চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দশ ট্রাক অস্ত্র এবং একজন হেলাল ও একটি অসমাপ্ত গল্প

হেলালের সঙ্গে পরিচয় ১৯৯৬ সালে যখন তারা পুলিশ সার্জেন্ট। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ব্যাচমেট জসিম পুলিশে যোগ দিলে মূলত আমরা তার মাধ্যমেই হেলাল নজরুল ও আলাউদ্দিনসহ কয়েকজন পুলিশ সার্জেন্টের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করি। পরে আমাদের একটি বন্ধুত্বের বৃত্ত গড়ে ওঠে। হেলাল ও নজরুলের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিন সম্পর্ক ছিলো তাদের মৃত্যু পর্যন্ত। নজরুল বছর দুয়েক আগে ফেনীতে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে ঈদের ছুটি শেষে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় সপরিবারে নিহত হয়। এরপর গতকাল হেলাল। একইভাবে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। নজরুলকে ট্রাক পিষে দিয়েছিলো আর হেলাল একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে জীবন হারাল। খবরটা একদিন পর জানলাম। সম্প্রতি আমাদের দেখা সাক্ষাত কমে যাওয়া ও যোগযোগ কম থাকার কারণে খবর জানতে দেরি হল। অনিয়মিত চট্টগ্রাম গেলেও হেলালের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো বছর দুয়েক হয়ে আগে। তবে মাঝে মাঝে ফোনে কথা হত।

চট্টগ্রাম জেটিঘাট থেকে উদ্ধারকৃত দশট্রাক অস্ত্র

বিজ্ঞাপন

২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের আনোয়ারা সিইউএফএল ঘাটে অস্ত্র খালাসের ঘটনা শুনতে পেয়ে সেখানে প্রথমে ছুটে যায় ওই সময় বন্দর পুলিশ ফাঁড়িতে দায়িত্বরত কর্মকর্তা সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ও কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন। তাদের দেওয়া তথ্যে সেদিন অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটে, যা অনেক কর্তা ব্যক্তির গোচরেই ভারতের বিদ্রোহীদের জন্য আনা হয়েছিল বলে পরে আদালতের রায়ে ওঠে আসে। কিন্তু তখনও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে ছিলো না। ফলে তারা অনেক মিথ্যা মামলা, নির্যাতন ও সবশেষে চাকুরিচ্যুত হয়েছিল হেলাল ও আলাউদ্দিন। গোটা জোট সরকারের আমলে তারা দেশের শত্রু হিসেবেই চিহ্নিত ছিলো। অস্ত্র উদ্ধারের পর ট্রলারে থাকা একে-৪৭ রাইফেল চুরি করে বিক্রির অভিযোগে আলাউদ্দিন ও হেলালকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। নোয়াখালীর সুধারাম থানায় একটি অস্ত্র আইনের মামলায় তাদেরকে আসামী করা হয়। প্রায় ২৭ মাস কারাভোগ করার পর জামিন পায়। ২০১১ সালে এই সরকারের আমলে তারা আবার চাকরিতে বহাল হয়। ততদিনে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা সম্পর্কে অনেক গোপনীয় তথ্য প্রকাশ হয়ে গিয়েছিলো। এবং জোট সরকারের অনেক রাঘব বোয়াল ঐ চালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়।

বাংলাদেশ পুলিশের ১৯৯৫ ব্যাচের সার্জেন্ট হেলাল ২০০৪ সালে আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের সময় ছিল চট্টগ্রামের বন্দর থানার কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ। সর্বশেষ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের বন্দর থানার পেট্রোল ইন্সপেক্টর (পিআই-বন্দর) হিসেবে কর্মরত ছিল।

হেলালের প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক গ্রহন

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৬ সালের ২২ ও ২৩ মে তাদের ডাণ্ডাবেড়ি পড়িয়ে সাক্ষ্য দিতে আনা হয়েছিল চট্টগ্রাম আদালতে। গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনে হেলালের একটি পা ভেঙে যায়। হেলাল তার উপর রিমান্ডে নির্যাতনের কথা বলেছে। বলেছে তাকে কীভাবে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। স্বীকার না করলে মেরে ফেলার হুমকিও ছিল। দীর্ঘদিন অকথ্য নির্যাতন সহ্য করে পা ভাঙ্গা অবস্থায় আমার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিলো। তখন তার চাকরি ছিলো না বলে আমাদের সেইসব বকবন্ধুরা অনেকটা উপেক্ষা করে গিয়েছে তাকে। সে বুঝতো। আর বলতো, আমার দিন আসবে রোকন। তার দিন এসেছিলো। কিন্তু সেই দিন বেশি দিন থাকলো না।
২০১০ সালের দিকে সুধারাম থানার মামলায় অব্যাহতি পাওয়ার পর ২০১১ সালে চাকরি ফিরে পায় দুজনেই। এরপর অস্ত্র মামলার পুনঃতদন্তের পর সরকারের প্রধান সাক্ষী করা হয়।
ওই সময় আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে র‌্যাব হেফাজতে নির্যাতনের বিভিন্ন বিষয়ও জানিয়েছিল আলাউদ্দিন ও হেলাল উদ্দিন। ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার ১০ বছর পর ২০১৪ সালে হেলাল ও আলাউদ্দিন প্রেসিডেন্ট পুলিশ মেডেল (পিপিএম) লাভ করে। ২০১৫ সালের দিকে হেলাল পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি পায়।
এরপর হেলালের চাকরি জীবন চলছিলো ঠিকঠাক। হয়তো এই কারণেই আমার সঙ্গে দেখা হতো না। এখন জসিম আছে টঙ্গিতে। নজরুল আর হেলাল নেই। আলাউদ্দিন আছে তার মত। যোগাযোগ তেমন নেই আর। হেলালের সঙ্গে আর দেখা হলো না। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার অনেক গুরুত্ত্বপূর্ণ তথ্য আর ঝালাই করার সময় নেই। একটি জীবনের অপমৃত্যুতে একটি সাজানো সংসারের হাহাকার আমার একটি তথ্যবহুল লেখার চেয়ে বড় নয়। ওর ছেলে মেয়ে দুটির ভবিষ্যত দায়িত্ব নিশ্চয় রাষ্ট্র নেবে। রাষ্ট্রের এক গুরুত্বপূর্ণ সংকটের সময় আমাদের জাতীয় জীবনে অসাধারণ ভূমিকার জন্য হেলালকে অবশ্যই রাষ্ট্র মনে রাখবে। একটি ছোট ঘটনা হলেও চট্টগ্রামের উপর দিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্রের জোগান বন্ধ করার ক্ষেত্রে ঘটনাটি ছিলো যুগান্তকারী। রাষ্ট্রের বড় বড় গোয়েন্দা অফিসার, উর্ধ্বতন কর্তাদের হুমকির মুখে অটল থেকে এই হেলাল আর আলাউদ্দিন দেশের যে উপকার করেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি মাইল ফলক হিসেবে ইতিহাসে বিবেচিত হবে। কিন্তু কষ্টের বিষয় জীবদ্দশায় দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় কার্যকর দেখে যেতে পারলো না হেলাল।
অনেক বিষয় জেনেছিলাম। অনেক তথ্য জানার ছিলো। তার অকাল মৃত্যুর কারণে আর জানা যাবেনা। আর আমারও পরিকল্পিত গ্রন্থটি সমাপ্ত হলো না। শুধু এই দুজনের নিকট থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে একটি অন্যরকম গ্রন্থ প্রকাশের ইচ্ছাটি আমার আরেকটি স্বপ্নের মত নিহত হলো অসময়ে। ওপারে নিশ্চয় এত কষ্টকর দেশ্রপ্রম বা অপবাদ নেই। দেশপ্রেমের মাসুল গুনতে হয় না হাত পা ভেঙ্গে। বৈদ্যুতিক শক খেয়ে! অস্ত্র চোরের অপবাদ নিয়ে। ওপারে ভালো থাকো হেলাল।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন