চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তোমার সাহসের কাছে ওরা পরাজিত

ছোট একটা মেয়ে, কলেজে পড়ে, বয়স এখনো ১৬ পার হয়নি বোধ হয়। কিশোরীর উচ্ছাস যার, প্রজাপতির মত উড়ে বেড়ানোর বয়স, পৃথিবীর তাবৎ বিষয়ে আগ্রহ, স্কুল কলেজের সাথীদের সঙ্গে যার হুল্লোড় করার বয়স, এখনো যার বাইরে কঠিন নিষ্ঠুর দুনিয়ার ব্যাপারে নেই কোন খবর। লেখাপড়া ও আনন্দ করে সময় কাটানোর বয়স। উচ্ছল, প্রাণবন্ত এই মেয়েটিকে কলেজ থেকে বাসায় ফেরার পথে সইতে হল চরম নোংরামী।

রাজধানীর বাংলামোটর বাস স্টপে বাসের অপেক্ষায় ছিল মেয়েটি। ৭ মার্চের সমাবেশ শেষে মিছিল করে ফেরার পথে মিছিলের একদল যুবক মেয়েটিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। কলেজের ইউনিফর্ম ছিঁড়ে ফেলে, থাপ্পড় দেয়, তার শরীরে হাত দেয়, ১৫/২০ জন যুবক একটা মেয়েকে প্রকাশ্যে মলেস্ট করছে, কেউ ছিল না প্রতিবাদ করার, ছিলো একদল ভিডিও ও ছবি তোলা পাবলিক। শুধু একজন ছিল, উনি একজন পুলিশ, তিনি ওই মলেস্ট চক্রের মধ্যে ঢুকে মেয়েটিকে বের করে আনে। বাসে উঠিয়ে দেন। বাকি পথটি মেয়েটি নিরাপদে ফেরে। ৭ মার্চ, শুধু এই মেয়েটিই না, অনেক মেয়েই নিগৃহীত হয়েছে, অনেকেই ফেসবুকে তার ওয়ালে লিখে জানিয়েছে, অনেক হয়ত গোপন করেছে, হয়ত নিজের কাছ থেকেও গোপন করতে চাইছে, তার সাথে হয়ে যাওয়া নোংরা ঘটনা।

‘নিগৃহীত মেয়ে’ তার নাম লিখছি অমলিন। এই নোংরা হাত তোমার শরীর স্পর্শ করেছে, তোমাকে আঘাত করেছে, কিন্তু তোমার সাহসের কাছে ওরা পরাজিত, তোমায় বলি স্যালুট। তুমি এই কথা লিখে জানিয়ে তোমার সাহসী, স্বাধীনচেতা মনোভাবের পরিচয় দিয়েছো, এই মনোভাব যেন মলিন না হয়।

তবে হ্যাঁ এটা সত্যি, জানিনা তোমার প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিচার হবে কিনা? না হবার সম্ভবনাই বেশি। কারণ কি জানো, আমাদের দেশে এখনো মেয়ে মানেই পাপের সাগর! মেয়ে মানুষ নরকের দুয়ার। মেয়েরা মানুষ নাকি! মেয়েরা বাইরে কেন বের হবে, ঘরের আসবাবপত্রের মত ঘরের এক কোনে পড়ে থাকবে। মুখ বন্ধ করে থাকবে। খেতে দিলে খাবে, শুতে দিলে শোবে। বসতে দিলে বসবে। নারীর কাজ বছর বছর বাচ্চা জন্ম দেয়া ও লালন-পালন করা। স্বামীর পদসেবা করা, কারণ স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেশত। বাপের বাড়ি যতদিন থাকবে, বাপ ভাইয়ের সেবা করে কাটাবে। ঘরের কাজ করবে, রান্না করবে, ছোট ভাই-বোনকে মানুষ করবে। পড়াশোনা করে কী হবে? সেই তো হেঁশেল ঠেলতে হবে। চিঠি লেখা ও পড়া জানলেই তো যথেষ্ট, পুরুষদের সাথে এক সাথে লেখা-পড়া, গা ঘেঁষাঘেষি করে কাজ করারই বা কি দরকার? বাজে মেয়েরাই যায় কলেজ ভার্সিটিতে ছেলেদের সাথে গা ঘেঁষে বসতে, লেখা-পড়ার নামে নষ্টামি করতে। বাইরে কাজ করা বা লেখা-পড়া করা মেয়েদের রাস্তায় তাই উত্যক্ত করা জায়েজ!

নারীতুমি মেয়ে হয়ে বাইরে বের হবে আর মলেস্ট হবে না তাই কি হয়! আগে চোখ দিয়ে, নোংরা কথা বলে মলেস্ট করতো এখন অনেক উন্নয়ন হয়েছে, তাই এখন মবড মলেস্ট করে দিন দুপুরে রাজপথে।

তুমি কেন বাইরে বেরিয়েছো মেয়ে?

তুমি কেন ঘরের বাইরে পা দিয়েছো মেয়ে?

আহা তোমার জন্য একদল যুবক তাদের নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেরার পথে কুপথে চলে গেল। তোমাকে দেখে ওদের পাপবোধ জাগল।

Advertisement

আহা মেয়ে তুমি কেন একদল ছেলের ঈমান নষ্ট করলে!

একা একটা মেয়ে হয়ে তুমি ১৫-২০ জনের একদল ছেলের চরিত্র নষ্ট করতে প্ররোচিত করেছো! না, শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে। তোমাকে সামাজিক, মানসিক, শারীরিক হেয় করার পাশাপাশি, তোমার পুরো পরিবারকে হেনস্তা হতে হবে। পদে পদে তোমায় মলেস্ট করবে, এই রাষ্ট্র, এই দেশের আইন। আমাদের দেশের আইন নিরাপরাধীকে শাস্তি দেয়। অপরাধী বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

আমাদের দেশের অধিকাংশ মেয়ে মলেস্ট হলেও মুখে কেন নিজের কাছে, আয়নার সামনেও স্বীকার করতে চায় না। সেখানে তুমি ফেসবুকে দিয়েছো তা অনেকের হজম হবার নয়। পুরুষের পাশাপাশি অনেক নারীও তোমার এই ঘটনার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করবে। তুমি মিথ্যাবাদী প্রমাণ করার সব অপচেষ্টা চলবে। হাল ছেড়ো না ছোট মেয়ে, তোমার সাহস তোমার দৃঢ়চেতা মনোভাব ধরে রেখো। অন্যায়কারীরা মাথা নত করবেই একদিন। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের প্রধান ও স্পীকার নারী হলে কী হবে এই দেশতো নারীবান্ধব না। এই দেশের অধিকাংশ পুরুষের কাছে নারী শুধুমাত্র ভোগের বস্তু, যেকোন ভাবে চায় নারীকে দাবিয়ে রাখতে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে ভিডিও পৌঁছেছে। যারা তোমায় আইডি ফেক বা তুমি মিথ্যা বলেছে, তাদের গালে গায়েবি চপেটাঘাত পড়েছে। আশায় থাকলাম তুমি সুবিচার পাও। যা তোমার মনের আঘাতের উপর একটু স্বস্তির প্রলেপ পরাক।

পৃথিবীর এতো দেশে গিয়েছি মানুষ দেখেছি শুধু, রাত-বিরাতে একা ঘুরেছি পাইনি শুকরের দেখা, পেয়েছি মানুষ শুধু, ভীড় ঠেলে হেঁটেছি, ভীড় বাসে চড়েছি কিন্তু পাইনি শুকরের দেখা, মানুষ ছিল শুধু মানুষ। আমাদের দেশে ১২/১৪ বছর আগেও আমি অনেক রাতে কাজ থেকে একা ফিরেছি, একা একা এ শহর থেকে ও শহরে কাজে গিয়েছি। অচেনা অজানা মানুষদের সাথে কাজ করেছি কিন্তু শুকরের দেখা তখন পাইনি, আজকাল যেন শুকর গেছে বেড়ে, দেশটা হয়ে যাচ্ছে শুকরের দেশ।

২০১৮ সালে বাংলাদেশের মেয়েদের অবস্থান কোথায়? পদে পদে অবহেলা, অসম্মান, ধিক্কার, অপমান। অনেকের ভাগ্য ভাল তাদের কটু কথা সামনে শুনতে হয় না, কিন্তু পেছনে চলে তীব্র শ্লেষ। মেয়েদের সব গুনাবলী ও বৈশিষ্ট্য “নেই” হয়ে যায় তাদের মেয়ে হবার অপরাধে। তাই যেকোন বয়সের পুরুষ নির্দ্বিধায় নারীকে কটুক্তি করে, যেকোন অবস্থানের নারীকে সয়ে যেতে হয় এই মানসিক অত্যাচার, কোন কোন ক্ষেত্রে শারীরিকও বটে।

১৫/২০ জনের যে ছেলেগুলি মেয়েটিকে মলেস্ট করলো ৭ মার্চে, তাদের কারো না কারো বোন, মা, খালা ফুফু, চাচী, নানী-দাদী, বান্ধবী যে অন্য কোন গ্রুপের হাতে মলেস্ট হয়েছে একইভাবে। দিন দিন যেভাবে নারী নিগৃহীত হচ্ছে তাতে অসম্ভব না যে বাইরে মেয়ে না পেলে ঘরে ফিরে নিজের মা, মেয়ে ও বোনকে মলেস্ট করবে। এদের কাছে মেয়ে, বোন, মা, খালা ফুফু, চাচী, নানী-দাদী, বান্ধবী বলে কিছু নেই এদের কাছে কাছে নারী শুধুই উপভোগের বস্তু। নারীকে যথেচ্ছা অপমান ও ব্যবহার করা যায়।

মেয়ে, তুমি হয়ত এইদেশে থাকবে না, এই দেশের মানুষ তোমার মত সাহসী মেয়ের মূল্যায়ন করবে না। তারপরও চাই তোমার মত সাহসী মেয়েতে ভরে উঠুক আমাদের দেশখানি। না হলে সত্যিই একদিন এই দেশ শুকরের দেশ হয়ে যাবে।

আর যেন কেউ আক্ষেপ করে না বলে, “আমি এই শুকরের দেশে থাকবো না, দলীয় স্লোগান দিয়ে যারা মেয়ে মলেস্ট করে তাদের দেশে আমি থাকব না। থাকব না, থাকব না………”

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)