চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দশ টাকা কেজি চাল বিতরণে আরও স্বচ্ছতা চাই

সরকারের ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’র আওতায় ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে ১০ টাকা কেজি দরে হতদরিদ্র মানুষের মাঝে চাল বিতরণ। ঐ দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুড়িগ্রামের চিলমারিতে গিয়ে এই কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করেন। বর্তমানে সারাদেশের ৫০ লক্ষ হতদরিদ্র মানুষ ১০ টাকা কেজি দরে চাল ক্রয়ের সুবিধাদি ভোগ করছেন। সেদিন ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’র উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাকে বাংলার মানুষ সুযোগ দিলে দেশের এবং দুঃখী মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দিতে চাই।’ দশ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর বিষয়টি নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বেশ কথাও শুনতে হয়। বিশেষ করে ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে বেশ রাজনীতি শুরু করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। বেগম খালেদা জিয়াসহ বিএনপির অনেক নেতাই বিভিন্ন জনসভাতে এ বিষয়টি নিয়ে কটাক্ষ করে বক্তব্যও দিতে থাকেন। বিএনপি এবং জামায়াতের একশ্রেণীর সমর্থকেরা ফেসবুক, ইউটিউবে এ নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচারও চালাতে থাকে।

১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানো নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বহুদিন ধরে বিতর্কও হতে পারে। তবে হ্যাঁ, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইশতেহারে কখনই এমন কোনো সুষ্পষ্ট বক্তব্য ছিল না। নির্বাচনী জনসভায় টাঙ্গাইলসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় শেখ হাসিনা বলেছিলেন তিনি ক্ষমতায় গেলে দশ টাকা কেজি করে চাল খাওয়াবেন। ব্যস অন্যরা ক্ষমতা হারানোর পর এটাকে বড় একটা রাজনৈতিক পুঁজি করেছিলেন। আর তাই কথায় কথায় তারা প্রশ্ন তুলতেন। বিএনপির কোনো কোনো নেতা বিষয়টিকে শেখ হাসিনার প্রতারণাও বলে জিগির তুলে বেড়াতেন। তবে সেই জিগিরের অবসান করতে সক্ষম হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সত্যি সত্যিই ১০ টাকা কেজি দরে গরিব অসহায় দুস্থ মানুষদের তিনি চাল খাওয়াতে সক্ষম হয়েছেন। সরকার প্রদত্ত এই সুবিধাদি পাচ্ছেন গ্রাম এবং শহরের অভাবী ও বঞ্চিত মানুষেরা। এদের সবাইকে ‘ফেয়ার প্রাইস’ কার্ড দেওয়া হয়েছে। প্রতিবার একেকজন ১০ টাকা করে ৩০ কেজি করে চাল দিতে পারবেন। সরকারের নিয়োগকৃত ডিলারদের মাধ্যমে এই চাল দেওয়া হচ্ছে। প্রথমবার চাল দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। আর কদিন পরেই দ্বিতীয় পর্বে চাল দেওয়া হবে।

একথাটি সর্বাংশে সত্য যে, এদেশের হতদরিদ্র, প্রান্তিক, বঞ্চিত, অসহায় জনগণের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষার নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি জননেত্রী শেখ হাসিনা যতোটা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন, বিগত দিনে যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা সেভাবে কখনই অনুভব করেনি। এ কারণে শেখ হাসিনা বরাবরই সাধারণ মানুষের পাশে থাকার বিষয়টি বারবার বলেন, দৃঢ় কণ্ঠেস্বরে উচ্চারণ করেন। এইতো কদিন আগে বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার দিবস সপ্তাহ ২০১৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ কেউ না খেয়ে থাকবে না। প্রতিটি মানুষই খাদ্য নিরাপত্তার মধ্যে থাকবে।’

১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ নিয়ে অনুসন্ধান করেছিলাম মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলাতে। এই উপজেলাতে প্রায় দশ হাজার হতদরিদ্র পরিবার এই সুবিধাদি ভোগ করছেন। অসহায় হতদরিদ্রদের অনেকেই বলেছেন এমন সুবিধা তারা পাবেন কল্পনাই করেন নি। কিন্তু সত্যিই দশ টাকা কেজি দরে তারা চাল পেয়েছেন। শ্রীপুর উপজেলায় মোট আটটি ইউনিয়ন। এই আটটি ইউনিয়নে গড়ে এক হাজারেরও বেশী হতদরিদ্র এই সুবিধাদির আওতায় এসেছে। খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেছে এই উপজেলাতে চাল বিতরণে তেমন কোনো অনিয়ম হয়নি। সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত ডিলাররা ভালোভাবেই চাল বিতরণ করেছে। আবার একই সাথে এও লক্ষ্য করা গেছে মেম্বার-চেয়ারম্যানেরা কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। শ্রীপুরের সব্দালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোল্লা নুরুল হোসেন বলেছেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা যাদের হাতে এই চাল তুলে দিতে বলেছেন তাদের হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছে। কোনো অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়নি।  শ্রীপুর উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাজলী গ্রামের ঋষিপাড়ার অন্ধ চিনিরুদ্দি দাস ফেয়ার প্রাইসের আওতায় মাত্র তিনশত টাকায় ত্রিশ কেজি চাল পেয়েছেন। চিনিরুদ্দির ভাষায়, নিত্য অভাবের সংসারে এটি তার জন্যে বড় এক পাওয়া। চিনিরুদ্দি অনেকদিন ধরে অন্ধ, কাজ করতে পারেন না। স্ত্রীর সহযোগিতা ছাড়া চলতে পারেন না। এই ওয়ার্ডের মেম্বর হান্নান মোল্লা বলেন, চাল দেওয়ার দিন যেনো উৎসব শুরু হয়। মানুষ চাল নিয়েছেন আর প্রাণভরে শেখের মেয়ের জন্যে দোয়া করেছেন।

তবে সবজায়গাতে এই একই চিত্র দৃশ্যমান নয়। ১০ টাকার চাল বিতরণ নিয়ে অনেক জায়গাতেই অনিয়মের অভিযোগ মিডিয়াতে উঠে এসেছে। গ্রাম-গঞ্জের অনুসন্ধানী অনেক সাংবাদিক হাতে কলমে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন ১০ টাকার চাল যাদের প্রাপ্য তাদের বদলে অনেক স্বচ্ছল পরিবারের মানুষ এই চাল পেয়েছে। বিশেষ করে দেশের উত্তরবঙ্গের অনেক জায়গাতেই এই অনিয়ম ঘটেছে। আমি মনে করি, যারা তুলনামূলক স্বচ্ছল হয়েও ১০ টাকার চাল গ্রহণ করেছেন তারা বিবেক বিবেকবর্জিত মানুষ। তারা অবশ্যই বড় ধরনের অপরাধ করেছেন। কেননা সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবেই বিধিমালা প্রদান করা হয়েছে যে, কারা এই চাল পাওয়ার সুবিধা গ্রহণ করবেন। তবে এটা সত্য যে, এ ধরনের সুবিধা যখনই প্রদান করা হয়েছে তখন সমাজের একশ্রেণীর অসৎ চক্র জাল-জালিয়াতি করতে কুণ্ঠিত বোধ করেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। সংসদের দ্বাদশ অধিবেশনে সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচনের আগে নির্বাচনী বক্তৃতায় দশ টাকা কেজি চালের কথা বলেছিলাম। তারই ধারাবাহিকতায় অস্বচ্ছল, হতদরিদ্রদের মাঝে ১০ টাকা কেজি মূল্যে চাল বিতরণের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। হতদরিদ্রদের জন্য দশ টাকা কেজি মূল্যের চাল বিতরণে কোনো অনিয়ম হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

অনিয়ম প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, প্রতি ৫০০ জনের জন্য একজন ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। ডিলার এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা হতদরিদ্রদের তালিকা করে সেই অনুযায়ী চাল বিতরণ করবে। এই তালিকা প্রস্তুতকালে কোনো গড়মিল বা অনিয়ম যেন না থাকে সংসদ সদস্যরা সেই তালিকা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখবেন। সরকারি কর্মকর্তারাও যেন পরীক্ষা করে দেখেন। যদি কেউ তালিকায় অনিয়ম করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিলারদের ডিলারশিপ বাতিল করা হবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাদের প্রয়োজন তাদের নাম না থেকে যদি স্বচ্ছল কারও নাম থাকে তাহলে ঐ স্বচ্ছলদের নাম বাতিল হবে এবং অস্বচ্ছলদের নাম দেওয়া হবে।

আবারো বলছি প্রধানমন্ত্রীর কমিটমেন্ট নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তার উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য পরিষ্কার। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা সিন্ডিকেটকে ভাঙবে। চাল বিতরণ নিয়ে পত্র পত্রিকায় যে অনিয়মের খবরগুলো বেরিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী অনিয়মের বিরুদ্ধে যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন প্রশাসনের এবং জনপ্রতিনিধিদের অবশ্যই উচিত সেগুলো যাচাই বাছাই করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একইভাবে আগামী দিনগুলোতে চাল বিতরণের ক্ষেত্রে যাতে আরও অনিয়ম না হয় সে ব্যাপারে এখনই সজাগ ও সতর্ক হওয়া। একই সাথে চাল বিতরণের ক্ষেত্রে হেড কাউন্টিং-এর বদলে দারিদ্র অঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

বর্তমান সরকার প্রদত্ত ১০ টাকার চাল অবশ্যই দরিদ্র মানুষের জীবনে এক নতুন স্বস্তির আস্থা তৈরি করেছে। কিন্তু আমাদের অনেকের কাছেই অজানা রয়েছে যে, আমাদের কিছু দারিদ্র্য পকেট রয়েছে যেখানে তুলনামূলক হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। বিশেষ করে চরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল, পাহাড়ী অঞ্চল-এসব এলাকাতেই দারিদ্র মানুষের বসবাস সবচেয়ে বেশি। এর বাইরে বড় একটি অংশ রয়েছে যারা শহরের ভাসমান দরিদ্র মানুষ। যারা নগর দরিদ্র (আরবান পুত্তর) বলে পরিচিত। ১০ টাকা কেজি চালের সুষম বিতরণের ক্ষেত্রে এসব অঞ্চলকে অবশ্যই বিশেষ বিবেচনায় রাখতে হবে। যদ্দুর জানা গেছে, প্রতিটি ওয়ার্ডে এবং ইউনিয়নে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ‘ফেয়ার প্রাইস’ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু শুধু যদি জনসংখ্যার ভিত্তিতে ফেয়ার প্রাইস কার্ড দেওয়া হয় তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই বেশি হতদরিদ্র প্রবণ ওয়ার্ড বা ইউনিয়নের অনেকেরই এই সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

যে যত কথাই বলুক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ টাকা কেজি ধরে চাল খাওয়ানোর জন্যে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটা তিনি সত্যিই বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেকেই এখন আর কটাক্ষ করতে পারবেন না। অহেতুক তর্কও করতে পারবেন না। বোধ হয় বিষয়টি নিয়ে আর কথা বলতে পারবেন না সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও। অনিয়ম আর অস্বচ্ছতাটুকু বাদ দিলে এটিই সত্য-হতদরিদ্ররা ১০ টাকা কেজি দরে চাল পাচ্ছেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন