসল করানো থেকে শুরু করে আমার গিন্নীকে ঔষুধ খাওয়ানো সবই উনারা করতেন। আর কোন জরুরি দরকার পড়লে যেয়ে ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসতেন। পরবর্তীতে হাসপাতাল থেকে রায়ানের জন্মের বিস্তারিত জানিয়ে একটা ছাড়পত্র দেয়া হয়, যেটা জমা দিলে জন্ম নিবন্ধনের সনদ পাওয়া যাবে। আর জন্ম নিবন্ধনের সনদ পাওয়ার পর সেটা দিয়ে পাসপোর্ট তোলা যাবে। সেই ছাড়পত্রে রায়ানের জন্মের সময় যে ধাত্রী ছিলেন তাঁর নামেরও উল্লেখ আছে। বৈশ্বিকভাবে নার্স বা এই সকল মিডওয়াইফদের সম্মান কতটা তার একটা উদাহরণ দেয়া যাক। অনলাইনে যেকোন একাউন্টের সিকিউরিটির জন্য অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। সেখানে প্রায়ই একটা প্রশ্ন দেখা যায় তোমার জন্মের সময় যে মিডওয়াইফ ছিলো তার নাম কি?

আমাদের পরিবারে আমার শ্যালিকা মিশু একজন নার্স। ঘড়ির কাটার সাথে তাল মিলিয়ে উনি কখনও সকালে, কখনও বিকালে আবার কখনও সারারাত ডিউটি করেন। আবার কখনও এক সাথে দেড় শিফট বা দুই শিফটও ডিউটি করেন। যেহেতু ডিউটির কোনো নির্দিষ্ট টাইম টেবল নেই, তাই উনাদের জীবনযাপন সাধারণ মানুষদের মতো সহজ নয়। আমি শুধু ভাবি, আমাদের কাজ সকাল আটটা থেকে পাঁচটা সপ্তাহের পাঁচদিন। তাতেই আমরা মাঝে মধ্যে হাঁপিয়ে উঠি। কিন্তু উনারা দিন রাত্রি এক করে ডিউটি করে বেড়ান। তারপর আবার পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্বও পালন করেন। তখন সহজেই উপলব্ধি করতে পারি একজন নার্সের জীবন আসলে কতটা কঠিন। সত্যি কথা বলতে গেলে স্বাস্থ্যসেবার সাথে জড়িত সকলের জীবনের গল্পই মোটামুটি একইরকম। কারণ সবকিছুর উপর জীবন বাঁচানো। তাই আসুন করোনা মহামারীর এই দুর্যোগের সময়ে আমরা উনাদেরকে একটু সম্মান প্রদর্শন করি।

আমার গিন্নীর এক বন্ধু মোসাদ্দেক লন্ডনে ডাক্তারি করেন। উনার সাথে মাঝে মধ্যেই কথা হয়। উনার কাছ থেকে জানলাম, পৃথিবীর অনেক দেশ তাদের স্বাস্থ্যসেবার সাথে জড়িতদের জন্য জাতীয়ভাবে হাততালি দিয়ে উৎসাহীত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালের একজন নার্সকে সম্মান তো দূরের কথা তাঁর জীবন ধারণের জন্য পর্যাপ্ত বেতনই দেয়া হয় না। উপরন্তু পানের থেকে চুন খসলে লাঞ্চিত করা হয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)