চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তার অন্তর জুড়ে এখন শুধুই হাহাকার

কয়েক বছর আগে হারিয়েছেন স্বামীকে। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে মিরাজ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। ছোট ছেলে মিনহাজকে নিয়েই মহাখালীর ডিওএইচএসের বাসায় থাকতেন আফসানা নাসির।

পেশায় ব্যবসায়ী মিনহাজ বাসায় থাকার ফুসরত পেতেন না খুব একটা। তাই নিজের একাকীত্ব দূর করতেই ছেলেকে বিয়ে দিয়ে আনলেন পুত্রবধূ ঘরে। তবে সংসার শুরুর আগে পুত্র এবং পুত্রবধূকে ফুরফুরে করতে বিয়ের সপ্তাহ খানেক না যেতেই পাঠালেন মধুচন্দ্রিমায়। কিন্তু হিমালয়ের হিমদেশে পাঠানো ছেলে এবং তার নববধূ যে এরকম অঙ্গার হয়ে যাবেন তা কি জানতেন তিনি!

সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিরের স্ত্রী এবং নেপালে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় স্ত্রীসহ নিহত মিনহাজ বিন নাসিরের মা আফসানা নাসিরের অন্তর জড়ে আজ শুধুই হাহাকার। ত্রিভুবন বিমানবন্দর তার ভুবনকে করে দিয়েছে বিষময়।

বুধবার বিকেলে মিনহাজদের মহাখালী ডিওএইচএসের বাসায় গিয়ে দেখা যায় থমমথে পরিবেশ। ২১ নম্বর রোডের ৩০৯ নম্বর বাড়িটির ঘিরে যেন ভর করেছে গভীর নিরবতা। শোকে স্তব্ধ হয়ে ভারি হয়ে রয়েছে পুরো পরিবেশ।

মহাখালী ডিওএইচএস’র ২১ নম্বর রোডের ৩০৯ নম্বর বাড়িটির ঘিরে যেন ভর করেছে গভীর নিরাবতা

সন্তানের এবং নববধূর দুর্ঘটনার খবর জানলেও তারা যে আর বেঁচে নেই তা জানতেন না মা আফসানা নাসির। তাকে বলা হয়েছিল তারা আইসিইউতে রয়েছেন। কিন্তু বারবার উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করায় তারা নিহত হওয়ার একদিন পরে তাকে জানানো হয় তাদের মৃত্যুর খবর।

এ খবর শুনে স্বভাবতই মূষড়ে পড়েছেন স্বামীহারা এই নারী। নিকট আত্মীয় ছাড়া কাউকেই বাসায় ঢুকতে না দিতে বলে দিয়েছেন বাড়ির কেয়ারটেকারকে।

সপ্তাহখানেক আগেই শেরোয়ানি-পাগড়ি পরিয়ে যে ছোট ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে গেছেন, তাকেই শেষযাত্রায় সাজাতে বড় ভাই মিরাজ ছুটে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে বাসায় ঢুকে তিনি আর বের হননি বলে জানান মিনহাজদের একই ভবনে অবস্থিত একটি কর্পোরেশন অফিসের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এবং তাদের পরিবার সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখা  আনোয়ার হোসেন।

বাড়ির অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে আনোয়ার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বোঝেনই তো বাড়ির অবস্থা। মাত্র সপ্তাহখানেক আগে যে সন্তানের বিয়ে দিয়েছেন আজ তার মৃত্যুর খবরে তার মা-ভাই যে কতটা দুঃখ পেয়েছেন তা বলে বোঝানোর মত নয়। মিনহাজের মৃত্যুকে কেবল তার পরিবার নয়, শোক নেমে এসেছে পুরো এলাকা জুড়েই।

মিনহাজের প্রয়াত বাবা সাবেক সেনাকর্মকর্তা নাসির এবং মা আফসানা নাসির

গত মাসের শেষ দিনে মিনহাজের গায়ে হলুদ হয় বারিধারার একটি কনভেনভেনশন হলে। এর তিন দিন পর চলতি মাসের ৩ তারিখ তাদের বৌভাত হয় বনানীর আরেকটি কমিউনিটি সেন্টারে। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করা আঁখি মণির সঙ্গে।

বিয়ের পর নববধূকে নিয়ে মধুচন্দ্রিমার যাত্রাপথে নেপালের ত্রিভুবন বিমান বন্দরে তাদের বহন করা ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হলে স্বদেশী আরও ২৮ জনের সঙ্গে তারাও মারা যান। নেপালের বাংলাদেশ দূতাবাসের নিহতদের তালিকায় আঁখি মনি এবং মিনহাজের নামটি দেখাচ্ছে ১৯ এবং ২০ নম্বরে।

সোমবার ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বোমবার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ-৪০০ উড়োজাহাজটি ঢাকা থেকে ছেড়ে গিয়ে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে নেপালে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণ করার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়।

উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় এ নিয়ে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৫১। এর মধ্যে ২৮ জন বাংলাদেশি, ২২ জন নেপালি এবং ১ জন চীনা নাগরিক। চিকিৎসাধীন যাত্রীদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

উড়োজাহাজটিতে থাকা ৬৭ যাত্রীর মধ্যে ৩২ জন বাংলাদেশী, ৩৩ জন নেপালি, একজন মালদ্বীপের এবং একজন চীনের নাগরিক ছিলেন। উড়োজাহাজটিতে ৬৭ যাত্রীর পাশাপাশি ক্রু ছিলেন চারজন।