চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে হিজড়াদের স্বীকৃতি ও কিছু কথা

মার্চের ৩০ তারিখ, লাবণ্য হিজড়া পুরো বাংলাদেশের চোখে একজন হিরো হয়ে উঠলেন। ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে ঢাকার রাস্তায় যে কেবল সে হত্যা করতেই দেখেছে তাই নয় বরং দৌঁড়ে পালাতে চেষ্টা করা সেই খুনীকে সে ধরেও ফেলে। তার এই সাহসের কারণেই দুজন গ্রেফতার হয়, এবং তারা খুনের কথা স্বীকারও করে।

লাবণ্যর এই সাহসিকতা একটি প্রশ্ন আমাদের সবার সামনে দাঁড় করিয়েছে, হিজড়ারা কি দেশের সাধারণ নাগরিকের মতো কার্যকর এবং সম-অধিকারের নাগরিক হিসেবে কখনো বিবেচিত হতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ১০ হাজার থেকে ৫ লাখ মতো মানুষ হিজড়া। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে অভিহিত করার আইন পাস করে। লাবণ্যের নায়কোচিত কাজের পর সরকারের হিজড়াদের ট্রাফিক পুলিশ হিসেবে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্তেরও প্রশংসা করে সবাই। এই তো গত সপ্তাহে সেন্ট্রাল ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা তাদের সামাজিক দায়িত্বের ফান্ডের খানিকটা অংশ ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটিতে দান করবে।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, ট্রান্সজেন্ডার অলিম্পিক বিজয়ী কেইটলিন জেনারের মতো লাবণ্যও কিন্তু লিঙ্গ ও পরিচয় নিয়ে আমাদের সবার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে বেশ ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।

সাউথ এশিয়ার বেশ কিছু দেশে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। বিগত দশকে নেপাল, ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান এমনকি ভারতও তাদের আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। আর এখন বাংলাদেশে জাতীয় কোনো নথি যেমন পাসপোর্ট বা আইডি কার্ডে তাদের লিঙ্গ লিখতে হবে ‘হিজড়া’।

হিজড়াদের এই স্বীকৃতি এরই মধ্যে অনেকবার এসেছে গণমাধ্যমে, তবুও তারা এখনও সেই সব পুরনো বাধার মুখোমুখি হয়েই আসছে।

তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে হিজড়াদের স্বীকৃতি তাদের কোনটা প্রাপ্য আর কোনটা নিষিদ্ধ সেটা বুঝতে সাহায্য করবে। তবে আমাদের দেশে প্রার্থনা ও ক্ষমতার ক্ষেত্রেও তৃতীয় লিঙ্গরা নিজস্ব নিয়ম মেনে চলে। লাবণ্য যখন প্রথমবারের মতো খুনীদের ধরার ব্যাপারে পাবলিক স্টেটমেন্ট দিবে বলে মনে করেছিলো তখনও তাকে তার গুরু স্বপ্না হিজড়ার অনুমতি নিতে হয়েছিলো। কেননা লাবণ্য যেখানে বসবাস করে সেই এলাকার প্রতীকি বাবা-মা বা আত্ত্বিক গুরু মানা হয় স্বপ্নাকে।

লাবণ্যর মতো মানুষদের জন্য নিজের গ্রামে বা নিজের বাবা-মার সাথে বসবাস করাটা অসম্ভব। হিজড়াদের বাংলাদেশের সাধারণ সমাজের বাইরে রাখা হয়। তাদের এমন একটি সমাজে বসবাস করতে হয় যেখানে দারিদ্র, অপব্যবহার ও যৌন বাণিজ্যের অবাধ বিচরণ।

এর আগে বাংলাদেশের সরকারকে সমকামীতাকে অপরাধ বিবেচনাকারী আইন বাতিলের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু প্রস্তাব নাকচ করে দেয় সরকার। সমকামী কোনো নারী বা পুরুষ যারা লিঙ্গ পরিবর্তন করেনি তারাই এই আইনের মুল আলোচ্য। তবে এই আইনের ফলে হিজড়াদেরও তাদের লিঙ্গের অন্য সদস্যের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাকে অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

হিজড়াদের নিজস্ব একটা ফ্রেমওয়ার্কও আছে বাংলাদেশে। কেননা তাদের এলাকায় তারা শুধু হিজড়া পরিচয়েই থাকেনা। বরং সেখানেই থাকে তাদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান।

কিছু কিছু হিজড়া ছেলে হিসেবে জন্ম নিয়েও নিজেদের মেয়ে হিসেবেই পরিচিত করাতে পছন্দ করে। যদিও সংখ্যাটা খুবই কম, তারাও পরিবার থেকে বাধা পায় এমনকি তাদের পরিবার থেকে বের হয়েও যেতে হয় অনেকসময়। এরপর সে একজন পতিতা বা ভিক্ষুক হয়ে উঠে। জড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। এই সন্ত্রাসী দলটাই পরে নির্ধারণ করে হিজড়ারা কোথায় বসবাস করবে, কার সাথে বসবাস করবে, কার সাথে ঘুমাবে বা সন্তান নেবে কিনা। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সমাজ এখনও হিজড়াদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। বিষয়গুলো আমাদের সবারই মাথায় রাখা ‍উচিত।

সরকার স্বীকৃত তাদের নতুন পরিচিতিকে আমরা বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ অধিবাসী হিসেবে উদযাপন করতে পারি। দেশে খুব শীঘ্রই তাদের ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকায় দেখা যাবে বলেও আশা করি। এসবই তাদের অবস্থান বদলে কাজে আসবে, এসবই হবে তাদের কষ্ট দূর করার প্রথম পদক্ষেপ।

লাবণ্যই আমাদের আরো একবার মনে করিয়ে দিলো জেনারের কথা। আমাদের সামাজিক ও সঠিক মনোভাবের পরিবর্তন অন্যদেরও অধিকার নিশ্চিতকরণে সাহায্য করবে।

তাহমিমা আনাম: লেখক, নৃতত্ত্ববিদ। ‘এ গোল্ডেন এজ’ উপন্যাসের লেখক।
(নিউইর্য়ক টাইমসে প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করেছেন শর্মিলা সিনড্রেলা)

বিজ্ঞাপন