চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘তৃতীয় লিঙ্গের’ শ্রম মর্যাদা ও একবিংশ শতাব্দীর শ্রমিক দিবস

“ভিটা নাইরে…মাটি নাইরে,
ভাঙ্গনে ভাইঙ্গা গেছে ঘর;
আমার আপন বলতে আমি ছাড়া,
সবাই এখন পর
আমি জীবন্ত একটা লাশ,
এটাই নতুন ইতিহাস”

এই গানটি বাংলা সিনেমায় বিনোদন ও মানুষের অসহায়ত্ব জীবনবোধকে তুলে ধরার নিমিত্তে প্রকাশিত হলেও গানের কথাগুলোর সাথে বাংলাদেশের ‘তৃতী লিঙ্গের’ বাস্তব জীবনের সাথে রয়েছে গভীর সাদৃশ্য । শুধুমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের হয়ে জন্মলাভের কারণে তাদেরকে সমাজের প্রতি পদে পদে হতে হয় লাঞ্ছনা- গঞ্জনার শিকার। লিঙ্গের বিশ্লেষণে তাদেরকে সাধারণত ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বা ‘কমন জেন্ডার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। তবে ‘প্রথম লিঙ্গ’ কে? বা কমন জেন্ডার ধারণার সার্বজনীন ও গ্রহণযোগ্য মাপকাঠি কী হতে পারে! সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অস্পষ্ট। সাধারণত, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থার মাপকাঠিতে চিত্রিত লিঙ্গ পার্থক্য ও লিঙ্গ স্তরবিন্যাস একটি রাষ্ট্রের লিঙ্গের মধ্যে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার চরম অন্তরায়। এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে হতে পারে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক। আপাতত সেই বিষয় থেকে বেরিয়ে এসে হিজড়াদের শ্রম মর্যাদা নিয়ে আলোকপাত করা যাক।

আজ পহেলা মে। শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে প্রতি বছর ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালন করা হয়। সারা বিশ্বের শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়বস্তু। এই শ্রমিক দিবস পালনের জন্য ১ মে দিনটির রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য ও ইতিহাস । ১৮৮১ সালের পূর্বে আমেরিকায় শ্রমিকদের প্রায় ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হত। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে ১৮৮১ সালে নভেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আমেরিকান ফেডারেশ অব লেবার’। এই ফেডারেশনের ১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত চতুর্থ সম্মেলনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে সব শ্রমজীবী মানুষ আট ঘণ্টার বেশি কোনওভাবেই কাজ করবে না।

উপযুক্ত মজুরি আর দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে ১৮৮৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১ মে সারা দেশের প্রায় ১৩ হাজার বাবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে ৩ লক্ষ (৪০ হাজারই শিকাগো থেকে) শ্রমিক ধর্মঘটে যোগ দেন। মালিকপক্ষ ও শাসকগোষ্ঠী বিশাল শ্রমিক সমাবেশ, আন্দোলন ও ধর্মঘট অবলোকন করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ৩ মে ম্যাককর্মিক হার্ভাস্টার কারখানায় পুলিশ আক্রমণ চালায়, তাতে ৬ জন নিরীহ শ্রমিক প্রাণ হারান। এর পরের দিন অর্থাৎ ৪ মে হে মার্কেট স্কয়ারে আয়োজিত বিশাল প্রতিবাদ সভায় পুলিশ গুলি চালালে ১০-১২ জন শ্রমিক নিহত হন এবং গ্রেফতার হন আরো অনেক শ্রমিক। পরবর্তীতে, ১৮৮৬ সালের আগস্ট মাসে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে গ্রেফতারকৃত শ্রমিকদের আটজনের মধ্যে সাতজনকে ফাঁসির আদেশ এবং এক জনকে ১৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। এদের মধ্যে চারজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, ১ জন আত্মহত্যা করেন এবং বাকী ৩ জনকে প্রায় ৬ বছর পরে মাফ করে দেয়া হয়। এই নৃশংসতা ও বর্বরতার খবর সারা বিশ্বের শ্রমিকদের মধ্যে নাড়া দেয়।

১৮৮৯ সালে জুলাই মাসে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথমদিনের অধিবেশনেই সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয় যে, ১৮৯০ সালে ১ মে থেকে প্রতি বছর শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সংগ্রামের দিন হিসেবে এই দিনটি পালিত হবে। এর ফলে শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় ১৬ ঘন্টা থেকে নেমে আসে ৮ ঘন্টায়। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৮৯০ সাল থেকে ১ মে সারা বিশ্বে ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ পালন হয়ে আসছে ।

বাংলাদেশও রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দিনকে ছুটি ঘোষণা করে বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পৃথিবীর কাছে মাইলফলক। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ। বিবিএস এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ১৯৭৩-১৯৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিলো মাত্র ২৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। জিডিপি’র আকার ছিলো ৭ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। মাথাপিছু আয় মাত্র ১২৯ ডলার। দারিদ্রের হার ৭০ শতাংশ। বিগত ৫০ বছরে রপ্তানি আয় বহুগুণে বেড়ে ২০২০ সালের হিসেবে ৩৯.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জিডিপি আকার ১৯৭৩-১৯৭৪ অর্থবছরের তুলনায় ৩৬৯ গুণ বেড়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। মাথাপিছু আয় ১৬ গুন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,০৬৪ ডলার। দারিদ্রের হার কমে এসে দাঁড়িয়েছে ২০.৫ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তৈরি পোশাক খাত, রেমিটেন্স, কৃষি-শিল্পের উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান, প্রান্তিক পর্যায়ে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন নতুন নতুন খাতের সমৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে একটি উদাহরণ স্থাপন করেছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন সূচকেও উন্নয়ন করেছে, তার মধ্যে একটি অন্যতম সূচক গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স। ২০২০ সালের বিশ্ব অর্থনীতিক ফোরামের রিপোর্ট অনুযায়ী , বাংলাদেশ প্রায় ৭২.৬% জেন্ডার বৈষম্য নিরসন করে ১৫৩ টি দেশের মধ্যে ৫০ তম অবস্থানে রয়েছে। ২০০৬ সালে এই অবস্থান ছিল ৯১ তম। এই বৈষম্য নিরসনের সূচকে নারী এবং পুরুষের বিষয়টি শ্রমবাজারের বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০১৯ (প্রকাশকাল মে ২০২০, ৩৯তম সংস্করণ) এ ‘ Labour Forces’ এর বিষয়ে বলা হয়েছে: ‘The total employed population (million) 15+ of the country has been estimated at 63.5 million as per Report of Labour Force Survey, 2016-17, of which 43.5 million are male and 20.0 million are female while it was 62.2 million for both sex, 43.1 million for male and 19.1 million for female in Labour Force Survey 2015-16 as per usual definition ( p. XXII)। শ্রম বিষয়টিকে বিশ্লেষণের জন্য নারী ও পুরুষকে বিবেচনা করা হলে তৃতীয় লিঙ্গের বিষয়টি অনুপস্থিত।

একবিংশ শতাব্দীর এই পৃথিবীতে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে বিশেষ করে শ্রমবাজারের নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে মাইলফলক হয়ে উঠলেও একটি বিষয় অবহেলায় অগোচরে পড়ে আছে, সেটি হল ‘হিজড়া লিঙ্গের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ’। দীর্ঘ ৪২ বছর অপেক্ষার পর ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর হিজড়া লিঙ্গকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেয়া হয় এবং হিজড়াদেরকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়। কতজন হিজড়া বাংলাদেশে আছে তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও , বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা অনুযায়ী প্রায় অর্ধলক্ষ হিজড়া বাংলাদেশে বাস করে।

কিন্তু, এই জনগোষ্ঠীরা মূল শ্রমধারায় এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশে হিজড়াদের পরিচয় আত্মপ্রকাশের পরে তাদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। সমাজের কুসংস্কারছন্নের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে পরিবার ত্যাগ করে আশ্রয় নেয় একটা নতুন পরিবারে যেখানে শুধু হিজড়ারা বাস করে। বেঁচে থাকার তাগিদে জীবিকার জন্য তাঁদেরকে বিভিন্ন বাজার, গণপরিবহন , মার্কেট, পাড়া- মহল্লা, পর্যটন ও দর্শনীয় স্থানসহ বিভিন্ন পাবলিক প্লেস থেকে টাকা উত্তোলন করতে দেখা যায়। নানাভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে বাকবিতণ্ডা করে টাকা উত্তোলন করতে হয়। অথচ, মানুষ হিসেবে মূল শ্রমবাজারে তাদের অন্তর্ভুক্তি তাদের অধিকার। মূল শ্রমবাজারে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না থাকার কারণে অনেকটা বাধ্য হয়ে এই পন্থা অবলম্বন করতে হয়। এর ফলে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথেও তারা জড়িয়ে পড়ে। হিজড়াদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তাদেরকে মূল শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে সেটা হবে “টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা” অর্জনের একটা অন্তরায়।

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আজকের এই আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে বাংলাদেশে হিজড়ার শ্রম মর্যাদা বিষয়টিকে মূল শ্রমধারায় অন্তর্ভুক্তির উপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হোক ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন