চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘তুই লুটেরা’

কুবুদ্ধি করে এক বা একাধিক লোক প্রথমে ঋণ চায়। মানে, টাকার জন্য আবেদন করে। কেন করে? করে এই জন্য যে, নানান ব্যবস্থা হাসিল করা ও বাণিজ্য করার জন্য তাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে টাকা-পয়সা থাকে না তাই। পরবর্তীতে এই লোকগুলোই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে টাকা-পয়সা দান করে এবং শোনা যায় তাদের পরিবারের লোকজন টাকার ওপর ঘুমায়।

কেন ঘুমায়? এইজন্য ঘুমায় কারণ যে পরিমাণ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল ওরা সে টাকা ফেরত দেয় না কখনো। এরপর ওরা পরিবারের অন্য কারোর নামে পুনরায় ঋণ নেয়। আবারও তারা একই কাজ করে অর্থাৎ টাকা পয়সা ফেরত দেয় না। ফলে ওদের গদি আরও বড় হতে থাকে এবং স্বভাবতই তাদের ঘুমটা আগের থেকে বেশি আরামদায়ক হয়। নিজ বাসায় ভালো ঘুম না হলে ঘুমের জন্য ওরা বিদেশে চলে যায়। ওরা বিদেশে গিয়ে আইসক্রিম খায়। সিনেমা দেখে। ইচ্ছে হলে বিদেশে একটা – দুইটা – তিনটা কিংবা দশটা বাড়ি কিনে রেখে দেয়। অথবা বিদেশে যে আইসক্রিম ভালো লেগেছিল তার একটা ফ্যাক্টরি খুলে ফেলে দেশে। কিংবা বিদেশের ফ্যাক্টরিটাই কিনে ফেলে। অথবা আস্ত একটা শপিং মল কিনে বলে, ‘হাতি মেরা সাথী’।

Reneta June

ওরা সব কিছুই করে তবে, ঋণের টাকা কখনো ফেরত দেয় না। দেয় না তো কোনদিনই দেয় না। ফলে, যারা ঋণ দেয় তারা নিঃস্ব হয়ে যায় এবং যাদের ঋণ দিয়েছিল তাদের লণ্ঠন দিয়ে খুঁজতে থাকে। পুলিশ দুদকের সাহায্য নিয়ে ওদের খুঁজে পেতে চায়। এই ব্যবস্থায় যে ঋণ দেয় তাকে বলা হয় ‘ব্যাঙ্ক’। আর যারা ঋণের টাকা লুকিয়ে রাখে তাদেরকে বলা হয় ঋণ খেলাপি বা ‘টাকাল্লুক’ – মানে টাকার ভাল্লুক।

বিজ্ঞাপন

তুমি যদি সেই ঋণ খেলাপি দলের কেউ হও তবে বল, যে হীরের আংটি তুমি পরে আছ প্রিয় অনামিকায় কিংবা লাকোস্টের জ্যাকেট লাগিয়ে কোন তুষার ঝরা রাতে মাইকেল কোরের জুতো পায়ে হেটে যাও প্রধান অতিথি হয়ে এক বিশেষ সভায়, কিংবা ভূরিভোজন করাও শত অতিথি প্রতি মাসে। তাতে কতটুকু আড়াল করতে পারলে তোমার পরিবারের অপরাধ, সন্তানের নামে কেনা পঞ্চাশ একর জমি। কিংবা কোটি টাকা লোপাটের দুর্নাম?

এক একটি হীরার আংটি একশো বেলা উপোষী উদরের জ্বালার উৎস- তুমি কি তা জানো? ওই আংটিটি যদি না থাকতো তোমার অনামিকায়, অথবা চকচকে চোখ ঝলসানো মণিহার তোমার প্রিয়তমার গলায়। তাহলে দেশের অর্থনৈতিক চাকা ঘুরত স্বাভাবিক ধারায়। ধরে নেওয়া যেতে পারে তুমিও দুই পুরুষ কিংবা তিন পুরুষ আগের কাউকে মোটা চালের ভাত খেতে দেখেছো। দেখেছো সমস্ত জীবনে তারা হাতে গোনা কয়েকটি কাপড় পরে জীবন পার করে দিয়েছে। তাহলে তুমি এমন কেন হলে? তোমারা মানে, ঋণ খেলাপিরা এই দুষ্কর্ম না করলে অবহেলিত মানুষগুলোর জীবনযাত্রা এবং তাদের বেঁচে থাকার সাধ অর্থবহ হতো। ঋণের টাকাগুলো সুদে আসলে ফিরিয়ে দিলে তুমি নিজেই মাস্টারি করতে পারতে। কোন মাস্টার নিয়োগ দিয়ে সমাজপতি সাজবার দরকার ছিল না কোন।

এখন কেমন হলো? আসামী কি কখনো জ্ঞানস্বামী হয়? যদি ভুল না করতে তবে দেশের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো শিক্ষা নিত তোমাদের কাছে। বলতো তুমিই বিদ্যালয়। তুমিই পাঠ্য। দেশের টাকা পয়সা পাই পাই করে চুকিয়ে দিয়েছ কাজেই তোমরাই মহা মানব।

যদি তোমাদের মেরে দেওয়া টাকা পয়সা নিয়মিত উৎপাদন চক্রে হেঁটে বেড়াত। যদি তোমাদের মাথায় হাতির শুঁড় না গজাত। যদি তোমাদের পেটটা এত বেশি ডাঙ্গর না হতো, কিংবা ধর, তোমাদের প্রিয় সংসার সদস্যদের হাতে তুমি পাপ তুলে না দিতে। যদি, ঠিক সময় মত টাকাগুলো ফেরত দিতে তবে, আজ টরেন্টোর বরফ বাঁধা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে প্রবাসীদের বলতে হতো না ‘লুটেরা রুখো, স্বদেশ বাঁচাও’। শত কোটি, হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপিদের মধ্যে থেকে বাছাই করে কিছু কিছু লুটেরার ছবি ছাপিয়ে জনমত গড়ে তোলার দরকার হত না প্রবাসীদের। এখন তো টাউন হল মিটিং ডাকা হয়েছে। সেখান থেকে আসবে দিকনির্দেশনা। লুটেরা তোমাদের অর্থকড়ি সব বুঝি ষোল আনা বৃথা হতে চলেছে।

এখন তোমার অজুর পানি কচু পাতায় গড়াচ্ছে। মাথার টুপি ব্যাটারির বাক্সের মত দেখাচ্ছে। তুমি কেউ না যদিও তুমি ভাবো তুমি দশজনকে আশীর্বাদ দাও। আসলে প্রবাসে মাইনাস পনেরো ডিগ্রী শিতের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মাথার ধূলিও তোমার হিরার চেয়ে দামি। চোরকে সবাই চোরের চোখেই দেখে। মুখে বলে আসসালামুআলাইকুম, অথবা হাসতে হাসতে খায় তোমার জন্মদিনের কেক। কিন্তু জেনে রেখো, বাড়ির ফটক থেকে বের হতেই বলে ভগবান ক্ষমা করো। অমুকের পাপের টাকায় একবেলা খেয়ে গেলাম বটে কিন্তু পেটের ক্রীড়াগুলো আবার আনন্দে নেচে না ওঠে।

অপরাধীর জন্য শাস্তি প্রার্থনা করলে নিজের জানা অজানা গুনাহ মাপ হয়ে যেতে পারে এই আশায় আজ সবাই তোমাদের শাস্তি দাবি করছে। এ দাবি কোন বিশেষ একজনের বিরুদ্ধে নয়। তাবৎ লুটেরাদের বিরুদ্ধে। যেহেতু তোমাদের বেশিরভাগ গা ঢাকা দিয়ে থাকো, তাই যে দু-চারজনকে সামনে পাচ্ছে তাদেরকেই কানাডার টরেন্টোর প্রবাসীরা বলছে ‘তুই লুটেরা’। এই স্লোগান আস্তে আস্তে পৌঁছে যাবে বিশ্বময়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)