চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তামাক পণ্যে করারোপ: আরও সক্রিয় হতে হবে সংসদ সদস্যদের

তামাক পণ্যের বহুবিধ ব্যবহারের কারণে বিশ্বে জনস্বাস্থ্য আজ হুমকির সম্মুখীন। বিষয় বিশেষজ্ঞ এবং তামাক প্রতিরোধে কমিউনিটি পর্যায়ে যারা নিবিড়ভাবে কাজ করছেন তারা বলছেন মৃত্যু এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিচার-বিশ্লেষণে বিষয়টি মঙ্গলজনক নয়। তামাকের অতিরিক্ত ব্যবহারে মানুষের মৃত্যু ঘটছে, এই মৃত্যু অনেক পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। চিকিৎসকদের মতে, তামাকের কারণে হৃদপিণ্ড, লিভার ও ফুসফুসের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়। পরিসংখ্যান বলছে, এর পাশাপাশি তামাক ব্যবহারের কারণে দেশে ওরাল ক্যান্সারের রোগীর সংখ্যা এখন বেশ বাড়ছে। কেননা এই রোগের অন্যতম উৎস অতিরিক্ত তামাক জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে প্রতিবছর গড়ে ৮ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ তামাকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবহারে। মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশেই আবার এই মৃত্যুজনিত আঘাতটা তুলনামূলক বেশি। আমাদের দেশেও তামাকের কারণে সৃষ্ট রোগে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক ব্যবহার বা গ্রহণে শুধু প্রত্যক্ষ নয় পরোক্ষ ক্ষতিও আছে। সেই ক্ষতি অনেকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। যেমন- যারা বাসাবাড়িতে ড্রয়িং রুম বা ডাইনিং-এ বসে নিয়মিত ধূমপান করেন তারা কিন্তু অজান্তেই বাসার শিশু-কিশোরসহ অন্যদের ক্ষতি করে চলেছেন। কেননা ঘরে যে সিগারেটের ধোঁয়া থাকে তা কোনো না কোনো ভাবে নিঃশ্বাসের সাথে শিশুদের ফুসফুসে পৌঁছে যায়। আবার অনেকেই আছেন রিকশা বা অন্য যানবাহনে স্ত্রী-সন্তানকে পাশে বসিয়ে ধূমপান করতে থাকেন। এতে কিন্তু বড় ধরনের পরোক্ষ ক্ষতি হয়। আবার ধোঁয়াবিহীন তামাকের (জর্দ্দা, গুল) ব্যবহার এতদিন অনেকটাই আলোচনার বাইরে থাকলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেখিয়ে দিয়েছেন সেটার ক্ষতির মাত্রাটাও খুব খারাপ। আমাদের দেশে ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহার অনেক পুরনো। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি হাটবাজারে প্রচুর তামাক পাতা বিক্রি করতে। এই তামাক পাতা অনেকেই পানের সাথে মিশিয়ে খান। আবার তামাক পাতা কুচিকুচি করে কেটে হুক্কায় ব্যবহার করতে দেখেছি। জর্দ্দা ও গুলের সাথে তামাক পাতার ব্যবহার কারো অজানা নয়। দাঁত এবং মুখগহ্বরের চিকিৎসকরা বরাবরই জর্দ্দা বা তামাক পাতা খেতে নিষেধ করেন। কেননা মুখগহ্বরের ক্যান্সারে এটি বড় ধরনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

তামাকের বহুবিধ ব্যবহার কমিয়ে আনতে এবং তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এবং মানবদেহের সুরক্ষায় আমাদের সরকার নিঃসন্দেহে অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই অঙ্গীকারের প্রধান দিকটি হলো- প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে একটি আশা জাগানিয়া স্বপ্ন ও পথনকশার কথা বলেছেন। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী এই স্বপ্নের ঘোষণা দেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি সময়োচিত সাহসী স্বাপ্নিক পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রী তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে পথনকশা দিয়েছেন এটি অবশ্যই তার উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম একটি স্পিরিটও বটে।

বাংলাদেশে তামাকের বহুবিধ ব্যবহার তুলনামূলক কমে আসছে। সরকারি এবং বেসরকারি তথ্য সেটা বলছে। এই কমে আসার পেছনে বর্তমান সরকারের নির্দেশনামূলক আইন-কানুনের প্রয়োগ পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠনগুলোর জনসচেতনতা কার্যক্রমের অতুলনীয় অবদান স্বীকার করতেই হবে। সরকার একদিকে যেমন আইন-কানুন তৈরি করছে অন্যদিক বেসরকারি সংগঠনগুলো সরকারের সারথী হয়ে মাঠপর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কাজ করছে। অ্যাডভোকেসি, গবেষণা, নীতি প্রণয়নে সহায়তা, সচেতনতা তৈরি- এই কাজগুলো বেসরকারি সংগঠনসমূহ ব্যাপকভাবে করছে। এটি সর্বাংশে সত্য যে, আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে তামাকের ক্ষতিকর দিকসমূহ সম্পর্কে মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন ও সংবেদনশীল। পারিবারিক এবং ব্যক্তি সচেতনতা বাড়ার কারণে প্রকাশ্যে ধূমপানের হারও এখন অনেক কমে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু নির্দেশনা, আইন ও নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। যেখানে সুস্পষ্টভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বলা হয়েছে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (২০০৫ সনের ১১নং আইন) এর ধারা ১৬-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১২ মার্চ ২০১৫ হতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় যে প্রজ্ঞাপন জারি করে সেখানে অনেক কিছুই সুনির্দিষ্ট করা হয়। যেমন: পাবলিক প্লেসে ধূমপান সম্পূর্ণরূপে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এখন টেলিভিশনে প্রচারিত সিনেমাতেও আমরা দেখছি যেখানে তামাক সেবনের চিত্র রয়েছে সেখানে- ‘ধূমপান/তামাক সেবন মৃত্যু ঘটায়’ শীর্ষক সতর্কবাণী জুড়ে দিতে। বিভিন্ন জায়গাতেই এখন সতর্কতামূলক নোটিশও দেখতে পাওয়া যায়। ‘ধূমপান থেকে বিরত থাকুন, ইহা শাস্তিযোগ্য অপরাধ’- এমন সতর্কতামূলক নোটিশ এখন সর্বত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সাথে তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট, মোড়ক, কার্টন বা কৌটায় ক্ষতি সম্পর্কিত সচিত্র সতর্কবাণী মুদ্রণও আমরা দেখতে পাচ্ছি। আগে বিড়ি, সিগারেটের বিজ্ঞাপন উন্মুক্ত থাকলেও তা অনেক আগেই আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু কিছু বিষয়ে আমাদের আরও প্রগ্রেসিভ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে। পাবলিক প্লেসকে শতভাগ ধূমপানমুক্ত করার জন্য সেখানে ধূমপানের জন্য স্মোকিং জোন রাখার বিধান আইন করে বন্ধ করতে হবে যাতে অধূমপায়ী ব্যক্তি, নারী ও শিশুরা পরোক্ষ ধুমপানের শিকার আর না হয়। পরিবারের মাঝেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

আমাদের জন্য একটি বড় আশা জাগানিয়া বার্তা হলো- তামাক ব্যবহার কমাতে বা বন্ধে আমাদের নাগরিক সমাজের মধ্যে এক সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি তৈরি হয়েছে। আমাদের সংসদ সদস্যরাও নাগরিক সমাজের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেছেন তামাক ব্যবহার কমিয়ে এনে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি, অসুখ-বিসুখ অবশ্যই কমিয়ে আনতে হবে। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরুর আগে দেখেছি অনেক সংসদ সদস্যই তার এলাকাতে তামাক চাষের বিপুল জমি ব্যবহারে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলেছেন অধিক লাভের আশায় কৃষকরা জমিতে তামাক চাষ করার কারণে তারা অন্য ফসল চাষ করা থেকে বিরত থাকছেন। এতে বৈচিত্র্যময় কৃষির ক্ষতি হচ্ছে এবং জমির উৎপাদনশীলতা কমে আসছে। অনেকেই জানিয়েছেন তামাক পাতা প্রক্রিয়াকরণে নারী-শিশুদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকার কারণে তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।  সংসদ সদস্যগণ যথার্থ তথ্যই দিয়েছেন। ভালো লাগছে যে আমাদের সংসদ সদস্যগণের নজরদারিতে সবকিছু আছে। একটি বিষয় মনে করিয়ে দিতে চাই এ বছর কিন্তু আমাদের ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বাংলাদেশে ই-সিগারেট বা ভেপিং এর আমদানি, উৎপাদন, বিক্রি-বিপণন নিষিদ্ধের অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত চিঠি দেন। ই-সিগারেট বা ভেপিং অপব্যবহারের বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। তরুণ সমাজকে এই নতুন নেশা থেকে দূরে রাখতে হবে।

তামাকপণ্যে অধিক করারোপের দাবি তুলেছেন নাগরিক সমাজের ব্যক্তিগণ- যারা বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছেন। গবেষণার আলোকে তারা বলছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার কারণে জনসমষ্টির একটি লেভেলে বা পর্যায়ে তামাকের ব্যবহার সেভাবে কমছে না। এ কারণেই তামাকের উচ্চমূল্য নির্ধারণ ছাড়া এর লাগাম টানা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে অধিক করারোপ বড় ধরনের একটি কৌশল হিসেবে কাজ করতে পারে। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটে ৫ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে ৭ টাকা বাড়ানো হলেও নিম্ন ও মাঝারি স্তরের সিগারেটের দাম ও শুল্ক অপরিবর্তিত রাখায় তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে বলা হচ্ছে। আমি মনে করি আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অনেক ধরনের সামর্থ্যকে বিবেচনায় নিয়ে তামাকপণ্যে আরও করারোপ জরুরি। এতে সব পর্যায়ে মানুষ তামাক গ্রহণে নিরুৎসাহিত হবে। এক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের সংসদের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই অসম্ভব এক স্বাপ্নিক নেত্রী। যিনি ভবিষ্যত দারিদ্রমুক্ত অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বি এক অন্যরকম বাংলাদেশকে হৃদয়ের মাঝে লালন করেন। এ কারণেই তিনি বলেছেন ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাক মুক্ত করতে হবে।  প্রধানমন্ত্রীর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের সংসদ সদস্যদের অবশ্যই সঠিক ভূমিকা পালন করতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন