চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তার শূন্যতা তাকে বার বার ফিরিয়ে আনে

এক বছর হলো সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান আমাদের মাঝে নেই। তবে তার শূন্যতাই তাকে বার বার আমাদের মাঝে প্রাসঙ্গিকভাবে ফিরিয়ে আনে।

গত এক বছরে যখনই আইন-আদালত কিংবা সাংবিধানিক আলোচনার কোন ইস্যু সামনে এসেছে, তখনই আমরা থমকে গিয়ে স্মরণ করেছি প্রয়াত মিজানুর রহমান খানকে। তার শূন্যতায় নির্দ্বিধায় অনেক আইনজীবী ও সাংবাদিককে বলতে শুনেছি, ‘মিজানুর রহমান খান বেঁচে থাকলে নিশ্চিত তিনি এবিষয়ে সাহসী লেখা লিখতেন।’

সত্যিকার অর্থেই গত এক বছরে আইন-আদালত ও বিচারবিভাগ নিয়ে সাড়াজাগানো কিংবা বিশেষ গুরুত্ব তৈরি করে, তেমন কোন লেখা খুব একটা চোখে পড়েনি। শ্রদ্ধেয় মিজানুর রহমান খান বেঁচে থাকলে হয়ত এমন শূন্যতা দেখতে হতো না। আইন আদালতের স্পর্শকাতর বিষয়কে আইনের ভিত্তিতেই তিনি বিশ্লেষণ করে প্রাঞ্জল ভাষায় তা পাঠকের মননে-মগজে ঢুকিয়ে দিতেন। সমাজ-রাষ্ট্রে কিংবা বিচারিক মনে তার লেখার ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটতো। বরিশাল বিএম কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মিজানুর রহমান খান আইন-বিচার ও সংবিধান নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী সাংবাদিকতায় নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

সুপ্রিম কোর্ট বিটে সাংবাদিকতায় যুক্ত হবার পর থেকেই শ্রদ্ধেয় মিজানুর রহমান খানের সাথে পরিচয়। একপর্যায়ে তিনি হয়ে যান প্রিয় ‘মিজান ভাই’। আইন আদালতের কোন জটিল বিষয়ে আক্ষরিকভাবে লেখা কিংবা আইনি রেফারেন্সের প্রয়োজনে মিজানুর রহমান খান ছিলেন আমার অন্যতম ভরসাস্থল। আমার দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন সংবিধান এবং আইনের রেফারেন্সের এক চলমান ডিকশনারি। আর আমাদের মত তরুণ সাংবাদিকদের প্রতি মিজান ভাই ছিলেন উদার পথনির্দেশক। সময় পেলেই তিনি সুপ্রিম কোর্ট বিটের তরুণ সাংবাদিকদের সাথে বসে আইন-আদালত ও সাংবিধানিক আলাপচারিতায় মেতে উঠতেন। উন্মুক্ত আলোচনায় নির্মোহভাবে তিনি দেশের আইনের শাসন, সংবিধান কিংবা বিচার বিভাগের অতীত-বর্তমানের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের কাছে তুলে ধরতেন। আইন অঙ্গনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তির সাথেই তার ছিল নিবিড় সম্পর্ক। তবে সে সব সম্পর্কের উচ্ছ্বসিত প্রকাশ তিনি কখনোই করতেন না। একধরনের শিশুতোষ সরলতাই ছিল তার ব্যক্তিত্বের অন্যতম সৌন্দর্য।

মিজানুর রহমান খান তার সাংবাদিকতা দিয়ে আইনের শাসনের গতিপথে বিভিন্ন সময় আলো ফেলেছেন। অনেক বিচারপ্রার্থী ভুক্তভোগীর মুখেই হাসি ফুটিয়েছেন। এক ভুক্তভোগী বৃদ্ধা এখনো মাঝে মাঝে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে এসে হাউ-মাউ করে কাঁদেন আর বলেন,’আমার মিজান নাইরে। আমার মিজান নাই।’

মিজানুর রহমান খানের প্রতি নিরন্তর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ আমরা সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনেও দেখেছি। রীতি অনুযায়ী কেবলমাত্র সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারপতি এবং আইনজীবীর মৃত্যু হলে তার জানাজা সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে হয়ে থাকে। তবে লেখালেখির মাধ্যমে নিজেকে আইন অঙ্গনের অলিখিত এক স্বত্বায় পরিণত করা মিজানুর রহমান খানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গনে তার জানাজার আয়োজন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও আইনজীবীরা সে জানাজায় উপস্থিত হয়ে ফুলেল শ্রদ্ধায় এই কলম সৈনিককে চিরবিদায় জানান। অসীম শূন্যতায় মিজানুর রহমান খান এখন কেবলই স্মৃতি। তবে তিনি আমাদের হৃদয়ে অতল শ্রদ্ধার বাতিঘর হয়েই থাকবেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন