চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ত্বাহার ডিসেম্বর

ডিসেম্বর এলেই আম্মুর জ্বর হয়,

বুকে নীল কষ্টের অসম্ভব দাপাদাপি…
কার বইয়ে যেন কবিতাটা পড়েছিল ত্বাহা। ঠিক মনে করতে পারছে না। তবে স্কুলের মুক্তিযুদ্ধ কর্নার থেকে নেয়া একটা বইয়ে এই কবিতাটা ছিল ওর মনে আছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ত্বাহা নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করে। সে সেদিন পাপাকে বলছিল, জানো পাপা আমরা না অনেক লাকি।
পাপা জানতে চায় কেমন লাকি।

ত্বাহা পাপার বড় বড় চোখ দুটোর দিকে বড় বড় করে তাকিয়ে বলল, তোমাদের সময় কি স্কুলে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার ছিল?
পাপা মাথা নেড়ে বলল, না তো।

ছিল না বলেই তো তোমরা মুক্তিযুদ্ধের মিথ্যা ইতিহাস জেনেছ। যে যেভাবে পেরেছে তোমাদের মিথ্যে ইতিহাস শুনিয়েছে।
পাপা ত্বাহার কথায় সায় দেয়। তুমি ঠিক বলেছ আম্মু। আমরা তো একুশ বছর মিথ্যে ইতিহাস জেনেছি। মুক্তির মহানায়কের নাম আমাদের উচ্চারণ করতে দেয়নি। একুশ বছর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উল্টোদিকে চালিত করা হয়েছে। পাপা আমি তো শুনেছি তোমরা তরুণরা নাকি অনেক প্রতিবাদী। তা তোমরা এর প্রতিবাদ করোনি।

করব না কেনো! করেছি। আমরা লেখক কবিরা আমাদের লেখায় কৌশলে মুক্তির মহানায়কের কথা বলেছি। আমাদের দেশের একজন নামকরা শিশুসাহিত্যিক আছেন। কাইজার চৌধুরী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ককে তাঁর শেমুর গল্পে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

শেমুর মানে কী পাপা, ত্বাহার জিজ্ঞাসা।
শেমুর মানে শেখ মুজিবুর রহমান। আমাদের মুক্তির মহানায়ক। আটষট্টি হাজার গ্রামের একটি গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় তিনি জন্মেছিলেন বলেই আজ আমরা স্বাধীন।

আর আমরা স্বাধীন বলেই স্বাধীন দেশের মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পারছি। পাপার কথার সঙ্গে যোগ করে ত্বাহা।
পাপা ত্বাহার গাল টিপে বলেন, এই তো আমার লক্ষ্মীসোনা। তা ত্বাহামনি তুমি আর কী বই পড়েছ।

আমি পড়েছি ফারুক হোসেনের ‘গল্পে বঙ্গবন্ধু’ বইটি। জানো পাপা এই বইয়ে না মোট চৌদ্দটি গল্প আছে। সবগুলো গল্পই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। অনেক চমৎকার করে লেখক বঙ্গবন্ধুকে তাঁর প্রতিটি গল্পে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ‘বঙ্গবন্ধু ও রিমির ছবি আঁকা’ নামের গল্পটি অসাধারণ।

‘বাবা বললেন, তুমি এমন একটা বিষয় খোঁজো, যার মধ্যে সংগ্রাম আছে, ত্যাগ আছে, স্বাধীনতার ছবি প্রতিফলিত হয়, যা দেখলেই এই তিনটির ছবি ভেসে উঠবে,তাহলে সেটা এঁকে আমাদের দেখাতে পারো।

রিমি যেন একটু পথ খুঁজে পেল। আবার ভাবতে লাগল একমনে। এরকম কী আছে, যার মধ্যে এই তিনটিই প্রতিফলিত হয়।
বাবা বললেন, আমি আরেকটু ধরিয়ে দিতে চাই তোকে, শোন মনোযোগ দিয়ে। আমার কথার জবাব দিস একটা একটা করে-
কোন মানুষটির জন্য আমরা স্বাধীনতা পেলাম?
রিমি লাফিয়ে উঠে বলল, বঙ্গবন্ধু।

কোন মানুষটির জীবনটিই সংগ্রাম-আন্দোলনের জীবন। সর্বোচ্চ সংগ্রামী। যেই সংগ্রামের জন্য আজ আমাদের দেশ, মাটি, পতাকা এবং জাতীয়তা?
রিমি আবার লাফিয়ে উঠে বলল, বঙ্গবন্ধু।

কোন মানুষটির পুরো জীবনই শুধু ত্যাগ আর ত্যাগ। আর সেই ত্যাগ শুধু আমাদের স্বাধীনতার জন্য। আমাদের দেশের জন্য। যার জীবনের বড় অংশই কেটেছে জেলে। মাঠে, সংগ্রামে। প্রতিবাদে।
রিমি আবারও পেরে ওঠার খুশিতে বলল, বঙ্গবন্ধু।

তাহলে তুই বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকলেই আমরা সেই ছবিতে স্বাধীনতা, সংগ্রাম আর ত্যাগকে একসঙ্গে দেখতে পাব।
রিমির আর বুঝতে বাকি রইল না কিছুই। রং-তুলি, কাগজ নিয়ে বসে পড়ল আর আঁকতে শুরু করল বঙ্গবন্ধুর ছবি।’
বাহ্, আসলেই তো দারুণ গল্প। বইটা আমাকে পড়তে দিও।
আচ্ছা বইটা আমি স্কুল থেকে কাল তোমাকে এনে দেব।

ত্বাহামনি।
জ্বী পাপা।
তুমি কি মুক্তিযোদ্ধা দেখেছ।
দেখেছি।
কোথায় দেখলে পাপা।

কেনো নানাভাইকে দেখেছি। তাছাড়া একদির আম্মুর অফিসে নানাভাইয়ের বয়সী মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি।
আমি সেদিন আম্মুর অফিসে গেলাম সজীব আঙ্কেলের সাথে। আমি চেয়ারে বসে মোবাইল দেখছি আর আমার প্রিয় লেক্সাস খাচ্ছি। হঠাৎ দেখি আম্মু বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি ভাবলাম হয়তো আম্মুর কোনো স্যার এসেছেন। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে সে রকম কাউকে তো দেখছি না। নানাভাইয়ের বয়সী একজন লোককে দেখলাম। মাথা ভরতি সাদা চুল, বয়স্ক হলেও প্রত্যয়দীপ্ত চেহারা। উনি তো আর আম্মুর স্যার হতে পারেন না। তাহলে আম্মু কেন উঠে দাঁড়াল।

আম্মু আমার মনের কথা বোধহয় বুঝতে পারল। আমার সঙ্গে উনার পরিচয় করিয়ে দিল। বরল, ত্বাহামনি উনিও তোমার একজন নানাভাই। বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের দেশ স্বাধীন করতে, আমাদের মুখে হাসি ফোটাতে একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন।

উনি বিদায় নিলে আমি আম্মু আরো বললেন, জানো ত্বাহা উনাদের জন্যই আজ আমরা বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে চলতে পারি। নিজেকে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে পারি। তাই আজ তাঁর খারাপ সময়ে আমাদের তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে। তাঁর মুখে হাসি ফোটাতে হবে।আমাদের সরকার তাঁদের রাষ্ট্রীয় ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছে।
তোমার নানাভাইও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সেটা তো তুমি জানো ত্বাহা।
জ্বী পাপা। আমি সেটা জানি।

তুমি তো আমার সঙ্গে আমার নানাবাড়ি বেড়াতে গেছ। তখন তুমি অনেক ছোট। তাই তোমাকে তোমার নানাভাইয়ের বীরত্বের স্মৃতিচিহ্ন তোমাকে সেদিন দেখালেও তোমার মনে থাকার কথা না।

নানাভাই আমাকে বলেছেন যদি কোনোদিন তোমার সঙ্গে মোহনগঞ্জ যাই তবে যেন ঠাকুরাকোনা ব্রিজটা দেখে আসি।
তাহলে তুমি ঠাকুরাকোনা ব্রিজ সম্বন্ধে জানো।

বিজ্ঞাপন

না মানে পাপা, অতটা জানি না। শুধু শুনেছি ঠাকুরাকোনা ব্রিজ অপারেশনে নানাভাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তুমি যাবে ঠাকুরাকোনা ব্রিজ দেখতে।
তুমি নিয়ে যাবে পাপা।
যাব। পরশু শনিবার আমার ডেঅফ। সেদিন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ব। ময়মনসিংহ থেকে তোমার নানাভাইকে সঙ্গে নিয়ে নেব।
পাপা দারুণ হবে। আমি ঠাকুরাকোনা ব্রিজে দাঁড়িয়ে শুনব নানাভাইয়ের বীরত্বের কাহিনি।

শনিবার সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পাপার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে ত্বাহা। নাস্তা ওরা ময়মনসিংহে গিয়ে খাবে। একটু দেরিতেই নাস্তা খেতে পছন্দ ত্বাহার।

সকাল আটটায় ময়মনসিংহে পৌঁছে যায় ওরা। ড্রাইভার সুমন আংকেল জয়দেবপুর চৌরাস্তার পর তো একশ স্পিডে গাড়ি চালিয়েছেন। ত্বাহার মনে হচ্ছিল ওরা যেন উড়ে চলছে। আসলে নতুন মডেলের এক্সিও গাড়িগুলো খুব হালকা। বেশি স্পিডে চালালে মনে হয় যেন বাতাসে উড়ছে।

ময়মনসিংহ পাটগুদাম ব্রিজের মোড়ে ত্বাহার নানাভাইয়ের বাসা। নানাভাই নানুভাই থাকেন নিচতলায়। দোতলায় থাকেন সালাম মামা ও দিদিমনিরা।

ত্বাহাকে দেখে তো নানাভাই নানুভাই অবাক। পাপা নানাভাইকে বললেন ঝটপট তৈরি হয়ে নিতে। নাস্তা খেয়েই বেরোতে হবে।
ময়মনসিংহ থেকে ঠাকুরাকোনার দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। ওরা গাড়িতে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে গেল। আরো আগে যেতে পারত। অবশ্য নেত্রকোনায় একটু চা বিরতি ছিল।

নেত্রকোনা স্টেশনের পরের স্টেশন বাংলা। বাংলা স্টেশনের পরের স্টেশন ঠাকুরাকোনা। বাংলা স্টেশন থেকে বেশ কিছুদূর এগোলেই পড়বে ঠাকুরাকোনা ব্রিজ। মগড়া নদীর উপর এই ব্রিজটি।

ব্রিজের উপর উঠেই কেমন যেন আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন নানাভাই। ত্বাহা গিয়ে দাঁড়ায় নানাভাইয়ের পাশে।
নানাভাই তুমি এই ব্রিজ অপারেশনের গল্পটা এখন বলতে পারো।

নানাভাই ঘড়ির দিকে তাকালেন। তারপর কাকে যেন ফোন করে জেনে নিলেন কখন এখান দিয়ে আবার ট্রেন যাবে।
নানাভাই রেললাইনের পাটাতনের উপর বসে পড়লেন। ত্বাহাকে বসালেন পাশে। তারপর শুরু করলেন স্মৃতিচারণ…
আমাদের অপারেশন ঠাকুরাকোনা রেলব্রিজ ভেঙে দেয়া। যাতে পাকবাহিনী ঠাকুরাকোনা, বারহাট্টা, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দাসহ আশপাশের এলাকায় যেতে না পারে।

আমরা ১নং, ২নং ও ৩নং প্লাটুন মিলিয়ে প্রায় ৬০ জন গেরিলা ঠাকুরাকোনা ব্রিজ অপারেশনের জন্য একত্রিত হই। ফকিরের বাজার সংলগ্ন এলাকায় হাইড আউট হয়। ব্রিজ ভাঙা ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা রেকি করার জন্য আবদুল জব্বার (কোম্পানি ২ র.ব.), সামছুল ইসলাম ও আমি হাবিব মাস্টার বাদাম ব্যবসায়ী সেজে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে টার্গেটে পৌঁছাতে কয়েকবার নৌকায় পার হতে হয়েছে আমাদের। গোদারাঘাটে পৌঁছে পার হওয়ার মতো করে বসে থেকে ব্রিজ রেকি সম্পন্ন করে আবার হাইড আউটে ফিরে আসি এবং ব্রিজ ভাঙার প্রস্তুতি নেই। সিদ্ধান্ত হয় অপারেশনে সিজার কাটিং পদ্ধতি প্রয়োগ করার।

আমরা চার ভাগে নিজেদের প্রস্তুত করি। প্রথম ভাগে ডেমুলেশন সেকশন ১টি, দ্বিতীয় ভাগে কাট অব পার্টি ১টি, তৃতীয় ভাগে চার্জ পার্টি ১ এবং চতুর্থ ভাগে চার্জ পার্টি ২। ডেমুলেশন পার্টি মূলত ব্রিজ ভাঙার ইঞ্জিনিয়ারিং পার্টি। এ দলে আমাকে ছাড়াও ছিল সামছুল ইসলাম, ইয়াহিয়া খান, আবদুল হাই আকন্দ, আবু আক্কাছ, মাসুদ ও জুলহাস।

কাট অব পার্টিতে রহমত আলীর নেতৃত্বে ৬/৭ জনের একটি দল রেললাইনে অ্যান্টি ট্যাংক মাইন পুঁতে সুবিধামতো স্থানে অবস্থান নিয়ে অপেক্ষা করবে। ১নং প্লাটুনে ২ র.ব. আবদুর রহিম রতনের নেতৃত্বে আবদুর রহিম বাদশা, মাহফুজুল ইসলাম খান, হাফেজ মহিউদ্দিন, সুভাষ রক্ষিত, মফিজুল ইসলাম খোকা, ওয়াজউদ্দিন, রফিকুল ইসলাম বাবুল, এ বি সিদ্দিক, জাহান আলী, কালাম, খলিল, সিদ্দিক আহমদ প্রমুখ ব্রিজ সংলগ্ন বাংকার চার্জে এবং ৩নং প্লাটুনের ২ র.ব. আবু সিদ্দিকের নেতৃত্বে চার্জ পার্টি ২ (নেত্রকোনা এলাকার যোদ্ধারা) বাজারের রাজাকারদের অবস্থানে চার্জ-এভাবে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। মূল দলের নেতৃত্বে নেত্রকোনার কোম্পানি ২ র.ব. আবদুল জব্বার। অবশ্য তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনের গাইডও ছিলেন।

১২ জুলাই রাতে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলা ও ঠাকুরাকোনা রেলস্টেশনের মাঝামাঝি স্থানে কাট অব পার্টি ও ডেমুলেশন সেকশন নৌকা থেকে নেমে যায়। ডেমুলেশন দল রেললাইন অতিক্রম করে এক্সপ্লোসিভ ও যাবতীয় ডেমুলেশন দ্রব্যাদিসহ নদীর পাড়ে পৌঁছে দক্ষিণ দিক থেকে ব্রিজে উঠে। কেননা বাংকারের মুখ ছিল উত্তর দিকে।

ফজরের আজানের পরই অ্যাকশন শুরু হয়। ব্রিজে এক্সপ্লোসিভ বাঁধা হয়। কর্টেক্স-ডেটোনেটর ফিউজ যথাস্থানেই স্থাপিত হয়। ১২০ পাউন্ড হাই এক্সপ্লোসিভ টিএনটি ব্যবহার করা হয়। সব কাজ ঠিকঠাক মতো করতে আমাদের সময় লাগে আধঘণ্টা। কাজ শেষে ব্রিজের পূর্ব পাড়ে রাস্তার পূর্ব পাশে সকলের অবস্থান দেখে নিয়ে আমি ও সামছুল ইসলাম ফিউজে আগুন ধরিয়ে দ্রুত ব্রিজ পার হয়ে যাই। এ সময় আমরা আকাশে একটি হলুদ রঙের বিমান (কেটি হক) ব্রিজের উপর এসে নিচু হতে দেখি। ঠিক তখনই বিকট শব্দে ব্রিজটি ভেঙে পড়ে ঝুলে থাকে। আরো ৬ পাউন্ড এক্সপ্লোসিভ হলে ব্রিজটি নদীতে পড়ে যেত। পরে আমরা জানতে পারি ঠাকুরাকোনা স্টেশনের কন্ট্রোল রুম থেকে ব্রিজ আক্রান্তের খবর নেত্রকোনা হয়ে ঢাকায় পৌঁছলে সেখান থেকে এই হলুদ বিমানটি পাঠানো হয়েছিল। ব্রিজ ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে বিমানটি আহত পাখির মতো উল্টোদিকে ছুট দেয়। বিমানটি আর ফিরে আসেনি। আমরা ব্রিজ বাঙার আনন্দে আত্মহারা হয়ে ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিতে দিতে এক ঘণ্টার রাস্তা পনেরো ষোলো মিনিটে অতিক্রম করে বাউশি বাজারে পৌঁছি। সেদিনের সেই আনন্দের কথা মনে হলে আমি বিশ বছরের টগবগে যুবক হয়ে যাই।
নানাভাই কথা বলা থামিয়ে ত্বাহার দিকে তাকালেন। এই বুঝি প্রথম ত্বাহা কারো কথা এত সময় ধরে শুনল একটাও প্রশ্ন না করে।
ত্বাহা নানাভাইয়ের চামড়া কুচকানো হাতটা শক্ত করে ধরল। অনেকক্ষণ ধরে থাকল। এই হাতেই ওর নানাভাই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। শত্রুর সঙ্গে লড়াই করেছেন।এই হাত ত্বাহাদের জন্য ছিনিয়ে এনেছে সবুজের বুকে লাল সূর্যের রক্তিম পতাকা।
ত্বাহা কোনোদিন যা করেনি আজ তাই করল। নানাভাইয়ের হাতটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে আলতোকরে চুমু খেল।
ত্বাহা দেখল নানাভাইয়ের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। অন্য সময় হলে ত্বাহা নানাভাইকে বলত চোখের পানি মুছে ফেলতে। আজ আর কিছুই বলল না। সে বুঝে গেছে এই জল ব্যথা বেদনার নয়, এই জল আনন্দের।
দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল। নানাভাই ত্বাহাকে বললেন, চল নানাভাই এবার যাই। ট্রেন আসছে।
ত্বাহার কী যে আনন্দ লাগছে সে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছে না। ও যদি সাঁতার জানত তবে আনন্দে আত্মহারা হয়ে মগড়ার জলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কিছুক্ষণ আগে যেমন বেশ কজন ছেলে একটু পর পর রেলব্রিজ থেকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
অবশ্য আরো একটা কারণে ত্বাহার আজ আনন্দ হচ্ছে। স্কুলে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলা প্রতিযোগিতায় এখন থেকে অন্য কারো বীরত্বগাথার কথা বলতে হবে না। সে ওর নানাভাইয়ের বীরত্বের কাহিনি বলবে।

ডিসেম্বরের দিন বুঝি তাড়াতাড়ি বিদায় নেয়। সন্ধ্যা আসে কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে। কীভাবে অনেকটা সময় কেটে গেল টের পায়নি ত্বাহা। পাপা ওদের গল্প বলার ফাঁকে কোথায় যেন গিয়েছিলেন। ওদের গল্প শেষ হওয়ার পরপরই চলে এসেছেন।
ত্বাহামনি বাড়ি যাবে না। পাপা হাসিমুখে জানতে চান।

ত্বাহা পাপাকে বলে যাব তো। কিন্তু দেখো পাপা শুধু গল্পই শোনা হলো। একটাও ছবি তোলা হলো না। প্লিজ পাপা আমাদের কটা ছবি তুলে দাও না।

পাপা হাসতে হাসতে ত্বাহামনির পাশে এসে দাঁড়ালেন। মোবাইলে তোলা ছবিগুলো দেখিয়ে বললেন, এটা তবে অন্য ত্বাহামনির ছবি তাই না।

ছবি দেখে ত্বাহা অবাক হলো। কখন তুললে। আমি তো বুঝতে পারিনি।

মামনি, তুমি এতই মুগ্ধতা নিয়ে নানাভাইয়ের গল্প শুনছিলে যে আমি কখন ছবি তুলেছি তুমি টেরই পাওনি।
পাপা ত্বাহার বা হাতটা নিজের বগলদাবা করে বললেন, তুমি বলছিলে না আম্মু বীর মুক্তিযোদ্ধা কাউকে দেখলে তাঁকে অনেক সম্মান দেন। এই যে তোমার নানাভাই, এই নানাভাইকে আম্মু অনেক অনেক ভালোবাসেন। আর যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা তাঁরা তো নানাভাইয়ের বন্ধু, আমাদের অস্তিত্বের শেকড় যে তাঁরাই বপন করেছেন, তাঁদের তো সম্মান জানাতেই হবে। ভালোবাসতেও হবে। তাঁদের ঋণ কোনোদিন শোধ হবার নয়। তুমি তো এই গানটা খুব ভালো করেই জানো…
‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে
বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা
তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না
না না না শোধ হবে না
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাত কোটি মানুষের
জীবনের সন্ধান আনলে যারা
সে দানের মহিমা কোন দিন ম্লান হবে না
না না না ম্লান হবে না…’

অনেক অনেক দিন পর আজ ত্বাহার একটা ভালো দিন কাটল। পাপাকে মনে মনে অনেক ধন্যবাদ দিল। আর মনে মনে রেখে দিল ঢাকায় বাসায় ফিরেই পাপাকে লম্বা একটা পাপা দিবে।

ত্বাহারা গাড়িতে উঠে বসতেই সুমন আংকেলগাড়ি স্টার্ট দিলেন। গাড়ি ছুটে চলল ঢাকার দিকে। পাপা সুমন আংকেলকে বললেন নেত্রকোনা বাজারে গাড়ি থামাতে। ওখান থেকে বালিশ মিষ্টি নিতে হবে।

সুমন আংকেল মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ত্বাহা বসে আছে নানাভাই ও পাপার মাঝখানে। ওর মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে ওর মতো ভাগ্যবতী আর কেউ নেই। দুই পৃথিবীর মাঝখানে পরম শান্তি ও নির্ভরতায় ওর এগিয়ে চলা।

বিজ্ঞাপন